আন্তর্জাতিক রুটের বাংলাদেশি যাত্রীদের মাত্র ২০ শতাংশ পরিবহন করে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো। বাকি আশি শতাংশ পরিবহন করে বিদেশি এয়ারলাইন্স। এক্ষেত্রে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি বিশাল এক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিকল্পনার অভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের যাত্রীদের পরিবহনে প্রয়োজন অন্তত ১৫০টি এয়ারক্রাফট। অথচ সরকারি–বেসরকারি মিলে দেশের এয়ারক্রাফটের সংখ্যা ৪০টির নিচে। বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট অপারেট শুরু করলেও নানামুখী প্রতিবন্ধকতায় ব্যবসা গুটাতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারের কোটি কোটি টাকা নিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতিমুক্ত পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের এভিয়েশন সেক্টরকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমেরিকার ১৩১টি এয়ারক্রাফট সমৃদ্ধ স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে গেছে। তাদের কাছ থেকে কিনে অথবা লিজে বিমান এনে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ঠিকভাবে করতে পারলে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরের চেহারা পাল্টে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর অনেক বড়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে অন্তত এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী থাকেন। বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর দেশে আসা–যাওয়া এবং নতুন করে চাকরির জন্য বিদেশ যাওয়া মিলে অন্তত ২৫ লাখ মানুষ বিশ্বের নানা দেশে যাতায়াত করেন। এর বাইরে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এবং ভারতে যান অন্তত ৮ লাখ মানুষ। পর্যটন এবং শপিং করতে যান ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ। এছাড়া ব্যবসা–বাণিজ্যের জন্য দুই লাখের মতো মানুষ প্রতি বছর নানা দেশে ভ্রমণ করেন।
দেশের ট্রাভেল বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অন্তত ৫০ লাখ মানুষ প্রতি বছর বিশ্বের নানা দেশে বিমানে যাতায়াত করেন। বছর কয়েক আগে ফ্রান্সের এয়ারবাস কোম্পানি গ্লোবাল মার্কেট ফোরকাস্ট প্রকাশ করেছিল, বাংলাদেশের চাহিদা পূরণ করতে ১২০টি যাত্রীবাহী বিমান দরকার। এর ৮০ শতাংশ লাগবে ওয়াইড বডির এয়ারক্রাফট। কার্গো বিমান লাগবে কমপক্ষে ৫০টি। যদি বাংলাদেশ সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিমান সংস্থা এই পরিমাণ বিমান কিনতে না পারে তাহলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো পুরো সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করবে। এখন দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো পরিবহন করছে। কয়েক বিলিয়ন ডলারের এই বাজারের পুরো নিয়ন্ত্রণ বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর হাতে।
জানা যায়, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং ইউএস–বাংলা এয়ারলাইন্স কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হাতে ১৯টির মতো এয়ারক্রাফট রয়েছে। এর মধ্যে বোয়িং ৭৩৭, ৭৭৭, ৭৮৭–এর পাশাপাশি কয়েকটি ছোট ড্যাশ–৮ এয়ারক্রাফট রয়েছে। অপরদিকে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস–বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে ২৫টির মতো এয়ারক্রাফট রয়েছে। এর মধ্যে বোয়িং ৭৩৭, এয়ারবাস এ ৩২০ এবং ছোট আকৃতির এটিআর–৭২ এয়ারক্রাফট রয়েছে। দেশের সরকারি–বেসরকারি এই দুটি এয়ারলাইন্স বিশ্বের ত্রিশটির মতো গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করে। এগুলোর বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। দূরের ফ্লাইটের মধ্যে বাংলাদেশ বিমান শুধুমাত্র টরন্টোতে যাতায়াত করে। লন্ডনের সাথে একটি ফ্লাইট জনপ্রিয় হলে এবং প্রচুর যাত্রী পেলেও তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরকে উন্নত করার সুযোগ রয়েছে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের কথা বাদ দিলেও ভিয়েতনামের মতো দেশ একের পর এক এয়ারক্রাফট কিনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এভিয়েশন সেক্টর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভারতের এভিয়েশন সেক্টরও বিশাল। অপরদিকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় সেক্টর ধুঁকছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে সমৃদ্ধ করার একটি উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং কিনছে। আমেরিকা থেকে এই বোয়িং কেনার পেছনে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্ডার দেওয়া বোয়িং পাওয়া যাবে অন্তত ৫ বছর পরে। অথচ এখন বড় ধরনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যাতে সাথে সাথে ভালো মানের এয়ারক্রাফট পাওয়া যাবে, আবার আমেরিকার সাথে বাণিজ্য ঘাটতিও কমবে।
শীর্ষস্থানীয় একজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ জানান, ইরান যুদ্ধের জেরে ১৩১টি প্লেন নিয়ে ৩৪ বছরের পুরনো আমেরিকার স্পিরিট এয়ারলাইন্স গত ২ মে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। দুই বছর আগে থেকেই তারা জেটব্লু এয়ারলাইন্সের সাথে মার্জার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমেরিকার সরকার অনুমতি দেয়নি। আগেও তারা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার চেষ্টা করলেও সরকার করতে দেয়নি। এবার যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে স্পিরিট এয়ারলাইন্স নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার সুযোগ পায়।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, এই এয়ারলাইন্সের বহরে চলা এয়ারক্রাফটগুলোর মান অত্যন্ত ভালো। এগুলো আমেরিকার আকাশে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেছে। এগুলো ফ্রান্সের বিখ্যাত বিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের। বিমানগুলি এয়ারবাসের যুক্তরাষ্ট্রের মোবিল শহরের এলাবামার এসেম্বলি লাইনে তৈরি এ–৩২০ ফ্যামিলির এ ৩২০ নিইও এবং এ৩২১ এনইও মডেলের। এয়ারক্রাফটগুলো প্রায় নতুন এবং ফুয়েল এফিসিয়েন্ট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশে বিমানের বহরে সিঙ্গেল আইল বা স্বল্প পাল্লার যে বোয়িং ই৭৩৭–৮০০ রয়েছে এবং এমএএঙ নামের যে ৪টির অর্ডার দিয়েছে সেগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন বিশ্বে এনইও সিরিজ জনপ্রিয়। স্পিরিট এয়ারলাইন্সের বিমানগুলোর মধ্যে অন্তত কয়েকটি যদি বাংলাদেশ লিজ বা কিনে নিতে পারে তাহলে এখনই সেগুলো বিমানের বহরে যুক্ত করার সুযোগ পাবে। কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়িয়ে স্পিরিট এয়ারের ১৩১টি প্রায় নতুন এয়ারক্রাফটের মধ্যে ৩০টির মতো যদি বাংলাদেশের সরকারি–বেসরকারি এভিয়েশন সেক্টর নিতে পারে তাহলে দেশের বিমান পরিবহন সেক্টরের চেহারা পাল্টে যাবে। এতে প্রতি বছর দেশের কয়েক বিলিয়ন ডলার ঘরে থাকবে।














