সাতকানিয়ায় অসময়ে টমেটো চাষ করে সাফল্য পেয়েছে কয়েকজন কৃষক। মালচিং পেপার ব্যবহার করে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল টমেটো চাষ করে কৃষকরা বাজিমাত করেছেন। অল্প সময়ে ৪–৫ গুণ বেশি লাভ পাওয়ায় এ পদ্ধতি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে এলাকার আবাদি জমিগুলো যখন খালি পড়ে থাকে ঠিক তখনই টমেটো চাষ করা যাচ্ছে। ফলে অসময়ের টমেটো চাষকে ঘিরে কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করে অধিক লাভ পাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগও।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ছদাহা ইউনিয়নের খোর্দ কেওচিয়া ব্লকের মিঠার দোকান ও মাঝের পাড়া এলাকায় বিলে শোভা পাচ্ছে টমেটো ক্ষেত। ক্ষেতের প্রত্যেকটি গাছে ঝুলছে কাচা পাকা টমেটো। মিঠার দোকান এলাকায় নিজের ক্ষেত থেকে কৃষক মো. আবুল হাশেম জানান, খোর্দ কেঁওচিয়া মাঝের পাড়া এলাকায় কৃষক মো. আবুল ফয়েজকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটোর প্রদর্শনী প্লট দিয়েছে। তিনি সরকারিভাবে পাওয়া চারার পাশাপাশি নিজেও গ্রাফটিং চারা এনে রোপণ করেছে। আমিও ফয়েজের মাধ্যমে রংপুর থেকে গ্রাফটিং চারা সংগ্রহ করে ১২ গন্ডা জমিতে রোপণ করেছি। চারা রোপণের পর থেকে টানা ১০ দিন বৃষ্টি ছিল। কিন্তু টমেটোর চারার কোনো ক্ষতি হয়নি। চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। রোপণের ৬০তম দিন থেকে টমেটো আহরণ শুরু করি। ৭০তম দিনের মধ্যে ৪ বার টমেটো আহরণ করেছি। এ জমিতে আগে পেঁপে বাগান ছিল। ওই পেঁপে ক্ষেতের মালচিং পেপার ও খুঁটি টমেটো ক্ষেতে ব্যবহার করেছি। চারা সংগ্রহ, জমি তৈরি, পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও জমির খাজনা থেকে শুরু করে সব মিলিয়ে ১২ গন্ডা জমিতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করেছি। স্থানীয় বাজারে কেজি ১০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে বারি ৮ জাতের উচ্চফলনশীল টমেটোগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। খেতের গাছগুলোতে এখন যে পরিমাণ টমেটো রয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সব মিলিয়ে ৪ লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করা যাবে। ৫০ হাজার টাকা খরচ বাদ দিলে আরো সাড়ে ৩ লাখ টাকা লাভ হবে।
আবুল হাশেম আরো জানান, অসময়ে টমেটো চাষ আগে কখনো করিনি। এবারে প্রথম করেছি। এখন ১ কেজি ১০০ টাকা দামে পাইকারি বিক্রি করছি। আর রবি মৌসুমে প্রতি কেজি টমেটো ৩–৪ টাকায়ও বিক্রি করতে হয়। অসময়ে চাষ করে খরচের প্রায় ৬–৭ গুণ লাভ পাচ্ছি। একদিকে পাকা টমেটো সংগ্রহ করছি, অন্যদিকে ফুল আসছে। আমি যখন টমেটো চারা রোপন করি তখন আশপাশের জমি খালি পড়ে ছিল। জুন থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত জমি খালি পড়ে থাকে। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে কেউ আমন, আবার কেউ শাক সবজি চাষ শুরু করে। আর ওই সময়টাতে টমেটো চাষ করে ভাল লাভ মিলছে। গ্রাফটিং চারা নিয়ে টমেটো চাষ করলে বৃষ্টিতে কোন ক্ষতি হয় না। চারা রোপণের পর টানা বৃষ্টি ছিল। একটি গাছও ক্ষতি হয়নি। গ্রাফটিং চারা বৃষ্টির পানি সহনশীল। ভাল ফলন পাওয়ায় আরো ১২ গন্ডা জমিতে রোপণ করার জন্য চারা নিয়ে এসেছি এবং আরো ১ কানি জমির জন্য চারা অর্ডার দিয়েছি। শীতকালীন টমেটোর চেয়ে অসময়ে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষ অনেক বেশি লাভজনক। আগামী বছর থেকে ৮–১০ কানি জমিতে গ্রাফটিং চারা এনে টমেটো চাষ করবো।
ছদাহা খোর্দ কেওচিয়া মাঝের পাড়ার কৃষক মো. আবুল ফয়েজ জানান, আমি গ্রাফটিং চারা নিয়ে ১০ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছি। এরমধ্যে ৩ শতক জমির চারা কৃষি অফিস থেকে দিয়েছে। বাকীগুলো রংপুরের নাশিক প্লান্ট এন্ড পট থেকে সংগ্রহ করেছি। চারা সংগ্রহ, মালচিং পেপার, জমি তৈরি, পরিচর্যা, সার, জমির খাজনা ও খুঁটিসহ মোট ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন খুব ভাল হয়েছে। কয়েকবার সংগ্রহও করেছি। শিশুতল পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। সব মিলিয়ে প্রতি গাছে ৩০ টাকার মতো খরচ হয়েছে। এখন প্রতি গাছে ১ থেকে ৩ কেজি টমেটো রয়েছে। সব ঠিক থাকলে খরচের চেয়ে ৪–৫ গুণ বেশি লাভ হবে। আগামী বছর থেকে আরো অধিক জমিতে টমেটো চাষ করবো। গ্রাফটিং চারা দিয়ে অসময়ে টমেটো চাষ লাভজনক হওয়ায় এলাকার অনেক কৃষকও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
খোর্দ কেঁওচিয়া ব্লকের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আয়ুব আলী জানান, আমার ব্লকে প্রথম বারের মতো গ্রাফটিং চারা দিয়ে অসময়ে ২ জন কৃষক টমেটো চাষ করেছে। দুই জনের ক্ষেতে ফলন খুব ভাল হয়েছে। অসময়ে টমেটোর ভাল ফলন দেখে অন্যান্য কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং আগামীতে অসময়ে টমেটো চাষের আগ্রহ প্রকাশ করছে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ২০২৫–২৬ অর্থ বছরে রাজস্ব খাতের অর্থায়নে সাতকানিয়ায় ৮ জন কৃষককে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে অসময়ে টমেটো চাষের জন্য প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়। ছদাহা, খোর্দ কেওচিয়া, চুড়ামনি, বড়দুয়ারা ও দক্ষিণ কাঞ্চনা এলাকায় এসব প্রদর্শনী প্লট করা হয়। আবার কয়েকজন কৃষক নিজ উদ্যোগে উচ্চফলনশীল গ্রাফটিং চারা সংগ্রহ করে টমেটো চাষ করেছে। মালচিং পেপার ব্যবহার করে গ্রাফটিং চারা দিয়ে টমেটো চাষের অনেক সুবিধা রয়েছে। মালচিং পেপার ব্যবহার করলে আগাছা জন্মায় না, মাটির আদ্রতা বজায় থাকে, শিকড়ে পচন ধরে না ও ভালো ফলন পাওয়া যায়। তিনি আরো জানান, বেগুন চারার গোড়ার অংশ এবং উচ্চফলনশীল টমেটো চারার উপরের অংশ জোড়া লাগিয়ে গ্রাফটিং করা হয়। গ্রাফটিং চারা দিয়ে টমেটো চাষ করলে রোগ বালাই কম হয় এবং ফলন বেশি হয়। অসময়ে ফলন পাওয়ায় বাজারে দামও মিলে বেশি।












