বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি বা ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রবাসীদের পাঠানো এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর আগে গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে অর্থবছরের শেষ মাস তথা জুনে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এ সময় প্রবাসীরা দেশে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। ২০২৫ সালের একই মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৮২ কোটি ২৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে জুনে প্রবাসী আয় দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা ছয় মাস ধরে দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল। মাঝে মার্চে একবার সেটি পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলারেও পৌঁছায়। কিন্তু জুনে এসে প্রবাসী আয় ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের মে মাসেও ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। সে হিসাবে মে মাসের তুলনায় জুনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ১৮ শতাংশের বেশি কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে চার দশক ধরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে। গত মাসে শরিয়াহ্িভত্তিক বৃহত্তম এ ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ সময় প্রধান কার্যালয়সহ সারা দেশের শাখাগুলোর সামনে টানা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিশৃঙ্খল এ পরিস্থিতির চাপে ব্যাংকটি থেকে আমানতকারীদের একটি অংশ অর্থ তুলে নিয়ে যায়। তারল্য সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংককে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জুনে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকটিতে বিরাজমান সংকটেরও দায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত মে মাসে শুধু ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৫৯ কোটি ডলারেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। কয়েক বছর ধরেই স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অনিয়ম–দুর্নীতি, বিদ্যুৎ–জ্বালানি খাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনাসহ অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে নিমজ্জমান। তাঁরা বলেন, বাস্তবিক অর্থে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পরোক্ষভাবে বলতে গেলে বলা যায়, দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। তাই কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলা যায়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করতে হলে বিদেশে বেশি বেশি লোক পাঠাতে হবে। আর রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে বেশি করে শিল্পায়ন করতে হবে। ব্যাপক শিল্পায়নই কেবল একটি দেশকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারে। শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে লোকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, নতুন পণ্য উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটায়, আবার সেই পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ফলে তারা একদিকে আমদানি কমিয়ে পরনির্ভরতা কমায়, অপরদিকে পণ্য রপ্তানি করে দেশকে এগিয়ে নেয়। সুতরাং উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিতে হবে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের যোগান দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা করতে হবে।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আমদানি–রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলেন, যেহেতু আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম, তাই এ আয় যেন কখনো না কমে, বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।










