শ্রদ্ধাঞ্জলি : আশা ভোঁসলে

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:২১ পূর্বাহ্ণ

উপমহাদেশের যে ক’জন সংগীতশিল্পী দেশকাল পাত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, তাঁদের শেষের জন চলে গেলেন ১২ এপ্রিলের দুপুরে। অনেকটাই আকস্মিকভাবে। আগের দিন সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে ব্রিজ ক্যন্ডি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। জীবনের আগের শেষ দিনটিতেও কর্মক্ষম ছিলেন। ৯২ বছরের সুদীর্ঘ জীবনের শেষ দিনগুলিতেও সংগীত সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন এই সংগীত সাধিকা। আশা ভোঁসলেস্বনামেই যিনি বিশেষায়িত।

একটি সংগীত পরিবারের তিন প্রজন্মের সকল সদস্য সংগীত সাধনায় নিয়োজিত এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের সবাই জননন্দিত, এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। ‘কিংবদন্তী’ শব্দটি এখন যত্রযত্র ব্যবহারের ফলে রীতিমতো ক্লিশে হয়ে গেছে। কিন্তুু প্রকৃত অর্থেই এই ‘মঙ্গেশকর’ পরিবারটি কিংবদন্তী ও পরম শ্রদ্ধাভাজন। প্রথম প্রজন্মের পন্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মার্গসংগীত এবং মারাঠি নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক। তাঁর স্ত্রী সেমন্তী মঙ্গেশকরও ছিলেন স্বামীর অনুবর্তিনী। তাঁদের চার কন্যা ও এক পুত্রের প্রত্যেকই উপমহাদেশের সংগীত জগতের একেকজন দিকপাল এবং একেকটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। পিতার অকাল প্রয়ানের কারণে এই পাঁচ ভাইবোনকে দুঃসহ জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে জ্যেষ্ঠ ভগ্নী লতার নেতৃত্বে। পারিবারিক অনটনের কারণে চার বোনের সংগীত ও অভিনয়ে আগমন। ‘বড়িমা’ নামের একটি ছবিতে শৈশবে চারবোন মিলে অনাথ বালিকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবির নায়িকা ছিলেননূরজাহান। আশার চরিত্রটি ছিল এক বাঙালি অনাথ বালিকার। কাকতালীয়ভাবে শৈশবেই আশার বাঙালি সংযোগের সূচনা। লতা আরও আগে থেকে অভিনয় করতেন শিশু চরিত্রে, মূলত উপার্জনের কারণে।

পাঁচ ভাই বোন যথাক্রমেলতা, মীনা, আশা, ঊষা ও হৃদয়নাথ। লতা, আশা ও ঊষা সর্বজনপরিচিত। মীনা খাদিকর মূলতঃ মারাঠি সংগীত জগতের শীর্ষস্থানীয় কন্ঠশিল্পী। হিন্দিতে তাঁর স্বল্পসংখ্যক গানের কারণে বাকি তিন বোনের তুলনায় কম পরিচিত। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন বিদগ্ধ পন্ডিত। তাঁর সুরে অনেক শাস্ত্রীয় সংগীতে কন্ঠ দিয়েছেন চার বোনমারাঠি, হিন্দি ও বাংলায়, হৃদয়নাথ হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রের একজন বরেণ্য সংগীত পরিচালক, সলিল চৌধুরীর লেখা কথায় হৃদয়নাথের সুরে রাগাশ্রিত এবং মারাঠি লোকজ সুরে অনেক বাংলা গান গেয়েছেন লতা ও আশা। যেমন: দে দোল দোল দোল, নাও গো মা ফুল নাও, এই দিন তো যাবে না, জীবন গান, ওগো মা গঙ্গা, ঐ পথ দূরে দূরে।

আশা শৈশবেই দশ বছর বয়সে রোজগারের তাগিদে জীবনের প্রথম প্লে ব্যাক করেন মারাঠি ছবি ‘গোকুলচা রাজার জন্যে। এ বয়সে আরও দু’চারটি গানের পর তাঁর প্রথম হিট গান মাস্টার বিনায়ক রাওয়ের মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল (আমার বাচ্চা)-এর ‘চলা চলা নববালা’। তবে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁকে জায়গা করে নিতে আরও অনেক সময় লেগে যায়। রীতিমতো যুদ্ধাংদেহি প্রতিযোগিতা করে বড় বোন লতা এবং গীতা দত্ত ও সামশাদ বেগমের পাশাপাশি গুটি গুটি পায়ে উঠে আসতে হয়েছে আশাকে অনেক সময় নিয়ে। যে সব গান উক্ত তিন গায়িকা গাইতে রাজি হতেন না সেগুলোই জুটতো আশার কপালে। কিন্তু সে গানগুলিকেই তিনি প্রাণবন্ত করে তুলতেন। ফলে গানগুলি দর্শকপ্রিয় হয়ে উঠতো। আশার গায়কিতে একটা উচ্ছলতা বা উদ্দামতা থাকতো যা তিনি সচেতনভাবে বজায় রাখতেন। তাঁর এ বৈশিষ্ট্য তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে। সংগীত পরিচালকেরা ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে উঠতে থাকেন। এসময় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান সংগীত পরিচালক ও.পি. নায়ার (ওঙ্কার প্রসাদ নায়ার)। তিনি লতার পরিবর্তে আশাকেই তাঁর প্রধান গায়িকায় পরিণত করেন। আশা তখনও গীতা দত্তের গায়কীকে অনুকরণ করতেন। হাওড়া ব্রিজ ছবির গানগুলি শুনলে তা বোঝা যায়। আস্তে আস্তে নিজের স্বতন্ত্র গায়কি গড়ে তোলেন আশা। উচ্চারণে স্পষ্টতা ছিল আশার আরেকটি বৈশিষ্ট্য। তাঁর বাংলা গান গুলিই এর একটা বড় প্রমাণ। উপমহাদেশের সবক’টি ভাষায় তিনি গেয়েছেন। উচ্চারণের স্পষ্টতার কারণে সব ভাষাতেই তিনি স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন মারাঠি কন্যা হয়েও। সংগীত জীবনের ৮২ বছরে ১৮টি ভাষায় ১৫ হাজারের অধিক গানে কন্ঠ দিয়েছেন আশা। শিল্পীজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছেন বিভিন্ন সংগীতজ্ঞের শিষ্যত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। শিখেছেন বিদুষী গিরিজা দেবী, বিদুষী কিশোরী আমোনকরের কাছে। ষাটোর্দ্ধ বয়সে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন উস্তাদ আলি আকবর খানের। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর এই আগ্রহ ও প্রশিক্ষণ তাঁর কন্ঠকে এতই শাণিত করে তুলেছিল যা অক্ষুন্ন ছিল আজীবন। এ কারণেই সব ধরনের গানে তিনি সাবলীলতা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফলে ক্যাবারে গানের পাশাপাশি মুজরো গানেও সমান দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন। ‘উমরাও জান’ ছবির রাগাশ্রয়ী গানগুলির জন্য সংগীতকার খৈয়াম তাই নির্দ্বিধায় নির্বাচন করেছিলেন আশাকে। ১৯৮২ সালে এ ছবির গানের জন্যে আশা শ্রেষ্ঠ গায়িকার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। তেমনি ও.পি নায়ার, রাহুল দেববর্মন ও অন্যন্য সুরকারদের কম্পোজিশনে দুর্দান্ত সব ক্যাবারে গানের অপরিহার্য শিল্পী ছিলেন আশা। এসব গানও আজা কালোত্তীর্ণ। ও.পি নায়ারের পর আশার সংগীত জীবনের দ্বিতীয় এবং প্রধান মেন্টর ছিলেন রাহুল দেববর্মন। স্বভাবতই প্রায় সকল সুরকারের সুরে গাইলেও এই দুজনের কম্পোজিশনে আশার কন্ঠবৈচিত্র্য বিকশিত হয়েছে বেশি। বিশেষ করে রাহুল দেববর্মনের সংগীতে। রাহুল দেববর্মন ও আশা ভোঁসলে এই জুটি উপমহাদেশের সংগীত জগতের অনবদ্য এক জোড়।

বাংলা গানের আশার প্রবেশ সুর্ধীন দাশগুপ্তের উদ্যোগে। ১৯৫৮ সালে সুধীন দাশগুপ্তের কথায় ও সুরে আশার বাংলা আধুনিক গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। রেকর্ডের গান দু’টি ছিল; নাচ ময়ুরী নাচরে ও আকাশ আজ রঙের খেলা। প্রথম রেকর্ডেই বাজিমাৎ। এরপর বাংলা আধুনিকে আশা চমৎকার সব গান গেয়েছেন সুধীন দাশগুপ্ত ও নচিকেতা ঘোষের কম্পোজিশনে। এ দুজনের কম্পোজিশনে অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র সংগীত রয়েছে আশার। জীবন সৈকতে, ছদ্মবেশী, প্রথম কদম ফুল, পিকনিক, তিন ভুবনের পারে; স্বয়ং সিদ্ধা, ফরিয়াদএসব ছবির গান বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সংগীত। অবশ্য বাংলা চলিচ্চেত্রে আশার আগমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। হেমন্ত, সলিল ও রাহুলোর সুরে চমৎকার কিছু চলচ্চিত্র সংগীত রয়েছে আশার। তবে বাংলা আধুনিকে আশা বেশি গান করেছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও রাহুল দেববর্মনের কম্পোজিশনে ১৯৬০৭০ ও ৮০’র দশকে।

স্বাভাবিকভাবে হিন্দি চলচ্চিত্রেই আশা সিংহভাগ গান গেয়েছেন প্রবীন নবীন সকল সংগীত পরিচালকের পরিচালনায় ১৯৪৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ সাতটি দশকেরও বেশি সময় জুড়ে। ১৯৪৮ সালে হিন্দি সিনেমায় প্রথম প্লে ব্যাক করেন ‘চুৃনারিয়া’ ছবিতে। ‘সাওয়ান আয়া’ এই গানটি ছিল কোরাস। হিন্দি চলচ্চিত্রে আশার প্রথম একক প্লে ব্যাক ‘রাত কি রানি’ ছবিতে ১৯৪৯ সালে।

ভার্সেটাইল কন্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে কেবল চলচ্চিত্র সংগীতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। শাস্ত্রীয় সংগীতের এলবাম করেছেন। গেয়েছেন মারাঠি ও বাংলা লোকসংগীত। রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল সংগীতের লং প্লে রেকর্ড করেছেন যথাক্রমে সুচিত্রা মিজু ও কল্যাণী কাজীর প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশে এসেছেন দু’বার ১৯৭৯ ও ২০১২ সালে। যৌথ প্রযোজনাসহ বাংলাদেশের কয়েকটি ছবিতে প্লে ব্যাক করেছেন। বেসিক গান করেছেন রুনা লায়লার সুরে। শেখ সাদী খানের সুরের প্রেমের প্রতিদান ছবিতে ‘কাল সারারাত ছিল স্বপ্নের রাত’ গানটি এখনও শ্রোতাপ্রিয়।

পন্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের তৃতীয় কনা্যা আশার জন্ম ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে। ১৯৪২ সালে দীননাথ যখন প্রয়াত হন আশার বয়স মাত্র ৯। পুরো পরিবার ভীষণ অর্থকষ্টে পড়ে যায়। ১৩ বছরের লতা হাল ধরলেও খুব একটা সুরাহা হচ্ছিল না। মীনাও আশাও নেমে পড়েন অভিনয় ও গানে। আশা খুব ভালো নাচতে পারতেন। পরবর্তীকালে তিনি স্টেজ শোতে তাঁর এই প্রতিভার যৎকিঞ্চিত প্রকাশ ঘটিয়েছেন। অভাব অনটনে অতিষ্ঠ আশা মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সকলের অমতে ১৯৪৬ সালে রেশন ইন্সপেক্টর গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে মঙ্গেশকর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিছুদিন যেতে না যেতেই গণপতআশার ওপর নিগ্রহ শুরু করেন। তিনি উপার্জনের উদ্দেশ্যে আশাকে গান গাইতে বাধ্য করতে থাকেন। ব্যাপারটি শাপে বর হয়ে ওঠে। আশা ক্রমশ সংগীত জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইতোমধ্যে হেমন্ত, বরষা ও আনন্দ তিন পুত্র কন্যা জন্ম নেয় গণপত আশার সংসারে। নিগ্রহের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে ১৯৫৯ সালে গণপতকে ছেড়ে পিত্রালয়ে ফিরে আসেন আশা এবং ১৯৬০ সালে তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর আশার একাকী সংসার এবং ক্রমান্বয় উত্থান। ১৯৮০ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে।

আশার দুইপুত্র হেমন্ত ও আনন্দ সংগীত পরিচালক এবং কন্যা বরষা ছিলেন সংগীত শিল্পী। তবে এক্ষেত্রেও আশাকে পুত্র কন্যার মৃত্যুশোক সহ্য করতে হয়েছে। স্বামী রাহুল মারা যান ১৯৯৪ সালে। কন্যা বরষা ২০১২ সালে কনসার্ট চলাকালে আত্মহত্যা করেন। ২০১৫ সালে ক্যান্সারে মারা যান বড় ছেলে হেমন্ত লন্ডনের এক হাসপাতালে। এত ঝড় ঝঞ্ঝার পরেও জীবন বিমুখ হয়ে পড়েননি আশা। সংগীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থেকেছেন। পুত্র আনন্দের কন্যা জনাইকে উত্তরাধিকার হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। কন্ঠশিল্পী জনাই চলচ্চিত্র অভিনয়ে যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি।

রন্ধন পটিয়সী আশা গড়ে তুলেছেন “আশা’জ” নামের ফ্যাঞ্চাইজি রেস্তোঁরা। বিশ্বের বড় বড় শহরে রয়েছে এর অনেক শাখা। শৈশবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। শেষবারের মতো অভিনয় করেন ২০১৩ সালে ‘মাই’ ছবিতে।

জীবনপিয়াসী আশা শত দুঃখ কষ্ট সয়ে জীবনকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করে গেছেন অফুরান প্রাণশক্তির জোরে। আত্মজীবনী ‘জীবন ও গান’এ লিখেছেন, ‘জীবনের অন্য নাম সংগ্রাম। আমার বয়সের হতাশা নেইবেঁচে থাকার আনন্দ, গান গাইবার আনন্দ আমাকে তারুণ্য দেয়। আপন মনে আমি গেয়ে যেতে চাইআজীবন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপানাম নগরে একদিন
পরবর্তী নিবন্ধবাঁশখালীতে পুলিশের অভিযানে ২ চোর আটক