রেখে আসা কিংবা ফেলে আসা– হোক সে কাটানো সময়, কিংবা নিকটজন, কষ্টকর। কিন্তু জীবন প্রবাহটাই এমন। এই জাগতিক নিয়মকে কেউ এড়াতে পারেনা। মানুষ তার প্রয়োজনে এগিয়ে চলে, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা ধারার মত। পিছু রেখে আসে অনেক কিছু, যা সাথে নিতে চাইলেও নিতে পারেনা। সাথে নেয় কেবল স্মৃতি। অবসর মুহূর্তে সেই স্মৃতির পাতা একটি একটি খুলে ফিরে যেতে চায় ফেলে–আসা দিনগুলিতে। তখন বুকের ভেতর থেকে বুঝি নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়, আশপাশের শব্দে তা মিলিয়ে যায়। আশপাশের কেউ তা টের পায় না। যার বুকের ভেতর থেকে এই দীর্ঘশ্বাস বেরোয় সেও চায়না অন্য কেউ তা টের পাক। দেশ থেকে ফিরে এসে অনেকের মত আমিও স্মৃতির পাতা উল্টাতে থাকি। স্মৃতি টানে আমায় পেছন পানে। ভাবি কত কিছুই বদলে গেল, বদলে যায়। কেউ বলে, ‘সময় অনেক কিছু বদলে দেয়‘। আসলেও তাই। সময় মানুষ বদলায়। সময় কি মানুষের বোধশক্তিরও বদল ঘটায়? অনুভূতি, শোকানুভূতি, আনন্দানুভূতি? কথাটা এই কারণে বলা, সেই স্কুল বয়সে যখন দিদির বিয়ে হলো আমরা সবাই হইচই করে গ্রামের বাড়ি গেলাম। বিয়ে হবে গ্রামের বাড়িতে। তখনকার দিনে বিয়ের মজাটাই ছিল ভিন্ন। মাটির দোতলা বড়সর বাড়িতে আত্মীয়–স্বজন, নাইয়র–নাইয়রি গমগম করছে। পেছনের উঠোনে আলাদা মাটির চুলোয় দিনরাত রান্না চলছে। রান্না করে চলেছে গ্রামের পরিচিত কিছু মহিলা, তাতে জোগান দিচ্ছে ভিন্ন গ্রাম থেকে আসা দূর আত্মীয়েরা। ছোটছোট ছেলেমেয়েরা, সে দলে আমরাও– পেছনে বড় আকারের পুকুরে দলবেঁধে সাঁতার কাটা, মাছ ধরার চেষ্টা, চলতো বাঁধাহীন, বল্গাহীন। স্কুল নেই, ক্লাস– টিচারের কড়া নজর নেই। তখনকার দিনে গ্রামের বিয়েতে ঢাক–ঢোল ছিল অবধারিত। দিদির যখন বিয়ে তখন আমি ক্লাস এইটে, কলেজিয়েট স্কুলে। আমার আর দিদির মাঝখানে ছিল মেজদা বিমান, আমার এক ক্লাস উপরে। পাড়ার সব চাইতে সুন্দর মেয়েটি ছিল আমাদের দিদি, তার নামটিও সুন্দর, মাধুরী। দিদি আমাদের ছয় ভাই দু বোনের মধ্যে সেরা। সবদিক থেকে। অপর্ণাচরণ গার্লস স্কুলে পড়তো। শান্তশিষ্ট, কারো সাতে–পাঁচে নেই। এখন তার বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনো ঠিক তেমনটি রয়ে গেছে। তো সেই দিদির বিয়ে হয়ে গেলো অনেকটা হুট করে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার আগেই। বরপক্ষ কনে নিয়ে যাবার মুহূর্তে বাড়িতে কান্নার রোল। অন্যদিকে দিদি ও অন্যদের কান্নাকে ছাপিয়ে প্রচন্ড শব্দে ঢোল আর সানাইয়ের শব্দ। মৃদু পায়ে আমি একা পেছনে পুকুর পাড়ে গিয়ে কাঁদতে থাকি। এতদিন একসাথে, একই ছাদের নিচে ছিলাম। সেই কিনা চলে যাচ্ছে। মনে আছে একা একা খুব কাঁদলাম। আমার সেই কান্নার সাক্ষী কেউ হলোনা। আমার কান্না আমার মাঝেই হারিয়ে গেলো। এর ঠিক আট দিন পর স্কুলে গেলাম। ক্লাস টিচার সঞ্জীব স্যার আমাকে দেখে বললেন, ‘এতোদিন পর? মনে হচ্ছে তুই নিজে বিয়ে করে এসেছিস।‘
এখন এই সব ঘটনা আজকের প্রজন্মের কাছে অদ্ভুত শোনাবে। কল্পনাও করতে পারবেনা যে বোনের বিয়ে হয়েছে, বোন শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে, আর সেই জন্যে কিনা ভাইয়ের কান্না। শুনে তারা হয়তো সমস্বরে বলে উঠবে, ‘সিলি‘। হয়তো বলবে, এসব ‘সস্তা আবেগ, মেইক নো সেন্স।‘ এখন ‘বেগে‘ চলার যুগ, যে–যুগ দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। ইমোশনের স্থান এখানে নেই। ভাবি কতকিছুই বদলে গেছে, কত তাড়াতাড়ি, কত সহজে। আমাদের স্কুল বয়সে, কাকা জেঠারাও থাকতেন শহরে। কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে হতো গ্রামের বাড়িতে। আমরা দলবেঁধে গ্রামে যেতাম। বিয়ের বেশ কয়েক দিন আগ থেকে একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকতো গোটা বাড়িতে, এমন কী গোটা গ্রামেও। গাছের ডগায় মাইক লাগিয়ে ‘কত যে কথা ছিল, কত যে ছিল গান‘ কিংবা ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন‘ জাতীয় গান বাজানো হতো। দূর থেকে শোনা যেত সে গান। এখন তো গ্রামে যারা থাকে তাদের ছেলেমেয়েদেরই বিয়ে গ্রামে হয় না। বিয়ে হয় শহর কিংবা উপ–শহরের কম্যুনিটি সেন্টারে। গ্রামে খুব কম মানুষই থাকে। এবার গ্রামে গিয়ে দেখি প্রায় বাড়ি ফাঁকা। যেন সব ভুতুড়ে বাড়ি। গাছ–গাছালিতে ছেয়ে গেছে পুরো বাড়ি, আশপাশ। বাইরে রাস্তা থেকে বাড়ি চোখে পড়েনা। এমন যখন গ্রামের প্রায় বাড়িগুলোর দশা তখন বিয়ে হবে কী করে। আমাদের স্কুল–বয়সে যখন বিয়ে হতো তখন বিয়ের পাশাপাশি বাড়ির বা নিকট আত্মীয়ের ছোটছোট মেয়েদের কর্ণছেদন করানো হতো। আমরা বলতাম, ‘কান ফোড়ানি‘। এখন ভদ্দর গোছের শব্দ ‘কর্ণছেদন‘ ব্যবহার করা হয়। এখন ‘কর্ণছেদন‘ অনুষ্ঠিত হয় জাঁকজমক সহকারে, কম্যুনিটি সেন্টারে, ব্যানার লাগিয়ে, বেলুন ঝুলিয়ে, হল সাজিয়ে। তাতে অনুষ্ঠানের জৌলুস বেড়েছে বটে, কিন্তু মনে হয়, প্রাণ হারিয়েছে। বাইরেরটা এখন মুখ্য, প্রাণ–ট্রান এই সব গৌণ। সস্তা সেন্টিমেন্টের ব্যাপার। এতো গেলো ফেলে আসার দিনের কথা। ফিরে আসি বর্তমানে।
ফেরার দিন সব ঠিকঠাক। সকাল ৬–৫০ মিনিটে ফ্লাইট। দিদির বাসা থেকে রওনা দিতে হয়েছে সেই ভোররাতে। ড্রাইভার রমিজ যাতে সময় মত আসতে পারে সে কারণে সে তার নিজের বাসায় যায়নি। ছিল মেজদার অফিসের রেস্ট হাউসে। ওই রেস্ট হাউসে অনেকবার থাকা হয়েছে। মেজদার অফিসের নিজস্ব ভবনের পাঁচ তলা পর্যন্ত অফিস, এর পর ছয় তলায় রেস্ট হাউস। বেশ কটি এসি কামরা। কম করে আড়াই ঘন্টা আগে এয়ারপোর্ট পৌঁছে চেক–ইন করা দরকার। তাই রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ বাসা থেকে বের হয়ে পড়ি। ইতিমধ্যে রমিজ চলে এসেছিল। ফার্মগেইট থেকে এয়ারপোর্ট – এই পথটুকু আসতে চোখে পড়লো পৌর কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের। ওরা সড়ক পরিষ্কার করছে। রাস্তাগুলি মনে হচ্ছে ইউরোপের কোন শহরের। পরিষ্কার, কোন আবর্জনা নেই। এমনটি চাটগাঁ শহরে দেখিনা। এই বড় রাস্তাগুলি দিনের বেলায় চোখে পড়েনা, কেননা তার অর্ধেকের বেশি থাকে হকার আর ফেরিওয়ালাদের দখলে। পথচারী ফুটপাতে হাঁটে না, হাঁটে সড়কের উপর। উপায়হীন, তাকে তো চলতে হবে। পৌঁছুলাম বিমানবন্দর। বাইরে প্রচুর লোক। অনেকে প্রায়শ এয়ারপোর্টের নানা অব্যবস্থার সমালোচনা করে থাকেন। অব্যবস্থা যে নেই তা বলা যাবেনা। তবে সামপ্রতিক সময়ে মনে হয়, পরিস্থিতির বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে চালু হয়েছে এয়ারপোর্ট সার্ভিস ব্যবস্থা। গাড়ি থামার আগেই এগিয়ে আসে গলায় ব্যাজ ঝুলানো এক তরুণ। যাত্রী–প্রতি পাঁচশো টাকায় এই এয়ারপোর্ট সার্ভিসের কর্মী আপনাকে ভিড় এড়িয়ে নিয়ে যাবে একেবারে এয়ারলাইন্স কাউন্টারের সামনে। আপনার লাগেজ গাড়ি থেকে নামিয়ে লাগেজ বেল্টে তুলে দিয়ে ইমিগ্র্যাশন গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দেবে। আমার মত আরামবিলাসী যাত্রীর জন্যে এর চাইতে ভালো সেবা আর কী হতে পারে। আমি বরাবর ওদের নির্ধারিত টাকার চাইতে কিছু বেশি দেই। ওরা খুশি হয়, ওদের সেবায় আমিও খুশি।
ইমিগ্রেশন কাউন্টারে এবার মজার অভিজ্ঞতা হলো। ডেস্কে যে কর্মীটি বসেছিলেন, অনুমান করি বয়স চল্লিশের দিকে। মুখে দাড়ি। পাসপোর্ট নাড়াচাড়া করে স্মিতহাস্যে বলেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কিছু যদি মনে না করেন।’ কিছুটা কৌতূহল নিয়ে বলি, অবশ্যই। ভদ্রলোক বলেন, আপনার নাম দেখছি, চৌধুরী বড়ুয়া। এমনটি আগে দেখিনি কিনা। উত্তরে বলি, এর পেছনে দীর্ঘ কাহিনী। সংক্ষেপে বলি– ‘বড়ুয়া’ আমাদের পারিবারিক টাইটেল না। আমার বাবা, দাদা সবাই ছিলেন ‘চৌধুরী‘। আমাদের গ্রামেও বলা হয় ‘চৌধুরী বাড়ি’। আমিও চৌধুরী পদবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বছর কয়েক চাকরি করি। আশির দশকে, বছর দুয়েক হলো কাজ করছি ঢাকায় বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। দুর্গাপূজা ছুটি শেষে কাজে যোগ দিয়েছি।
এক কলিগ দেখা হতেই বললেন, ‘কী ভাই, একা একা পূজা সারলেন, আমাদের খাওয়া বাকি রইলো কিন্তু।‘ অই কলিগ, কাজ করে ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে, কিন্তু আমরা একই গাড়িতে অফিস–বাসা করতাম। বুঝলাম, আমার চৌধুরী পদবি তাকে বিভ্রান্ত করেছে। এই পদবি নিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি এর আগেও অনেকবার হতে হয়েছে। ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের একান্ত সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম কাকরাইলের মোড়ে তার বাসায়। এক পর্যায়ে টের পেলাম তিনি আমার পদবি দেখে ধরে নিয়েছেন আমি ন্যাপ জাতীয় কিছু করি। তার ভ্রান্তি ভাঙাতে হলো। ঠিক করলাম, না এবার পদবিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে যাতে এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি আর হতে না হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন নিয়ে নামের শেষে যোগ করলাম, বড়ুয়া। সেই থেকে বিকাশ চৌধুরী হলো আজকের বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া। (২৯–১০–২০২৬)।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












