রঙ ছিল, রিকশা ছিল, একটা শহর ছিল

সনেট দেব | সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

মনে আছে সেই বিকেলগুলোর কথা? স্কুল থেকে ফেরার পথে রিকশায় উঠে বসতাম। পেছনের সিটে হেলান দিলে চোখে পড়ত আরেকটা রিকশার পেছনের প্যানেলটালালনীলহলুদে মাখামাখি। কোনোটায় নায়িকার মুখ, কোনোটায় ডুবন্ত সূর্যের নিচে একটা নৌকা, কোনোটায় তাজমহল। শহরের ধুলো আর যানজটের মাঝেও রিকশাগুলো যেন চলন্ত ক্যানভাস হয়ে বয়ে যেত পথ ধরে। সেই রঙগুলো এখন আর তেমন নেই। ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহনে এখন স্টিকার সাঁটা। মসৃণ, পরিষ্কার, নিখুঁত। কিন্তু প্রাণহীন। রিকশার পেছনের সেই হাতে আঁকা ছবিগুলোযেখানে কোনো শিল্পীর হাতের স্পর্শ ছিল, একটু কাঁপা রেখা ছিল, রঙের একটু বেশি বা কম ছিলসেই জীবন্ত অসম্পূর্ণতা এখন আর দেখা যায় না। একটা শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। নীরবে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

ঊনিশ শতকের শেষ দিকে জাপানে জন্ম নেওয়া তিন চাকার এই বাহনটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার নানা প্রান্তে। অবিভক্ত বাংলায় কলকাতায় হাতে টানা রিকশা চালু হয় বিশ শতকের গোড়ায়। আর ঢাকায় সাইকেল রিকশা আসে ১৯৩৮ সালেপ্রথমে অভিজাতদের বাহন হিসেবে। নারায়ণগঞ্জ আর ময়মনসিংহের ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে এনেছিলেন এই বাহন। কিন্তু রিকশার গায়ে রঙ উঠল কখন? ১৯৪৭ সালের দেশভাগের কিছু আগে থেকেই এই অঞ্চলে রিকশাচিত্রের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হয়। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে রিকশা পেইন্টিং জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে দ্রুত গতিতে। তখন চাহিদা ছিল প্রচুর। যে শিল্পীরা এই কাজে যুক্ত হলেন, তাঁদের অনেকেই আগের পেশা ছেড়ে দিলেনচামড়ার কাজ, রঙের দোকান, পৈতৃক কারিগরিসব ছেড়ে এলেন রিকশার পেছনের প্যানেলে রঙ তুলতে। এই শিল্পের উদ্ভব হয়েছিল কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলা বিভাগে নয়। কোনো প্রদর্শনী হলে নয়। একদম পথের ধারে, মিস্ত্রির গ্যারেজের পাশে, খোলা আকাশের নিচে। যাঁরা আঁকতেন, তাঁদের কেউ জয়নুল আবেদিনের ছাত্র ছিলেন নাকিন্তু তাঁদের তুলির টানেও ছিল এক অসম্ভব জীবনীশক্তি। প্রায় একই সময়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আধুনিক চিত্রকলার যাত্রা শুরু হচ্ছিল। আর সমান্তরালে, পথের ধারে গড়ে উঠছিল আরেকটা শিল্পজগৎযার কোনো স্বীকৃতি ছিল না, কোনো পাঠ্যক্রম ছিল না, কিন্তু দর্শক ছিল লক্ষ লক্ষ

রিকশার পেছনের প্যানেল ছিল একটা উন্মুক্ত বার্তাবাহক। পঞ্চাশষাটের দশকে সেখানে উঠে আসত বাংলা সিনেমার নায়কনায়িকার মুখ। জনপ্রিয় সংলাপ। পর্দার স্বপ্নের জগৎ। পরে, মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন দেশের স্বপ্ন ঠাঁই পেল রিকশার গায়েস্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার, সংসদ ভবন। সত্তরের দশকে আঁকা হলো কল্পনার শহর, নদীর ধারের দৃশ্য। ধর্মীয় অনুভূতিও বাদ যায়নি। বোরাক, দুলদুল, আরব্য রজনীর গল্পসব মিলে একটা জাদুবাস্তবতার জগৎ তৈরি হয়েছিল রিকশাচিত্রে। তাজমহল আঁকা হতোসেই মুঘল ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে। গ্রামের দৃশ্য আঁকা হতোহয়তো শহরে আসা মানুষটির মনে মিস করা শিকড়ের কথা। আর একবার সরকারি নিষেধাজ্ঞায় রিকশায় মানুষের মুখ আঁকা বন্ধ হলে শিল্পীরা থামেননি। বরং বাঘ এঁকেছেন ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে, শিয়াল এঁকেছেন রাস্তায় হাঁটতে। বাধার মুখেও ব্যঙ্গ আর কল্পনার মিশেলে তাঁরা সমাজের কথা বলে গেছেন। ডাইনোসরের সঙ্গে লুঙ্গি পরা বাঙালির যুদ্ধএই অসম্ভব দৃশ্য এঁকেছেন রিকশাশিল্পীরা। এর চেয়ে বেশি বাংলাদেশি কল্পনা আর কী হতে পারে?

রিকশাচিত্র কোন ঘরানার শিল্পএই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। অভিজাত চিত্রকলার জগতে এর ঠাঁই হয়নি। লোকশিল্পের তকমাও পুরোপুরি মেলেনিকারণ এটা গ্রামীণ নয়, শহুরে। গবেষকরা একে বলেছেন “গণমানুষের চিত্র”। সেটাই বোধহয় সবচেয়ে সৎ পরিচয়। কিন্তু পরিচয় না থাকলে রক্ষাও হয় না। যে শিল্প কোনো বিভাগে পড়ে না, তাকে কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসে না। শিল্পীরা রঙ মেশাতেন সকালে, আঁকতেন দিনভর। একটা ছবি বানাতে যা খরচ হতো, তার দশগুণও পারিশ্রমিক মিলত না। প্রতিটি হাতে আঁকা প্যানেলের দাম হয়তো তিনশো বা সাড়ে তিনশো টাকা। কখনো দুইশোতেও বিকিয়েছে। এই টাকায় একজন মানুষের পরিবার চলে না। তাই তাঁরা চলে গেছেন। বাবার পেশা ছেলে নেয়নি। শিষ্য আসেনি। গুরুশিষ্যের যে পরম্পরায় শিল্প বেঁচে থাকে, সেই পরম্পরা ভেঙে গেছে একটু একটু করে।

রিকশাচিত্রীদের জীবনটা কখনো সহজ ছিল নাতবে একসময় অন্তত পেটে ভাত ছিল। পঞ্চাশষাটের দশকে যখন চাহিদা তুঙ্গে, তখন একজন দক্ষ শিল্পী দিনে তিনচারটি প্যানেল আঁকতেন। সেই আঁকাআঁকিতে শুধু রঙ আর তুলি ছিল নাছিল বছরের পর বছর ধরে আয়ত্ত করা একটা বিশেষ হাতের কাজ, রঙ মেশানোর কৌশল, মুহূর্তে মুখের আদল ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা। এই দক্ষতা কোনো বইয়ে লেখা ছিল নাশেখা হতো গুরুর পাশে বসে, দেখে দেখে, করে করে। একজন শিল্পী হয়তো দশ বছর ধরে একজন ওস্তাদের কাছে থেকে শিখতেন, তবেই নিজে কাজ পেতেন। কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থার কোনো সনদ ছিল না, কোনো স্বীকৃতি ছিল না। ফলে তাঁদের দক্ষতার কোনো বাজারমূল্যও তৈরি হয়নি। একটি হাতে আঁকা প্যানেলে যখন চার থেকে ছয় ঘণ্টার শ্রম থাকে, তখন সেটার দাম যদি হয় দুইশোতিনশো টাকাতাহলে হিসাবটা কোনোভাবেই মেলে না। একই ছবি ডিজিটাল প্রিন্টে পঞ্চাশ টাকায় হয়ে গেলে রিকশামালিক কেন বেশি খরচ করবেন? এই বাজারের যুক্তির কাছে শিল্পের যুক্তি হেরে গেছে বারবার। পেশা ছেড়ে যাওয়াটাও তাই কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়এটা দীর্ঘ অবহেলার স্বাভাবিক পরিণতি। যে মানুষটি বছরের পর বছর রঙ নিয়ে কাজ করেছেন, একদিন সেই তুলি রেখে দিয়ে রিকশা চালাতে বসেছেনকারণ রিকশা চালিয়ে অন্তত দিন শেষে ঘরে ফেরা যায়।

২০২৩ সালের হিসেবে ঢাকায় সক্রিয় রিকশাচিত্রীর সংখ্যা মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। রাজশাহী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর মিলিয়ে আরও কিছু। কিন্তু তাঁদের বেশিরভাগই এখন মূলত বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ছবি আঁকেন। স্থানীয় রিকশার গায়ে নয়বিদেশিদের দেয়ালে ঝোলানোর জন্য। ডিজিটাল প্রিন্ট এসে বদলে দিয়েছে সব হিসাব। একই ছবি শত শত প্রিন্ট হয়, দামও কম। রিকশামালিক হাতে আঁকা প্যানেলের জন্য বেশি টাকা খরচ করতে রাজি নন যখন প্রিন্টে একই কাজ সস্তায় হয়ে যায়। তবু সম্পূর্ণ মরেনি। রিকশা পেইন্টিং এখন উঠে এসেছে পোশাকে, ঘরের দেয়ালে, চায়ের কাপে, ফোনের কভারে। তরুণ ডিজাইনাররা এই মোটিফ ব্যবহার করছেন জামা থেকে জুতায়। ক্যানভাসে এই ধারায় ছবি আঁকছেন শিল্পের ছাত্রছাত্রীরা। বিদেশে প্রদর্শনী হয়েছে লন্ডনে, জাপানে, নেপালে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে একটি সুসজ্জিত রিকশা আছে। আর ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর এলো সেই স্বীকৃতিইউনেস্কো ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্রকে ঘোষণা করল মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে। জামদানি, শীতলপাটি, বাউল গান, মঙ্গল শোভাযাত্রার পর বাংলাদেশের পঞ্চম এই স্বীকৃতিএবং এটি প্রথমবার যখন একটি সম্পূর্ণ শহুরে, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পধারা এই সম্মান পেল।

এই প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই। ইউনেস্কোর তালিকায় নাম উঠলে বিশ্ব জানে। কিন্তু রাস্তার মোড়ে যে শিল্পী দিনে দুটো প্যানেল আঁকেন তিনশো টাকায়, তাঁর জীবন কি বদলায়? যাঁরা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন, তাঁরা বলছেন রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু সড়কে, আবাসিক এলাকায়, পর্যটন স্পটে রিকশাকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। তাহলে রিকশা থাকবে, পেইন্টিংও টিকবে। কর্মশালা হচ্ছে চারুকলা অনুষদেনতুন প্রজন্ম শিখছে সরাসরি পুরনো শিল্পীদের কাছ থেকে। কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শিল্পীদের ন্যায্যমূল্য দেওয়ার চেষ্টা করছে। এগুলো আশার আলো। কিন্তু আলো যথেষ্ট কিনা, সেটা সময় বলবে।

একটা শহর তার চরিত্র হারালে আর পায় না সেটা ঠিক আগের মতো। ঢাকাকে একদিন বলা হতো পৃথিবীর রিকশার রাজধানী। সেই রিকশার গায়ে লেগে থাকত এই শহরের স্বপ্ন, কষ্ট, আনন্দ আর দুঃসাহসী কল্পনা। একটা লুঙ্গি পরা বাঙালি ডাইনোসর মারছেএই অসম্ভব দৃশ্যটা শুধু রিকশার পেছনেই সম্ভব ছিল। এখন সেই রঙ কিছুটা ম্লান। তবু রিকশা পেইন্টিং পুরোপুরি মরেনি। সে এখন রূপ পাল্টাচ্ছেপথ থেকে ক্যানভাসে, রিকশার প্যানেল থেকে ড্রেসের আঁচলে। হয়তো বেঁচে থাকার এটাই পথ। কিন্তু যাঁরা সেই রঙিন রিকশার পেছনে বসে গেছেন কোনো বিকেলে, ঘুম আসা চোখে দেখেছেন চলন্ত একটা ছবিকেতাঁদের মনে সেই স্মৃতি থেকে যাবে। রঙ ছিল। রিকশা ছিল। একটা শহর ছিল। সেই শহর কিছুটা বদলে গেছে। কিন্তু রঙের গন্ধটা এখনো বাতাসে আছেযদি একটু মনোযোগ দিয়ে খোঁজেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধওয়াকা ওয়াকা
পরবর্তী নিবন্ধআঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারীর সমন্বয় সভা