বর্তমান বাংলাদেশে শিশুরা নিরাপদ নয়। সব প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। বর্তমানে পারিবারিক সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই সকল লোভ লালসার শিকার হচ্ছে শিশুরা। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শিশুরা হত্যা ধর্ষণ ও পাচার হচ্ছে। এক সময় প্রতিপক্ষের হাতে একটা নির্দিষ্ট বয়সের মানুষই নির্যাতিত হতো। কিন্তু এখন শিশু থেকে শুরু করে নারী পুরুষ যেকোনো বয়সের মানুষই টার্গেট হচ্ছে। পিতামাতার হাতে সন্তান খুন ও সন্তানের হাতে পিতামাতা খুন হচ্ছে। এক সময় সম্পত্তির কারণে ও অন্যান্য বিবাদে ভাইবোন; আত্মীয়জন নিকটতম ও প্রতিবেশীর মধ্যে হাতাহাতি মারামারি ও খুনাখুনি পর্যন্ত হতো। এখন সামান্য ভুল বুঝাবুঝি হতেই খুনাখুনি হচ্ছে। আর সব প্রতিশোধের বলির পাঠা হচ্ছে শিশু। যেখানে হেসে খেলে দিন কাটানোর কথা সেখানে প্রতিটি শিশু আতংকিত। অনিরাপদ পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলিত সীমাবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠছে। একজন শিশু ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। রক্তের সম্পর্কও মাঝে মাঝে বেঈমানী করে। শিশুর নিরাপত্তার জন্য নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। সন্তানরা আমাদের অমূল্য সম্পদ। এই সন্তানদের নিরাপদে রাখার দায়িত্ব আমাদের।
শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে– এই সংবাদটি বারবার বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। গত সাত মাসে প্রায় ১৫ হাজার শিশু বিভিন্ন স্থান থেকে নিখোঁজ হয়েছে। মেয়েদের মধ্যে যারা প্রায় ১৫ বছরের মত তাদেরকে বিয়ের মাধ্যমে অন্যত্র হস্তান্তর করা হয়। যৌনপল্লীতে বিক্রয় করা হয়। যারা একেবারে ছোট তাদেরকে মাদক পাচারের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত করা হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে শিশুদের বিভিন্ন অঙ্গ পতঙ্গগুলো কেটে বিক্রয় করা হয়। অন্যদিকে শিশুরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের শিশু হত্যা মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। পারিবারিক কলহের জেরে অনেক শিশুকে হত্যা করা হয়। আবার সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণেও শিশুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে হত্যা করা হয়। সমপ্রতি মোহাম্মদ রায়হান (১২) নামে একজন শিশুর প্রায় সাত মাস পর বাড়িতে ফেরার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়; প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় রায়হান। এরপর আর বাড়িতে ফিরে নেই। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘদিন পরে শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পড়েছে পরিবারের সদস্যরা। রায়হানের একটি পা নেই। পেটের একপাশে রয়েছে কাটা ছেঁড়ার দাগ। ধারণা করা হচ্ছে একটি কিডনি নিয়ে ফেলা হয়েছে। রায়হানের ভাষ্যমতে; তার সাথে ওখানে আরও ১৫–২০ জন শিশু ছিল। তাদের দিয়ে ভিক্ষা ও পানির বোতল বিক্রি করানো হতো।
অসচেতনতার অভাবে অনেক শিশু ঘরের মধ্যে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। আবার বিনোদনের জন্য গ্রামে বা অন্য কোথাও গেলে পানিতে পড়ে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে শিশুরাই সর্বপ্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার আছে। অধিকার বঞ্চিত শিশুরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হেনস্তা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠিক সেই ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌন সমস্যার সম্মুখীন হয়। একটি শিশু কিচ্ছু বুঝে ওঠার আগেই ও কিছু জানার আগেই তাকে শারীরিকভাবে যৌন নির্যাতন করা হয়। শিশুর শোষণ; বঞ্চনা ও বৈষম্যের শুরু পরিবার থেকেই প্রথমে আসে। শিশুদের সবার কোলে বসানো; সবার সঙ্গে ঘুমাতে দেওয়া; একা একা ছেড়ে দেওয়া– এসব বিষয়ে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। আমরা অনেক সময় মনে করি সন্তানকে আত্মীয় স্বজনরা ও বেবি সিটারের কাছে রেখে গেলে সে শতভাগ নিরাপদে থাকে। এ ধারণা এখন সম্পূর্ণরূপে চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের যৌন নির্যাতন অনেক সময় অপরিচিত ব্যক্তির চেয়েও বরং কাছের মানুষের দ্বারাই ঘটে থাকে। তাই প্রতিটি সন্তানকে সময় দিতে হবে এবং সেই দিকে নজর রাখতে হবে। শিশুদেরকে ক্ষতিকর অনেক বিষয়ে সচেতন করতে হবে। তাদের শেখাতে হবে কোন স্পর্শে অস্বস্তি হচ্ছে; কোথায় না বলতে হবে; কাকে এড়িয়ে চলতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে জানাতে হবে। শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলাও জরুরি। যাতে তারা কোন ঘটনা ঘটলে ভয় না পেয়ে অভিভাবককে জানাতে পারে। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিশুদের অফলাইন ও অনলাইন দুই ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
প্যারেন্টিং কোনো সাধারণ বিষয় নয়। প্যারেন্টিং বিষয়টি শিশু ভেদে আলাদা হয়ে থাকে। তাই পরিবার ভিত্তিক প্যারেন্টিং এর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিশুদেরকে নানান ভাবে হেনস্তা করা হয়। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদেরকে পিটানোর সংবাদ বার বার প্রচারিত হচ্ছে। আদরের সন্তানের রক্তাক্ত দেহের ছবি অনেক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। অফলাইন অনলাইনে নিত্যদিনই শিশুরা যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। এই বিষয়ে পরিবারকে সতর্ক থাকতে হবে। শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও এখন বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন মাদ্রাসা ও হোস্টেলে অনেক ছেলে শিশুকে হেনস্তা করা হয়েছে। গণপরিবহনে উঠা নামার সময় মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। ছোট ছোট মেয়েশিশুরাও রেহাই পায় না। শিশুরা যেন নিরাপত্তাহীনতায় না থাকে তার জন্য ব্যক্তিগত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সঠিক আইন প্রয়োগ ও নিশ্চিত করা জরুরি। তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কথা বলার পর তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৯২ শতাংশ শিশু পরিবার বা পরিচিত মানুষের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। ভয় ভীতির কারণে প্রকাশ করে না।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই ৬ মাসে দেশে অনেক শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ টি মেয়ে। একটি ছেলে শিশুর পরিচয় জানা যায়নি। তুলনা করলে দেখা যায়; প্রতিমাসে গড়ে চৌদ্দশ শিকার হয়েছে। বর্তমানে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি নির্যাতন হচ্ছে। বিশেষ করে করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে অনলাইনে যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পথশিশু; কর্মজীবী গৃহকর্মী ও প্রতিবন্ধী শিশুরা আরো বেশি ঝুঁকিতে আছে। আবার অতিরিক্ত সুরক্ষায়ও নেতিবাচক প্রভাব পরে। ওদিকে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা জীবন ও জীবিকা জন্য নিপীড়িত হয়। শ্রেণি সংস্কৃতি ও লিঙ্গের বাস্তবতা বা বিবেচনায় এনে পরিবেশ নিরাপদ করতে হবে।
শিশুদেরকে শাস্তি দিয়ে শৃঙ্খলিত করার ধারণা বদলাতে হবে। তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে মানসিক শক্তি যোগাবে। কখনো কখনো অল্প সময়ের আন্তরিক কথোপকথনেও শিশুর মনের কথা জানা যায়। গণমাধ্যমের শুধু ভাইরাল হওয়া ঘটনা নয়। বাস্তবতায় ঘটিত অন্যান্য ঘটনা গুলোরে অনুসরণ করতে হবে। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের কথা মন দিয়ে শুনি না। অনুভূতিকে গুরুত্ব দেই না। অনেক সময় এমন ভাবে ভাষা ব্যবহার করি যা তাদের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের গভীর আঘাত করে। প্রায় শিশুদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয় বরং অধীনস্থ হিসেবে গণ্য করা হয়। শিশুদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা দরকার। আমাদের দৈনন্দিন আচরণের মধ্যে শিশুদের প্রতি অসম্মান অপমান ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এগিয়ে আসতে হবে। এই বিষয়গুলো শিশুদের মানসিক বিকাশে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাদের সুরক্ষায় আমাদের দায়িত্ব আরো বেশি বেগবান হোক। বিভিন্ন বয়সের শিশুর চিন্তা ভাবনা অনুভূতি বুঝে তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। এই বিষয়টি এখন একটি জাতি সংকট। এই সংকট মোকাবেলাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একটি সুন্দর সুস্থ ও নিশ্চিত পরিবেশ সৃষ্টিতে ইতিবাচক মনমানসিকতায় সকলের এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট; অধ্যাপক,
ডা. ফজলুল–হাজেরা ডিগ্রী কলেজ।












