“পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সে ঘরের মালিক নই”–শিল্পী আবদুল আলীমের গাওয়া এই গান যখনই শুনি মনে হয় আহারে কী নিদারুণ সত্যি, সবই তো পরের, তবু আমার–আমার… বলে আমাদের কত আয়োজন!
গীতিকার আবদুল লতিফ এই গান লেখার সময় কোন ভাবনায় ছিলেন কে জানে! তবে ঐতিহাসিক পানাম নগরে গিয়ে ধ্বংসপ্রায় শিল্পশৈলীর নন্দনে ভরপুর ভবনগুলো দেখে ভাবছিলাম কী আশায় বেঁধেছি খেলাঘর!
ঢাকা শহরের অদূরবর্তী নারায়নগঞ্জ জেলায় অবস্থিত সোনারগাঁও উপজেলার প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শহর হলো পানাম নগর। সোনারগাঁও এর তিনটি নগরের (বড় নগর, খান নগর, পানাম নগর) পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ শতকে সুলতানী আমলে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনারগাঁওতে। সোনারগাঁও ছিল নদী বেষ্টিত শহর। এর পূর্বে মেঘনা নদী, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, উত্তরে ব্রক্ষ্মপুত্র, দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদী। নদী পথের কারণে বাণিজ্যিক সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষনীয় স্থান ছিল সোনার গাঁও। সোনার গাঁও এর পূর্ব নাম সুবর্ণ গ্রাম।
ইতিহাস ঐতিহ্যের অপূর্ব মিশেল পানাম নগর দেখতে গিয়ে দারুণ এক অনুভূতি কাজ করছিল। পানাম নগরে ঢোকার মুখেই দৃষ্টিনন্দন, নয়নাভিরাম বই আকৃতির এক স্থাপত্যকলায় সংক্ষিপ্ত পরিসরে পানাম নগরের ছোট্ট কিন্তু চুম্বক ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখান থেকেই জানা যায়, হাজার বছরের প্রাচীন নগর সুবর্ণগ্রাম ছিল পূর্ব বাংলার অন্যতম রাজধানী ও নদী বন্দর। ঐতিহাসিকগণ আজকের সোনারগাঁকে প্রাচীন সুবর্ণগ্রাম বলে মনে করেন।
এই সুবর্ণগ্রামেই তের শতকের স্থানীয় হিন্দু রাজা দনজুমাধব দশরথদেব তাঁর শাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গ অঞ্চল মুসলিম শাসনে আসার পর থেকে ১৬১০ সালের পূর্ব পর্যন্ত সোনারগাঁ ছিল স্বাধীন সুলতানী বাংলার অন্যতম রাজধানী ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে ধনাঢ্য হিন্দু বণিকদের দ্বারা পানাম নগরের গোড়া পত্তন ঘটে। সোনারগাঁও এর ২০ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে পানাম নগর অবস্থিত। পানাম নগরের পূর্ব দক্ষিণে বিস্তৃত প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার প্রশস্ত একটি সড়কের দুইপাশে গড়ে উঠেছিল ৫২ টি নয়নাভিরাম দুইতলা, তিনতলা ভবন। একেকটা ভবনের বাহিরে ভেতরে এত নান্দনিক কারুকাজ দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। পানাম নগর ছিল মূলত তৎকালীন উচ্চবিত্ত হিন্দু বণিকদের আবাসস্থল। বণিকদের বাড়ির নকশা আর স্থাপত্য সৌন্দর্য দেখে বণিকদের রুচির প্রশংসা না করে পারা যায় না!
পানাম নগরের ৫২ টি বাড়ির মধ্যে সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। উত্তর দক্ষিণে বাড়ির সংখ্যা গুনে না দেখলে বাড়িগুলোতে যে নম্বর দেওয়া আছে তা চোখে পড়েছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই একতলা দুইতলা বাড়ি, দু’চারটা তিনতলাও আছে। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। প্রতিটি বাড়িই নির্মাণকৌশল, আকার, আয়তন এবং সৌন্দর্যে একদম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বাড়িই অন্দরমহল এবং বহির্বাটী–এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। ইউরোপীয় স্টাইলে (আমাদের লক্ষীপুরেও সবার বাড়িতে সামনের দরজা, পেছনের দরজা, সামনের উঠান, পেছনের উঠান আছে) বাড়ির সামনে পেছনে উঠান, বাগান, গাছ–গাছালি, বৈঠকখানার নিদর্শন রয়েছে। বেশিরভাগ বাড়ির চারপাশটা এত প্রশস্ত যে দেখে চোখের আরামের পাশাপাশি বেশ স্বাস্থ্যকর জায়গাও মনে হলো। আলো–বাতাসে ভরপুর খোলা পথ–ঘাট, বাড়ি–ঘর। একটি বাড়ির সাথে আরেকটি বাড়ির দূরত্ব এতখানি যে অনায়াসে একলা বাড়ির আমেজ পাওয়া যায়। আবার বিচ্ছিন্ন মনে হয় না। কারণ চোখ মেললেই পাশের বাড়ির সীমানা ঠিকই নজরে পড়ে। বাড়িগুলোর সামনের বারান্দার মতো খিলান দেওয়া জায়গা, আবার কোনো কোনো বাড়ির সামনে বৈঠকখানা সব মিলিয়ে নির্মাণশৈলীর সৌন্দর্যের তারিফ করতেই হয়। তবে বেশিরভাগ বাড়ির সামনেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে। কয়েকটাতে আছে তালা মারা। খোলা বাড়িগুলোর ভেতরে ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে কেউ যদি ইতিহাসের ভাঁজ খুলতে চায় তখন কিন্তু মন কেমন করা এক আকুলতার অস্তিত্ব টের পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন ঘরগুলোতে একসময় কী দারুণভাবে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, ছিল আগামীর হাতছানি। এখন কেবল কালের গহবরে গেঁথে যাওয়া ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ধারক। পানাম নগরে এখনো চমৎকারভাবে টিকে আছে সবুজের আবাহন। আছে শ্যাওলা পুকুর, গাছ–গাছালির, পাখ–পাখালির মায়া।
পানি সরবাহের জন্য এক সময় পানাম নগরে ২টি খাল ও ৫টি পুকুর ছিল। এখনো পুকুরের অস্তিত্ব আছে। আছে বাঁধানো ঘাট। সেই ঘাট বলে এখানে এক সময় প্রাণের স্পন্দন ছিল তুমুলভাবে। এখনো একটা পুকুর ঘাটের বৈঠকখানায় দেখি লেখা আছে “স্বর্নালী” নামে একটি নাম। কখনকার লেখা জানার সুযোগ নেই। তবে স্বর্ণালী নামটি আমার মতো পর্যটকের চোখে গেঁথে গেছে।
একটা ভবনের নাম ফলকে লেখা আছে কাশীনাথ ভবন, সন–১৩০৫। পানাম নগরে প্রবেশমুখে বই আকৃতির স্থাপত্যফলকে নীহারিকা ভবনের কথা উল্লেখ আছে। আমার চোখে অবশ্য পড়েনি। বিকালের নরম রোদের আলোয় পানাম নগরের ধ্বংসপ্রাপ্ত লাল ইটের ভাঙ্গাচোরা দালানগুলো থেকে কী অদ্ভুত এক আলোর দীপ্তি এসে স্পর্শ করছিল চোখের পাতা। ইটগুলো যেন কথা বলছিল, কথা বলছিল দরজার খিলান, জানালার শিক কিংবা দেয়ালজুড়ে নকশার কারুকার্যগুলো! ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতে কেমন আনমনা হয়ে যেতে হয়। ইট সুড়কির ভবনগুলোরও যেন প্রাণ আছে। মানুষ হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের স্বপ্ন ধ্বংস হতে হতেও পুরোপুরি ধ্বংস কখনো হয় না। হয়তো স্বপ্নের ধারক, বাহক বদলে যায়। কিন্তু স্বপ্ন ধ্বংস হয় না কখনোই। স্বপ্নের রূপান্তর হয় বড়জোড়!
পানাম নগরের আরেকটা বিষয় খুব ভালো লাগলো। তা হলো আমি অনেক বছর পরে আমার দেশের কোথাও বিদেশী পর্যটক দেখলাম। বেশ কয়েকজন সাদা চামড়ার মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে ছুঁয়ে ছুুঁয়ে দেখছিলেন পানাম নগরের ধ্বংসপ্রায় ভবনগুলোর দেয়াল। গলায় ঝুলানো ডিএসএল আর ক্যামেরায় ক্লিক করছিলেন মুগ্ধতা নিয়ে। ফ্রেমবন্দী করছিলেন আমাদের কয়েকশত বছরের পুরনো ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নকে। ৯৪ সালে প্রথমবার কক্সবাজার গিয়ে আমি দেখেছিলাম প্রচুর সাদা চামড়ার মানুষ। সেই ছোটেেবলায় বিদেশিদের দেখে খুব অবাক হয়ে আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বিদেশিগুলা আমাদের সমুদ্রে কেন আসছে আব্বা? আব্বা বলেছিল আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত। তাই বিদেশিরা এখানে আসে। কিন্তু ৯৪ সালের পরে আমি আর কখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকতে সাদা চামড়ার মানুষ দেখিনি। না দেখাটা হয়তো আমারই অদেখা।
তাই হঠাৎ করে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্থানে সাদা চামড়ার মানুষ দেখে এত ভালো লাগছিল যে পানাম নগর দেখার পাশাপাশি আড়চোখে আমি তাদের দেখার ভঙ্গিমাটাও দেখছিলাম।
২০০৬ সালে নিউ–ইয়র্ক ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডড়ৎষফ গড়হঁসবহঃং ঋঁহফ পানাম নগরকে (ডড়ৎষফং গড়হঁসবহঃং ডধঃপয খরংঃ ড়ভ ১০০ গড়ংঃ ঊহফধহমবৎবফ ঝরঃবং) বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার অন্তর্ভুক্ত করে।
নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর। এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরনো টাঁকশাল বাড়ি। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। এ মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহীর শাসনামলে নির্মিত হয়। পাশেই আছে বড় সর্দার বাড়ি।
ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথার একটি হলো ইতিহাসের কোনো ইতি নেই। নেই কোনো উপসংহার। পানাম নগরে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক এই কথাটাই মনে হচ্ছিল আমার বারবার।













