অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারত্ব জোরদারে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সেবা সরকারি উদ্যোগের পরিপূরক। কোনো দেশের উন্নয়ন এককভাবে সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার, জনগণ, বেসরকারি খাত এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একযোগে কাজ করতে হয়। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারত্বভিত্তিক সেবা প্রদানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি গতকাল বিকেলে নগরীর জাকির হোসেন রোডস্থ সিএলএফ কমপ্লেক্সে চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের প্রকল্প চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সেবার পরিধি সমপ্রসারণের লক্ষ্যে নির্মিতব্য বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করছিলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি বলেন, বেসরকারি খাত ও এনজিও, বিশেষ করে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতাল তাদের দক্ষতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে, তা সরকারি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। তিনি চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, দুর্গম পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকায় মানুষের দোরগোড়ায় চক্ষুসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। লায়ন সদস্য ও সমাজের বিত্তবানদের অনুদানে পরিচালিত এ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সরকারি উদ্যোগের কার্যকর পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী হাসপাতালের আয়কর অব্যাহতির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে আধুনিক চক্ষু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও হাসপাতালের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের ম্যানেজমেন্ট কমিটির দক্ষ নেতৃত্ব ও সুশাসনের প্রশংসা করে সীমিত পরিসরে সেবার পরিধি বাড়াতে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগকে দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, লায়ন্স সদস্যরা মানব সেবার যে অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছেন মূলতঃ তা সরকারেরই কাজ। দুর্গম এলাকার প্রান্তিক পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের চক্ষু চিকিৎসাসহ চোখে আলো দেয়ার যে অনন্য এবং অসাধারণ কাজ লায়ন সদস্যরা করছেন সরকারের পক্ষে ওভাবে করা সম্ভব হতো না। লায়ন সদস্যদের কার্যক্রম সরকারেরই সহায়ক হয়ে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। তিনি লায়নিজমের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই সেবা সংগঠনকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব হয় না, তাই বেসরকারি পর্যায়ের সহায়তা সরকারের অনেক কাজ সহজ করে দেয়।
জাতিগতভাবে আমাদের সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো সেবার মনোভাব ঠিকঠাকভাবে গড়ে উঠেনি বলে মন্তব্য করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আপনারা যারা লায়নিজম করেন তাদের মনোভাব অন্যরকম। সেবার মানসিকতা আপনাদের মাঝে গড়ে উঠেছে, আপনারাই এক্ষেত্রে অগ্রপথিক। চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন নাসির উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রমের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে সেবার পরিধি সমপ্রসারণে প্রস্তাবিত নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ডিজিটাল নকশা উপস্থাপন করা হয়।
ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম তুলে ধরে হাসপাতালের সেবার পরিধি আরও সমপ্রসারণে প্রস্তাবিত ভবনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন নাসির উদ্দিন চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা লায়ন এম. আর. সিদ্দিকীসহ ফাউন্ডেশনের সাবেক সকল চেয়ারম্যানের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, লায়ন্স চ্যারিটেবল চক্ষু হাসপাতাল বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের চক্ষু চিকিৎসায় একটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। আমরা হাসপাতালটিতে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছি। অভিজ্ঞ চিকিৎসক টিমের তত্ত্বাবধানে এখানে চোখের সর্বাধুনিক চিকিৎসা কার্যক্রম চলে। তাই এখানে শুধু গরীব বা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষই নন, সামর্থ্যবানেরাও চিকিৎসা নেন। ধনীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা সেবা প্রদান করি। এখানে যত বেশি সামর্থ্যবান মানুষ চিকিৎসা নিতে আসবেন আমরা তত বেশি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ফ্রি চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে পারবো। তিনি প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন।
লায়ন নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এটি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, কারো ব্যক্তিগত লাভের কোনো সুযোগ এখানে নেই। লায়ন সদস্যরা ডোনেশন দিয়েই এটি পরিচালনা করেন, তাই এই হাসপাতালকে ইনকামট্যাঙের আওতামুক্ত রাখার জন্য তিনি মন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করেন।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান লায়ন কামরুন মালেক, মাল্টিপল ডিস্ট্রিক্ট ৩১৫–এর কাউন্সিল চেয়ারপার্সন ও প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ (অপু), লায়ন্স ডিস্ট্রিক্ট ৩১৫–বি৪ বাংলাদেশের ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন কামরুজ্জামান লিটন, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক, প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন এম এ মালেক বক্তব্য রাখেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, পরিকল্পিত ও নান্দনিক নগরায়ণের জন্য প্রতিটি স্থাপনা সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্মাণ করা জরুরি। তিনি প্রস্তাবিত বহুতল ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে চট্টগ্রাম আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।
ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারম্যান লায়ন এম এ মালেক জাতীয় সংগীতের ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’ লাইনের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, মায়ের এই বদনখানি মলিন না হওয়ার জন্যই লায়ন সদস্যরা কাজ করেন, আমরা লায়নিজম করি। তিনি হাসপাতালটির উন্নয়নসহ লায়নিজমের বিকাশে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সহায়তা কামনা করেন।
ফাউন্ডেশনের ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে ভাইস–চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন কামরুন মালেক চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের প্রকল্প চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সেবার পরিধি সমপ্রসারণের যে মহান লক্ষ্য নিয়ে সিএলএফ অগ্রসর হচ্ছে তাতে সহায়তা প্রদান এবং পাশে থাকবার জন্য মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের জন্য কিছু করছি না। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের চোখের আলো যাতে নিভে না যায়, আমরা যেনো তাদের পাশে থাকতে পারি সেজন্য এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবার সম্মিলিত সহায়তা এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মুখেই হাসি ফুটবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভায় লায়ন্স কমপ্লেঙের প্রবেশদ্বার প্রশস্তকরণসহ লায়ন্সের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম তুলে ধরা হয় এবং সেবার পরিধি সমপ্রসারণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহে সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনাল, ডিস্ট্রিক্ট ৩১৫–বি৪ বাংলাদেশের প্রথম ভাইস ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন মো. আবু বক্কর সিদ্দিকী, দ্বিতীয় ভাইস ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন পারভীন মাহমুদ এফসিএ, প্রাক্তন জেলা গভর্নরদের মধ্যে লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়া, লায়ন ডা. শ্রী প্রকাশ বিশ্বাস, লায়ন মো. কবিরউদ্দিন ভূঁইয়া, লায়ন মো. আসলাম চৌধুরী এফসিএ, লায়ন এস. এম. শামসুদ্দিন, লায়ন মো. মোস্তাক হোসেন, লায়ন শাহ আলম বাবুল, লায়ন মো. এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং লায়ন কোহিনূর কামাল; চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ জামিল চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ফাউন্ডেশনের ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে সেক্রেটারি লায়ন ডা. দেবাশীষ দত্ত, ট্রেজারার লায়ন এস. জোহা চৌধুরী, অ্যাসোসিয়েট সেক্রেটারি লায়ন এস. এম. আশরাফুল আলম আরজু, চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. প্রকাশ কুমার চৌধুরী, প্রস্তাবিত বহুতল ভবন নির্মাণের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান লায়ন ইঞ্জি. মানজারে খোরশেদ আলম, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট লায়ন সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের ২০২৫ ও ২০২৬ মেয়াদের গভর্নিং বডি ও আজীবন সদস্যবৃন্দ, হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. আলতাফ উদ্দিন খান, উপ–পরিচালক ডা. শাবানা সুলতানা, সহকারী পরিচালক মিসেস ইনসাফি হান্না এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।












