হাজতখানার ভিতর খুব চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে। দেয়ালে মাথা ঠুকছে একজন। গারদের সামনের পুলিশটি একেবারেই নির্বিকার। সে প্রতিদিন এসব দেখে অভ্যস্ত। এরপর কী হবে তা–ও সে জানে। মিনিট দুয়েক পর সে যা ভেবেছিল তা–ই হলো। নাক চেপে ওসির কাছে গিয়ে জানালো, এখন জিনিস লাগবে। বাসের হেলপার ও ড্রাইভার এক তরুণীকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার যে ঘটনা এখন সারাদেশে চাউড় হয়েছে, থানার ওসি সেই মামলা নিয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বলছিলেন। কথার ফাঁকে তার হাতে একটি পোটলা দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজতখানা একেবারে শান্ত হয়ে গেল। বিষ দিয়ে বিষের যন্ত্রণা সারানোর মতো অবস্থা। প্রায় প্রতিদিনই এমন হয় এখানে। হিরোইনখোর, ইয়াবাখোরদের এটাই নিত্যদিনের প্রতিক্রিয়া। এদের সবাই যে চোর ছিনতাইকারী তা কিন্তু নয়; ভদ্র পরিবারের সন্তানও থাকে।
দুই সপ্তাহ আগে এই থানা থেকেই সজিবকে কোর্টে চালান দেওয়া হয়। আইনজীবী খুব বিরক্ত তার ওপর। গতবারের টাকা এখনো দেয়নি; এরই মধ্যে আবার চলে এসেছে। আইনজীবী মইনুল ইসলাম পুলিশকে বললেন, এদেরকে মোবাইল কোর্টে দিয়ে দিতে পারেন না? মূলত সজিবই পুলিশকে জোরাজুরি করেছে মোবাইল কোর্টে না দেওয়ার জন্য। সে নতুন বিয়ে করেছে। মোবাইল কোর্টে দিলে পুরো তিন থেকে চারমাস চলে যেতে পারে ছাড়া পেতে। তার চেয়ে সাধারণ কোর্টে চালান দিলে দশ পনেরদিনের মধ্যেই জামিন নিয়ে চলে আসতে পারবে। নতুন বউয়ের দোহাই দিয়েছে সে। পুলিশের মনটাও গলে গেল।
দ্রুতই জামিন হয়ে গেল সজিবের। মইনুল ইসলাম বললেন, মানুষ এত এত কাজ করে জীবন চালায়, তোমার কি ইচ্ছা করে না স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে? আর এই কোর্ট–কাচারিতে উকিল কি শুধু আমিই আছি?
ছার, একটা আই ফোন টান দিছিলাম কদিন আগে। কিন্তু বাজারে আই ফোনের দামও আর আগের মতো নাই। মাত্র পাঁশশো টাকা দিবার চায়। অনেক জোরাজুরি করে একহাজার টাকা দিল। আমি কি খামু আর আফনেরে কি দিমু?
গুল মারো আমার সাথে? আই ফোনের দাম এক হাজার টাকা?
হ ছার। ইএমআই নাম্বার না কী যেনো আছে? পুলিশ না–কি ক্যামনে ক্যামনে আসল মালিক বাইর কইরা ফ্যালায়। টানের মাল কারো কাছে পাইলে পরে সে–ই চুরির মামলায় ফাইসা যায়। তাই এহন আর টানের মোবাইলের দাম আর আগের মতো নাই।
তাই বলে কি মাত্র দুইশ টাকা দিবা আমাকে? গতবার তো মাত্র দুইশ টাকা পাঠাইলা মোবাইলে।
ছার, মা জোর কইরা বিয়া করাইয়া দিল।
তা তো জানি। আকাম করতে গিয়া ধরা খাইছো। তা–ও এত কম বয়সী মেয়ের সাথে।
মাথামুতা ঠিক থাহে না ছার। মোবাইলে খারাপ ছিন দেখতে দেখতে আর মাথামুতা ঠিক থাহে না। আর এই শহরের মাইয়াগুলাও যেন ক্যামুন। আফনাদের মাথামুতাতেও জাগন ধরে ছার। পুরুষ মানুষ, সব পুরুষ মানুষের মাথাই ওইহানে অ্যাক।
রাখো তোমার আজাইরা আলাপ। চুরি–ছিনতাই করো, নেশা করো, আকাম–কুকাম করো; কী করো না তুমি বলো তো?
আগে ছার মিছিলে মিটিঙে গেলে কিছু টাকা পাইতাম; মাসে তিন চারটা খ্যাপ দিলেই হইতো। এহন তো তারাও নাই। পেট চালাই কীভাবে?
পেট তো শুধু তোমাদের না…। তোমার শরীর ভালো, শক্তিশালী পুরুষ। অন্য কাজ করতে পারো না? বাড়ি–ঘরের ঠিকানাও তো দেখি আছে। এইসব টানাটানির কাজ তো করে যাদের বাড়ি–ঘরের ঠিকানা নাই। মা–বাবার হদিস নাই।
ভালো হইয়া জামু ছার। কিছুদিন সময় দ্যান। আগের বছর নামাজ দোয়া শুরু করছিলাম। জেলখানায় নামাজের অভ্যাসটা হইয়া গেছিল। তহন তো জেলখানায় চোর ডাকাতের চেয়ে মুন্সী মওলভী কম ছিল না। বিয়া করছি যহন তহন ভালা হইয়াই যামু। কতগুলা গার্মেন্স বন্ধ হইয়া গেল সরকার যাওনের পর। চেষ্টা তো করছি ছার।
সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে সজিব আব্দুল্লাহপুরে এসে গাড়ি থেকে নামলো। খাবার দোকানের মালিক সজিবকে দেখে প্রথমে দোকানে ঢুকতে দিতে চায়নি। উকিলের টাকা বাকি রাখলেও খাবারের দোকানে সজিব বাকি রাখে না। কিন্তু দোকানেরও ইজ্জত সম্মান থাকে। পেটের ক্ষুধা সারার পর অন্য ক্ষুধা মাথায় চাড়াও হয়ে ওঠে। নেশাও জাগছে ধীরে ধীরে। রক্তস্রোতে ঝড় উঠেছে। খাওয়ার পর পকেটে টাকাকড়ি বলতে কিছুই নেই। যে কজন পুলিশ চোখে পড়লো তাদের কেউ চেনা জানা না। পরিচিত পুলিশদের সাথে এদের বিভিন্ন বিষয়ে অলিখিত চুক্তি থাকে। যার অন্যতম হলো ধরা খেলে গণধোলাই থেকে উদ্ধার করে দ্রুত পুলিশের জিম্মায় নিয়ে যাওয়া। সজিব তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না।
বিভিন্ন কাউন্টারের সামনে কিছুক্ষণ উদভ্রান্তের মতো হাঁটাহাঁটি করল। কয়েকজনকে বলল তাকে হেলপারের কাজে নেওয়ার জন্য। কিন্তু এখানকার প্রায় সবাই তাকে চেনে; কেউ রাজি হলো না। রাস্তা পার হওয়ার জন্য যখন সজিব এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই লক্ষ্য করল, উনিশ–কুড়ি বছরের এক তরুণী তার দিকে আসছে। তরুণীটিকে যেন মোবাইলে দেখা কারো মতো মনে হলো। রক্তদোষ পাগল করে দিচ্ছে তাকে। আব্দুল্লাহপুর থেকে সারাদেশেই বাস ছেড়ে যায়। চারদিকে সব বাস কাউন্টার। কোন জায়গা থেকে কোন জেলার বাস ছাড়ে তার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। তরুণীটি সজিবকে জিজ্ঞাসা করল, টাঙ্গাইলে যাওয়ার বাস কোন জায়গা থেকে ছাড়ে ভাই। সজিবও সোজা বলে দিল, আমিও টাঙ্গাইল যাবো, চলেন, একসাথে যাই।









