চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চন্দনাইশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ও সুষমায় পরিপূর্ণ। চট্টগ্রামের স্বনামধন্য চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেছেন ইতিহাসের অনেক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। ঐতিহাসিক চন্দনাইশের দক্ষিণ গাছবাড়িয়া গ্রামের বরুমতি নদীর পশ্চিম পাড়ে তিনি ৩০ জুন ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া। মাতার নাম আছিয়া খাতুন। ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করার পর তিনি কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ (সরকারি) কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। এ কলেজে এক বছর পড়ার পর বিশেষ কারণে কিছু সময় লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি নাজিরহাট কলেজে ভর্তি হন এবং এ কলেজ হতেই ১৯৬২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর আহমদ ছফা চলে যান ঢাকায়। ঢাকায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা (অনার্সে) ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালীন সময়ে লেখা পড়ার ইতি টানতে হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ হতে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে বি.এ (পাস) করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝড়া আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি এম.এ পরীক্ষা দেন যা ২৪ মার্চ শেষ হয় এবং ২৫ মার্চ রাতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পরীক্ষা শেষ করে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন কমরেড মোজাফর আহমদের পি.এ. হিসেবে।
জন্মগত মেধাবী আহমদ ছফা তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাকালীন সময় হতে কবিতা রচনা শুরু করেন যা সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ভাষা আন্দোলনের পক্ষে আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন মিটিং–মিছিলে যোগ দেন। দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তিনি ‘মহরম’ নামে এক প্রবন্ধ রচনা করেন।
১৯৬২ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘বরুমতির আঁকে বাঁকে’ প্রকাশ করেন। ১৯৬৩ সালে রনেশ দাশগুপ্তের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সে পরিচয়ের সূত্র ধরে রণেশ দাশগুপ্তের অনুপ্রেরণায় ‘কর্ণফুলির ধারে’ ধারাবাহিক রচনা দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয় এর পূর্বেই তাঁর তিনটি কবিতা দৈনিক সংবাদে প্রকাশ হয়। ইসলামিক একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ও অধ্যাপক শাহেদ আলী সম্পাদিত সবুজ পাতায় ‘অপূর্ব বিচার’ নামক একটি ছোট গল্প ছাপা হয়। কোনও পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর এটি প্রথম গল্প। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, ছোটগল্প লেখক, মিল্ল্লাত আলী অষ্টম শ্রেণির ছাত্রদের জন্য একটি পাঠ্য বই সম্পাদনা করলে তাতে ‘অপূর্ব বিচার’ গল্পটি স্থান পায়। এভাবেই ধীরে ধীরে লেখালেখির জগতে আহমদ ছফার প্রবেশ।
আহমদ ছফা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি আগরতলায় চলে যান এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে জহির রায়হানের সাথে আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান। আগরতলা হতে কলকাতা যাওয়ার পূর্বেই তিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশ করেন। পরে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ‘দাবানল’ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। একই সাথে ‘অভিযান’ নামক একটি পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এ সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ নামক পুস্তক রচনা করেন যা পরবর্তীতে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা প্রকাশ করে।
কলকাতায় তিনি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে থাকতেন। সে সময় টাকা পয়সার খুবই অভাব ছিল। এ অভাব অনটনের মাঝে অনেক সময় আলু সিদ্ধ করে খেয়ে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে। পরবর্তীতে এম. আর সিদ্দিকী তাঁকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তিনি স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্য ট্রেনিং–এ অংশ গ্রহণ করতে ইচ্ছে প্রকাশ করলে এম আর সিদ্দিকী তাঁকে অস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে কলম যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য পরামর্শ দেন। ফলে তাঁর বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করার স্বাদ পূরণ হয়নি। যার কারণে মুক্তিযোদ্ধার সনদও তাঁর জোটেনি।
আহমদ ছফা প্রায় ৫৬টির মত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যা তাঁর জীবিতকালেই প্রকাশিত হয় এবং ৫টির মত গ্রন্থ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে– বরুমতির আঁকেবাঁকে, (গল্প গ্রন্থ), তানিয়া, (রাশিয়ান উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ, মূল–পি.লিভড :১৯৬৭), ওঙ্কার (উপন্যাস:১৯৭৫) বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (প্রবন্ধ গ্রন্থ: ১৯৭২)। দোলো আমার কনকচাঁপা (ছোটদের গল্প গ্রন্থ :১৯৬৮), জাগ্রত বাংলাদেশ (প্রবন্ধ গ্রন্থ:১৯৭১), যদ্যপি আমার গুরু (জীবনীমূলক প্রবন্ধ গ্রন্থ :১৯৯৮)। গাভী বৃত্তান্ত (উপন্যাস :১৯৯০), অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (উপন্যাস :১৯৯৬)।
আহমদ ছফা একজন বড় লেখক হবার বাসনা নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন চট্টগ্রামের মত জায়গায় তিনি তাঁর মেধার বিকাশ ঘটাতে পারবেন না। যে কারণে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন প্রকৃত পক্ষে তা সার্থকই হয়েছে। এরপরও মাঝে মধ্যে তিনি গ্রামে আসতেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর আহমদ ছফা আমৃত্য আর গ্রামে আসেননি। কী কারণে? তা ভিন্ন বিষয়।
লেখক হিসেবে সফল এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সাহিত্যিক আহমদ ছফা ২৮ জুলাই ২০০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং প্রতিহিংসার কারণে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী মীরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাঁকে কবরস্থ করা হয়নি। মৃত্যুর পর ২০০২ সালে তাঁকে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। যা একজন সাহিত্যিকের জন্য সর্বোচ্চ দেশীয় সম্মান হিসেবে বিবেচিত।
তাঁর প্রকাশিত বিশাল গ্রন্থ ভাণ্ডারের মধ্যে ‘ওঙ্কার’ তার এক অনন্য সৃষ্টি। মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠার এ বইটিই আহমদ ছফাকে একটি কালজয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে পরিচিত দিয়েছিল। তিনি জার্মান ভাষা শিক্ষার উপর ডিপ্ল্লোমা অর্জন করেছিলেন এবং একজন জার্মান নাগরিক ফাদার ক্লাইফের সঙ্গে ‘বাংলা জার্মান সম্প্রীতি গড়ে তুলেছিলেন। আজীবন অকৃতদার এ মহান সাহিত্যিক ছিলেন আপাদমস্তক মানবতাবাদী মানুষ। অসামপ্রদায়িক এ সাহিত্যিক সারাজীবন মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখনির সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁর লেখা হতে একটি উদ্ধৃতি পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরছি। “যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশ ভাগ মৌলবাদী। কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবি করে থাকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল। পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনের ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একে বারে জড় বুদ্ধিসম্পন্ন।”
উপরোক্ত বর্ণনা হতে সহজেই বুঝা যায় যে তিনি প্রকৃত পক্ষে সাহসী ও ব্যতিক্রমধর্মী লেখক ছিলেন। তাঁর মতে সাহসী ও মেধাবী লেখকের জন্ম হয়েছিল বলেই বাংলা ভাষা আজ সারা বিশ্বে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। তিনি আজীবন বাংলা ভাষাভাষী অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষের মনে চির জাগরুক থাকবেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।











