সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বাণিজ্যিক স্থাপনা!

নতুন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা নির্মাণ করছে পুরনো সিন্ডিকেট প্রতি বর্গফুটে চসিক ভাড়া পাবে মাত্র ১০ টাকা জনস্বার্থ বিরোধী কিছু হলে ব্যবস্থা নেব : মেয়র

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ৫ মে, ২০২৬ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

নগরের চকবাজারমুরাদপুর সড়কের কাতালগঞ্জে রাস্তার পাশে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে নির্মাণ করা হচ্ছে বাণিজ্যিক স্থাপনা! যার বৈধতা দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। বিনিময়ে সংস্থাটি ১ কোটি ৩ লাখ টাকা ‘উন্নয়ন চার্জ’ এবং মাসে বর্গফুট প্রতি মাত্র ১০ টাকা হারে ভাড়া আদায় করবে। অথচ জায়গাটির মালিক গণপূর্ত অধিদপ্তর। ইতোপূর্বে চসিককে চিঠি দিয়ে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে আপত্তিও দিয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

কাতালগঞ্জে এ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করছে ‘নাশা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চসিক মেয়র বরাবর সৌন্দর্যবর্ধনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। পরবর্তীতে গত বছরের ডিসেম্বরে চসিক শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয়।

এদিকে নগরবাসী বলছেন, শহরে নানা কারণে কমেছে উন্মুক্ত জায়গা। কমেছে মানুষের নিশ্বাস ফেলার স্থান। এ অবস্থায় যতটুকু উন্মুক্ত জায়গা আছে তা রক্ষা করা প্রয়োজন। তাই চসিকের উচিত বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বেরিয়ে জনস্বার্থে কাতালগঞ্জের জায়গাটি উন্মুক্ত রাখা। প্রয়োজনে সেখানে বাগান করে মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, কাতালগঞ্জের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প আমি সরেজমিন দেখব। যদি সেখানে জনস্বার্থ বিরোধী কিছু হয় তাহলে ব্যবস্থা নিব। বেশি দোকানপাট হবে না সেখানে।

হবে ‘সুপার শপ ও কফি শপ’ : ‘নাশা এন্টারপ্রাইজ’এর আবেদন ও চসিকের অনুমোদন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, পাঁচলাইশ থানা সংলগ্ন শ্রম আদালত থেকে কাতালগঞ্জ বৌদ্ধ মন্দির পর্যন্ত অংশে এ সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ৫ হাজার বর্গফুট জায়গা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া পুরো অংশে সৌন্দর্যবর্ধন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন, সবুজায়ন ও পরিত্যক্ত ভূমিতে একটি যাত্রী ছাউনি ও একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে বলে চসিক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে ‘নাশা এন্টারপ্রাইজ’এর আবেদন অনুযায়ী, সুপার শপ, মেডিসিন কর্নার, রেসটুরেন্ট, কফি শপ, বেকারি এন্ড সুইটস কর্নার, বড় দুইটি ওয়াটার ফাউন্টেন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্নার ও জুলাই অভ্যুত্থান কর্নার হবে। হবে কিডস্‌ জোন, ফ্রিহ্যান্ড জিম ও লাইব্রেরি। রোড ডিভাইডার বা মিড আইল্যান্ডে বিজ্ঞাপনী বোর্ড থাকবে। এর মধ্যে ১০০ বর্গফুট এলইডি ডিসপ্লে ও ৬ বর্গফুট করে প্রতি ২০ ফুট পর পর বিজ্ঞাপনী ডিজিটাল ডিসপ্লে দেয়া হবে। ‘বাণিজ্যিক’ হলেও বিষয়গুলোকে প্রকল্পের সুবিধা বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া থাকবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মেয়রের ছবি ফলক।

গতকাল সোমবার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিশাল একটা অংশ টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। সেখানে চলছে দোকান আকৃতির স্থাপনা নির্মাণ কাজ। পিলার নির্মাণে লোহার রড বাঁধা হচ্ছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি গাছ রয়েছে। এ গাছগুলো শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকবে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা অংশের পাশে কয়েকটি পাকা স্থাপনা নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। যার অবকাঠমো দোকানের মত।

এখানে দায়িত্বপালনরত একজন কেয়ারটেকার আজাদীকে বলেন, এখানে কি হবে আমি জানি না। দুই মাস ধরে কাজ চলছে।

প্রতিষ্ঠান নতুন, ব্যক্তি পুরনো : ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী প্রথম কাতালগঞ্জে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। এরপর একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সেখানের একাংশে নির্মিত কিডস জোন ও জিম সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। ওই সময় সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজটি বাস্তবায়ন করছিল ‘মিরাক্যাল মাইলস ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকতা পরিচয় দিতেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক। যিনি বর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘নাশা এন্টারপ্রাইজ’এর স্বত্ত্বাধিকারী। অর্থাৎ নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে পুরনো ব্যক্তিরাই প্রকল্পটি বস্তবায়ন করছে।

তবে নতুন প্রকল্পে ‘কৌশলগত’ কারণে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুরনো প্রকল্পে ‘স্মৃতিতে বায়ান্ন, স্মৃতিতে একাত্তর, বীর শ্রেষ্ঠদের ম্যুরাল, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, সরকারের উন্নয়ন চিত্রের ডিস প্লে বোর্ড, সাবেক মেয়রদের ম্যুরাল’ বসানোর কথা ছিল। যা নতুন প্রকল্পে নেই।

জানা গেছে, ২০২৩ সালে একটি অংশে কিডস জোন চালু করার পর ইবনে সিনার সামনের অংশ টিন দিয়ে ঘেরাও করা হয়। ওই সময় কাজ শেষ হওয়া ছোট আকৃতির কিডস জোনে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা বিনামূল্যে বিভিন্ন রাইড উপভোগ করার সুযোগ পেতেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বন্ধ হয়ে যায় ওই কিডস জোন। দীর্ঘদিন সেটা তালাবদ্ধ ছিল। যেখানে বর্তমানে দোকান আকৃতির অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ‘নাশা এন্টারপ্রাইজ’এর স্বত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক আজাদীকে বলেন, কিডস জোন, ওয়াকওয়ে, যাত্রী ছাউনি ও একটি পাবলিক টয়লেট করা হবে। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে জানতে চাইলে বলেন, জুলাই পর্যন্ত লাগতে পারে।

তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে যেগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো এলাকাবাসীর প্রয়োজনীয় হিসেবে সিটি কর্পোরেশন যতটুকু প্রয়োজন মনে করছে তা দিয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের বাইরে গিয়ে আমার কিছু করার এখতিয়ার নেই। আমাকে লিজ দেয়া হয়েছে। লিজের বিনিময়ে পেঅর্ডার ও যা ফর্মালিটিস আছে তা পূরণ করেছি। কাজটা শেষ করা পর্যন্ত আমাকে সময় দিতে হবে। যদি কাজটা শেষ করতে পারি তাহলে এটা সিটি কর্পোরেশন বা এলাকাবাসীর জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

চসিকের লাভক্ষতি :

প্রকল্পটির জন্য জায়গা বরাদ্দ দিয়ে চসিক উন্নয়ন চার্জ হিসেবে পাবে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে একটি যাত্রী ছাউনি বিপরীতে চার্জ বাবদ ২ লাখ টাকা ও ১টি টয়লেট নির্মাণ বাবদ ১ লাখ টাকা পাবে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য প্রতি বর্গফুটের বিপরীতে পাবে ২ হাজার টাকা করে। এখানে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হবে ৫ হাজার বর্গফুট। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যবহারের জায়গা থেকে চসিক উন্নয়ন চার্জ পাবে ১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতি বর্গফুটের বিপরীতে ১০ টাকা হারে ৫ হাজার বর্গফুটের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করবে চসিক।

জানা গেছে, যাত্রী ছাউনি, টয়লেট ও ৫ হাজার বর্গফুট জায়গা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বরাদ্দের প্রাথমিক মেয়াদ ধরা হয়েছে ৭ বছর। এদিকে এক কোটি ৩ লাখ টাকা উন্নয়ন চার্জের বিপরীতে চসিককে নাশা এন্টারপ্রাইজ পরিশোধ করেছে মাত্র ২৩ লাখ টাকা। উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর অবশিষ্ট উন্নয়ন চার্জ প্রদান করবে প্রতিষ্ঠানটি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আপত্তি :

২০২৩ সালে ২১ ডিসেম্বর চসিককে একটি চিঠি দেয় চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ১। এতে বলা হয়, সৌন্দর্যবর্ধন কাজের সাথে কিছু বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। সৌন্দর্যবর্ধন কাজের অধীনে নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ব্যতীত কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ না করার জন্য অনুরোধ করা হয় ওই পত্রে।

একই পত্রে বলা হয়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পাঁচলাইশ আবাসিক জোন গড়ে তোলার জন্য তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে ৬৯ দশমিক ৩৫৭ একর জমি তৎকালীন ইমারত পরিদপ্তর বা বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নামে অধিগ্রহণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট প্লট আকারে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। আবাসিক এলাকার রাস্তাসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৯৮৮ সালে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়। যার প্রেক্ষিতে রাস্তা সমপ্রসারণ, মেরামত, ফুটপাত সংস্কারসহ আনুষঙ্গিক কাজসমূহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক অদ্যাবধি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কী বলছেন নগরবাসী :

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার আজাদীকে বলেন, শারীরিক এবং মানসিকএই দুই স্বাস্থ্যের জন্যই শহরে কিছু উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বা স্থান দরকার। শিশুদেরকে যেভাবে খেলাধূলার জায়গায় বঞ্চিত করছি সেখানে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম পাব না। এ অবস্থান থেকে আমরা সবসময় বলি, যতটুকু মুক্ত এলাকা রাখা যায় ততই ভালো। যে জায়গা উন্মুক্ত আছে সে জায়গায় যদি স্থাপনা তৈরি হয়, বিশেষ করে বাণিজ্যিক কারণে স্থাপনা তৈরি হয়, তাহলে আমরা হচ্ছি সেই লোভী প্রাণী যারা নিজের প্রজাতিকে খেয়ে ফেলে।

তিনি বলেন, নগরবাসীর স্বাস্থ্যরক্ষা করার জন্য কিছু মুক্তাঙ্গণ দরকার। যেখানে বাতাস খেলবে এবং যেগুলো পরিবেশ ভালো রাখার জন্য ভূমিকা রাখবে। এ জায়গায় যদি আমরা ক্রমান্বয়ে দোকানপাট করে ফেলি সেটা আর্দশিক অবস্থান হবে না। এরকম কিছু না হওয়া উচিত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল সম্ভাবনা