রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে পঞ্চম দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে, সাজেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে সমঝোতা হলেও একটি দাবিতে মতপার্থক্য থাকায় বৈঠকটি অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়। গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক–বাঘাইহাট সড়কের ১০ নম্বর এলাকা, হাজাছড়া ও মাচালংসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে অবরোধ পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিরসনে এদিন বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সাজেক উজোবাজারে প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আন্দোলনকারীরা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবি, চারটি বিষয়ে প্রশাসন সম্মত হলেও জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সমঝোতা হয়নি।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে–অবরোধকারীদের ওপর ‘বিনা উসকানিতে হামলার’ সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি এবং হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে বাঘাইহাট ও মাচালং ক্যাম্পের দুই কমান্ডারকে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বদলি করা। এছাড়া ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও এক হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা মামলাকে ‘মিথ্যা নাটক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান তারা। দ্বিতীয় দাবিতে উজোবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং বাজার থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় দাবিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মারধরে আহত নারী–পুরুষের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
চতুর্থ দাবিতে জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের দ্রুত সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চম দাবিতে আন্দোলনকারীদের কাউকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করা এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানোর দাবি জানানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূইয়া, রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত, পুলিশ সুপার মোরতোজা আলী খাঁন, বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান ও সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা, সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং ছাত্র–জনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা।
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্র–জনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠক হয়েছে। আমাদের পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি প্রশাসন মেনে নিলেও চতুর্থ দাবি নিয়ে সমঝোতা হয়নি। এ দাবি সমাধানে প্রশাসন তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছে। আমরা পাঁচ দিন সময় দিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন তাতে রাজি না হওয়ায় বৈঠক অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়েছে।
গতরাতে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে এক সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা হয়েছে। পাঁচটি দাবির বিষয়ে মোটামুটি সমঝোতা হয়েছে, তবে একটি বিষয়ে কিছুটা বাকি রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাতে আলোচনা আর এগোনো হয়নি। আগামী এক–দুই দিনের মধ্যে বাকি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে শিগগিরই অবরোধ প্রত্যাহার করে সড়ক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে, সাজেকের পরিস্থিতি, স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও জননিরাপত্তা নিয়ে মতবিনিময় করতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের গঠিত তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল সকালে বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে হেডম্যান ও কার্বারিদের সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় ইউএনও আমেনা মারজান, কমিটির সদস্য ভবতোষ দেওয়ান, শান্তিবিজয় চাকমা ও কল্যাণমিত্র চাকমা, বাঘাইছাড়ি থানার ওসি নাসির উদ্দিন মজুমদার, সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন, সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা, বিএনপির নেতারা এবং স্থানীয় হেডম্যান–কার্বারিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে মতবিনিময় সভায় আন্দোলনরত দুটি সংগঠনের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি।
জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির সদস্য শান্তিবিজয় চাকমা বলেন, সাজেকের পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, হেডম্যান ও কার্বারিদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তবে আন্দোলনরত দুটি সংগঠনের কেউ সভায় আসেননি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে অবহিত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।












