দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত ও অপরাধ কমাতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স তিন ধাপে একটি বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে। পরিকল্পনার মূল তিন ধাপের প্রথম ধাপ (তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন): যেসব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে থানার কার্যক্রমে গতি আনা এবং জরুরি পদক্ষেপগুলো নেওয়া। দ্বিতীয় ধাপ (১ থেকে ২ বছরের মধ্যে): এই ধাপে জেলা ও মেট্রোপলিটন পর্যায়ে সাইবার অপরাধ ইউনিট গঠন, জেলা পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধ সেল তৈরি, অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য সংরক্ষণে স্বয়ংক্রিয় তথ্যভাণ্ডার এবং সাক্ষী ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ডেস্ক ও এসএমএস নোটিফিকেশন চালুর প্রস্তাব রয়েছে এবং তৃতীয় ধাপ (২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে): অপরাধপ্রবণ এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি চালু এবং অপরাধ তদন্তকে ডিজিটাল করতে ‘ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম‘ প্রবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘটনাগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিসহ সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গত রোববার টিআইবির এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাড্ডা এমসিএইচে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখল সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর দৃষ্টান্ত।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেব্ল, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এসব কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে, যা সরকারের জন্য অশনিসংকেত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সামাজিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শিথিলতা বর্তমানে জাতিকে এমন এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা একেবারেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সমাজে সংঘটিত ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির নগ্ন প্রকাশ। এর সঙ্গে যখন যোগ হয় পারিবারিক কলহের জেরে জন্মদাতা পিতার হাতে অবোধ শিশুদের বিষপানের মতো ভয়াবহ পরিণতি কিংবা দাম্পত্য বিরোধের জেরে একই পরিবারের একাধিক মানুষের লাশ উদ্ধারের ঘটনা, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও স্বাভাবিক জীবনবোধ আজ নিদারুণ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে এবং এর পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমাজবিরোধীদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই সুযোগসন্ধানী অপরাধীচক্র এর ফায়দা লুটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে মানবাধিকারে আঘাত লাগে তা অনস্বীকার্য। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এ সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অর্থাৎ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা বলেন, বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কারণ ও করণীয় দিকনির্দেশনা প্রত্যেকটি বিষয় সমান্তরালে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উৎসে নজর দিতে হবে যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে। একই সঙ্গে এই সত্যও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, অপরাধী যত কৌশলই অবলম্বন করুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তাদের ধরা পড়তেই হবে এবং বিচারে প্রাপ্য দণ্ডটুকুও ভোগ করতে হবে। এ ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানোর পাশাপাশি জনমনে শান্তি ফেরানোর পথ অনেকটাই কণ্টকমুক্ত হবে, শান্তিপ্রিয়দের এই প্রত্যাশায় যাতে চিড় না ধরে তা নিশ্চিত করার দায় সরকারেরই। মনে রাখতে হবে, যে কোনো স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত জননিরাপত্তা। এই ভয়াবহ অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আইনি কাঠামোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।










