সংরক্ষণ পদ্ধতি বিপন্ন বন্যপ্রাণিদের বাঁচতে সাহায্য করে

মুশফিক হোসাইন | শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

সমপ্রতি কক্সবাজারের ইনানী সংরক্ষিত বনে দেখা গেল বিরল ও মহা বিপন্ন মেঘলা চিতা।এতে করে আবারও প্রমাণিত হলো সংরক্ষণের উদ্যোগ কখনো ব্যর্থ হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় চীনে এক সময় হাতি বিলুপ্ত হতে হতে ১৫০ টিতে এসে দাঁড়ায়। তারা সংরক্ষণের কর্মসূচি গ্রহণ করায় তার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪০০ টিতে দাঁড়িয়েছে।

মেঘলা চিতা (Clouded Leopard)একে অনেকে লামচিতা, ফুলেশ্বরীবাঘ, গেছো বাঘ ইত্যাদি নামেও ডাকে। এদের প্রধান নিবাস হিমালয়ের পাদদেশ হতে বিস্তার করে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও চিনে দেখা যায়। বাংলাদেশের বান্দরবান রাঙ্গামাটি ও সিলেটের গহিন বনাঞ্চলে স্বল্প সংখ্যক বেঁচে আছে। আই ই উ সি এন বাংলা দেশসহ বিশ্বব্যাপী এদের সংকটাপন্ন বলে ঘোষণা করেছে। প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে সমগ্র বিশ্বে এদের সংখ্যা ১০ হাজারের কম(আনুমানিক)।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রাণীদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সুরক্ষিত রেখে তাদের জীবনযাত্রা ও প্রজনন নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ও নিরাপত্তা আইন ২০২৬ আছে। কিন্তু বাস্তবে সংরক্ষণের টেকসই প্রয়োগ লক্ষ করা যায় না। যাইহোক সংরক্ষণ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে, উদ্ভিদ, প্রাণী তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার একটি প্রক্রিয়া। যা পরিবেশের ভারসাম্য বৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।উল্লেখ্য যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্য শৃংখল ও বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে বন্যপ্রাণী অপরিহার্য। তাই যথাযথ কারণে সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ফলে সংকটাপন্ন প্রজাতিদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

আমাদের মেঘলা চিতা অতি সংকটাপন্ন বলে চিহ্নিত। মেঘলা চিতার সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ১/বন ধ্বংস হয়ে যাওয়া ২/বন খন্ডিত হওয়া ৩/বনে মানুষের চাপ ও বসতি বেড়ে যাওয়া ৪/বনের মধ্যে সড়ক ও রেলপথ তৈরি করা ইত্যাদি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীর নগর ও জার্মানির গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়, বন অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা যৌথ সমীক্ষায় ক্যামেরা ট্যাপের মাধ্যমে কক্সবাজারের ইনানী সংরক্ষিত বনে বেশ কিছু দুর্লভ প্রাণীর সাক্ষাৎ পায়।তারমধ্যে অন্যতম হলো মেঘলা চিতা। এটাই প্রথম বাংলাদেশে ক্যামেরা ট্যাপের মাধ্যমে শনাক্তকরণকৃত প্রথম মেঘলা চিতা।

এই চিতার বৈশিষ্ট্য হল, এরা নিশাচর জলপ্রেমি স্বভাবের মাংসাশী একটি প্রাণী। সাধারণত রাতে ও গভীর অন্ধকারে শিকার ধরতে বের হয়। দিনের বেলা অন্ধকার স্থানে লুকিয়ে থাকে। এরা একাকী জীবন যাপন করতে ভালোবাসে। বড় প্রজাতির বিড়াল ও ছোট বিড়ালের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টিকারী প্রজাতি হিসেবে এদের শনাক্ত করা হয়। সারা বিশ্বে বিপন্ন ও দুর্লভ প্রাণীদেরএকটি।এদের শরীরে বড় মেঘের আকৃতির রেখা থাকে। পিঠের দিকে জলপাই হলুদের উপর গাঢ় বাদামী লম্বাটে ও গোলাকার বড় বড় চাক্তির মত দাগ রয়েছে। মুখে ও লেজে কালো চোপ।তবে পেট একেবারে সাদা। মাথা থেকে এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ সেন্টিমিটার। লম্বা ও মোটা লেজ এদের সহজেই গাছের ডালে ডালে চলাচল এবং ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।ওজন ১৭ থেকে ২০ কেজি। থাবা বড়, পা গুলো ছোট। বুনো প্রাণী যেমন কাঠবিড়াল, ইঁদুর, বুনো ছাগল, শুকরছানা, পাখি ও পাখির ডিম, সাপ ইত্যাদি পছন্দ করে থাকে। এদের মাড়ীর উপরে বিশাল দুটি স্বদন্ত আছে। অন্য বিড়াল প্রজাতির মধ্যে এটাই তাদের অন্যতম পার্থক্য।

এরা দুই পা দিয়ে গাছে ঝুলে থাকতে পারে। প্রয়োজনে সাঁতার কাটতে পারে। দিনের অধিকাংশ সময় ডালে বনে জঙ্গলে ঘুমিয়ে কাটায়। এদের প্রজনন কাল অক্টোবর –জানুয়ারি। ৮৫ থেকে ৯০ দিন এরা গর্ভধারণ করে। জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এরা আলাদা প্রজাতি। এরা মানুষের সান্নিধ্য পছন্দ করে না। তবে এরা পোষ মানে,মধ্য যুগের রাজা বাদশা ও সামন্ত প্রভুরা এদের পোষ মানানোর ইতিহাস আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বনে এদের জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক তথ্যই বিজ্ঞানীদের অজানা রয়ে গেছে।বাংলাদেশে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বনে বিলুপ্ত প্রায় বুনো প্রাণীদের সংরক্ষণ করা একান্ত জরুরি।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধযুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে