হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল, বলছে তদন্ত কমিটি

আদ-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু

| শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর আদদ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি; দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা; বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিকটিমদের পরিবারবর্গ, চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের বক্তব্য পর্যালোচনা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, মগবাজারের আদদ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গত ২৭ মে ২০২৬ তারিখে ভোর রাত আনুমানিক ৫টা হতে সকাল ৯টার মধ্যে ছয় জন নবজাতকের আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উক্ত সময়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা, নার্স/স্টাফ এবং সর্বোপরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অবহেলাজনিত বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।

কোরবানির ঈদের আগের দিন বুধবার ভোরের দিকে আদদ্বীন হাসপাতালের ‘পোস্ট অপারেটিভ’ ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুর সবাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং একে একে তাদের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় দেশব্যাপী গভীর উদ্বেগ, শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি বুধবার তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কমিটির প্রতিবেদনের সারমর্ম সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।

ভবনের অনুপযুক্ততা : তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে একমত হয়েছে যে, ভবনটি হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়।

ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেনের ঘাটতি : সংশ্লিষ্ট পোস্টঅপারেটিভ কক্ষ ২ পরিদর্শন শেষে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন না থাকায় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।

দায়িত্বে চরম অবহেলা : কমিটি বলছে, কক্ষের দায়িত্বরত সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতির সময় হাসপাতালে সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না।

চিকিৎসায় গাফিলতি : প্রতিবেদনে বলা হয় অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি।

অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি : প্রায় ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে সে সময় ১১ জন রোগী, নবজাতক এবং রোগীর স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা : তদন্ত কমিটি বলছে, হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তাবলি পালনে সক্ষম ছিলেন না।

প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তথাপি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জবানবন্দি থেকে উপরোক্ত বিষয়গুলোকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন সাংবাদিক জানতে চান, তদন্ত কমিটি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে, আপনাদের সামনে পড়ে শোনানো হয়েছে। এখন আমরা কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদন নিয়ে বসব। বসে বিদ্যমান আইনে যে শাস্তি দেওয়া যায়, আমরা সেটাই করব ইনশাআল্লাহ। আমরা আইন দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

আদদ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আইন দেখে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, অতীতে দেখেছি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে আলামত যেন নষ্ট করতে না পারে সেজন্য হাসপাতাল সিলগালা করা হয়। কিন্তু এখানে এতগুলো বাচ্চা মারা গেল, সিলগালা করা হলো না কেন? অনেক আলামত তো লোপাট হয়ে গেছে।

উত্তর দিতে গিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আপনাদেরকে বলি, যে পোস্টঅপারেটিভ রুমটা ননভেন্টিলেটেড ছিল, অক্সিজেনের চাইতে বেশি কার্বনডাইঅক্সাইড ছিল, ওটা আমরা সিলগালা করে রেখেছি। পুরা হাসপাতালে দুইশর উপরে রোগী আছে। পুরা হাসপাতালটা হঠাৎ আমরা বন্ধ করতে পারি না।

এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা দেবে কি না, সেই প্রশ্ন রাখেন একজন সাংবাদিক। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা কন্টিনিউয়াসলি পরিদর্শনে আছি। এই ঘটনার পরে উই আর মোর সিরিয়াস। আমরা আরো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাখছি। এর মধ্যে গত তিনটি দিন আমরা জুম মিটিং করেছি সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় পরিচালক প্রত্যেকের সাথে এবং এসব ব্যাপারে কড়া নির্দেশ দিচ্ছি। স্বাস্থ্য সেবাকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের ব্যবস্থাপনা কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে আরো ২৪ শিশুর হাম শনাক্ত
পরবর্তী নিবন্ধতেল গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে