ভাস্কর চৌধুরী : পুনঃপাঠের সময়

দেবাশীষ মজুমদার | শুক্রবার , ৩ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ

বাবা বলতেন, মরতে বড় ভয় বাবা

হাতটা ধরিস।

হাতে হাত ধরা ছিলো, তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছিলো।

অথচ যাবার বেলা বাবাটা নীরবেই চলে গেল।”

কোনো কোনো কবি অজান্তেই নিজের জন্য একটি এপিটাফ লিখে রেখে যান। ভাস্কর চৌধুরী এই চারটি লাইন লিখেছিলেন তাঁর বাবাকে নিয়ে। আজ তাঁর মৃত্যুর পর কবিতাটি আবার পড়তে গিয়ে মনে হলো, তিনি শুধু তাঁর বাবার কথাই লেখেননি; মানুষের চলে যাওয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষাটিও লিখে ফেলেছিলেন। যে মানুষটি একটু আগে বলেছিল, ‘হাতটা ধরিস’, সেই একসময় কাউকে কিছু না বলেই চলে যায়। মৃত্যুর ভাষা সম্ভবত এর চেয়ে দীর্ঘ হয় না।

সাহিত্যে কিছু লেখকের একটি অদ্ভুত নিয়তি আছে। তাঁদের একটি লেখা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, বাকি সাহিত্য তার আড়ালে পড়ে যায়। ভাস্কর চৌধুরীর ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই। তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই আরেকটি নাম এসে দাঁড়ায়-‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম।’ আবৃত্তির মঞ্চে কবিতাটি প্রায় কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয়তারও একটি নির্মমতা আছে। একসময় কবি আড়ালে চলে যান, কবিতাটি থেকে যায়।

কিন্তু ভাস্কর চৌধুরীকে শুধু ‘নিরঞ্জন’এর কবি বলে মনে রাখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ তাঁর সাহিত্যজীবন একটি কবিতার খুপরি ঘর নয়; বরং বিস্তীর্ণ এক আঙিনা। সেখানে গল্প আছে, উপন্যাস আছে, কবিতা আছে, স্মৃতিকথা আছে, সাহিত্যতত্ত্ব আছে, লেখকজীবনের দায় নিয়ে নিরন্তর ভাবনা আছে, বরেন্দ্রের মাটি আছে, সাঁওতাল মানুষের জীবন আছে, আর আছে বাংলা সাহিত্যের কয়েক দশকের এক জীবন্ত স্মৃতিভাণ্ডার।

তাঁর প্রকৃত নাম আশরাফুল ইসলাম। জন্ম ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভবানীপুর গ্রামে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে বুঝতে গেলে জন্মতারিখের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর ভূগোল। তিনি বরেন্দ্রভূমির লেখক। তবে ‘বরেন্দ্র’ তাঁর কাছে কোনো প্রশাসনিক অঞ্চল নয়; একটি চেতনা। সেই চেতনার ভেতরে আছে লাল মাটি,খরা,নদী, কৃষিজীবন, সাঁওতাল পল্লি প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস এবং অবহেলিত জীবনের দীর্ঘ ছায়া। তাঁর গল্প, উপন্যাস ও কবিতার ভেতর দিয়ে সেই বরেন্দ্রই বারবার নতুন ভাষা পেয়েছে।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। এরপর ‘বাষট্টি বিঘা নদী’, ‘কোথায় নিবাস’, ‘পতনের সময়’, ‘শনিবারে বৃষ্টি’, ‘গল্পের বনসাই’ গল্পকার হিসেবে তিনি নিজস্ব একটি জগৎ নির্মাণ করেন। উপন্যাসে ‘লালমাটি কালো মানুষ’, ‘স্বপ্নপুরুষ’, ‘মীমাংসাপর্ব’, ‘আষাড়ুর জীবনদর্শন’, ‘ভূমি’, ‘কৃষ্ণপুরাণ’, ‘কখনও কখনও এরকম ঘটে’, ‘যুদ্ধে যাবার সময়’, ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ এবং সর্বশেষ ‘স্বপ্নজাল’এই দীর্ঘ উপন্যাসভুবন তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যের স্বতন্ত্র কণ্ঠে পরিণত করেছে। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতিকে যে গভীরতা ও সম্মানের সঙ্গে তিনি সাহিত্যে এনেছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন এখনো বাকি।

কবিতাতেও তাঁর পথ ছিল আলাদা। ‘আমার কেবলই সমর্পণ’, ‘আমার ভেতরে আঁধার’, ‘ ‘গেরিলার মুখ’, ‘আমার যত ভালোবাসা’, ‘হাফপকেটে সন্ধ্যা বুকপকেটে তুমি’, ‘ময়নাবিলাস’, ‘হেমন্ত কাব্য’, ‘আমার মা কবি ছিলেন’, ‘আইসোলেশন’এসব বই প্রমাণ করে, তিনি কেবল একটি জনপ্রিয় কবিতার কবি নন। তাঁর কবিতার ভাষা সংযত, অথচ তার ভেতরে গভীর দার্শনিক সঞ্চরণ। প্রেম লিখেছেন, কিন্তু প্রেমকে কখনো সস্তা আবেগে নামিয়ে আনেননি। মৃত্যু লিখেছেন, কিন্তু মৃত্যুকে রহস্যময় করেননি। মানুষ লিখেছেন, আর শেষ পর্যন্ত মানুষেই ফিরে এসেছেন। তাঁর একটি কবিতায় লিখেছিলেন-“মানুষের মূল অনুভব মনে হয় কেবলই মানুষ।” সম্ভবত এই একটি লাইন তাঁর সমগ্র সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করতে পারে।

ভাস্কর চৌধুরীর সোশ্যল হ্যান্ডেলে দীর্ঘ লেখাগুলো পড়লে মনে হয়, তিনি নিজের স্মৃতিকথা লিখছেন না; বাংলা সাহিত্যের এক অদৃশ্য ইতিহাস লিখে যাচ্ছেন। সেই ইতিহাসে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদুল জহির, কায়সুল হক, কুয়াত ইল ইসলাম আছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, তিনি কখনো এই নামগুলোকে নিজের পরিচয়ের অলঙ্কার বানাননি। বরং লিখেছেন, তাঁদের কাছ থেকে কী শিখেছিলেন। আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্যে লেখক অনেক আছেন, কিন্তু স্মৃতিরক্ষক কম। ভাস্কর চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।

হাসান আজিজুল হকের একটি কথা তিনি বারবার উদ্ধৃত করেছেন-“লেখকের পরিচয় তাঁর লেখার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকা ভালো। রান্নাঘর আর লেখকের জীবনের পেছন দিকে তাকাতে নেই।” কথাটি আপাতদৃষ্টিতে রসিকতা, কিন্তু এর ভেতরে লেখককে তাঁর লেখার মাধ্যমেই বিচার করার একটি কঠোর নৈতিক অবস্থান আছে। ভাস্কর চৌধুরী নিজেও সেই বিশ্বাসের মানুষ ছিলেন। তাই তিনি লেখকের ব্যক্তিজীবন নয়, সাহিত্যিক দায় নিয়েই বেশি ভেবেছেন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে তাঁর একটি স্মৃতি বিশেষভাবে মনে থাকবে। ক্যান্সারে একটি পা হারানোর পরও ক্র্যাচে ভর দিয়ে ডান পায়ে দাঁড়ানো ইলিয়াস হাসতে হাসতে বলছেন, “দেখুন, অবশেষে আমি ডানপন্থী হতে বাইধ্য হলাম।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই ভাস্কর চৌধুরী একজন মানুষের মনোবল, রসবোধ এবং চরিত্র ধরে ফেলেছেন। আবার শামসুর রাহমানের কবিতাপাঠ থেকে তিনি আত্মবিশ্বাসের পাঠ নিয়েছেন। আল মাহমুদের কাছ থেকে শুনেছেনস্বদেশকে না জেনে সাহিত্য হয় না। শহীদুল জহিরের সঙ্গে নির্দ্বিধায় সাহিত্য নিয়ে দ্বিমত করেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিও তাঁর লেখায় আছে। এইসব স্মৃতি কৌতূহলের উপাদান নয়; বাংলা সাহিত্যের ভেতরের ইতিহাস।

আজকের দিনে যখন সাহিত্যআড্ডা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি ছবিতে সীমাবদ্ধ, তখন ভাস্কর চৌধুরীর লেখাগুলো মনে করিয়ে দেয়একসময় আড্ডা লেখক তৈরি করত। কায়সুল হকের সম্পাদনায় ‘শৈলী’র আড্ডা, কুয়াত ইল ইসলামের নতুন লেখক আবিষ্কারের ক্ষমতা, প্রবীণ ও নবীনের নির্ভেজাল মেলামেশাএসব তিনি লিখে না রাখলে হয়তো হারিয়েই যেত। তাঁর এই লেখাগুলো ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।

তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিকও উল্লেখ করার মতো। ১৯৮৮ সালের বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। ‘ইরানা’ উপন্যাসের শুরুতে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটি কবিতা ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু কবির নাম ছাপা হয়নি। ভাস্কর চৌধুরী অনুযোগ করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, পরের সংস্করণে নাম যুক্ত করবেন। আর তা হয়নি। অন্য কেউ হলে হয়তো এই ঘটনাটিকে আজীবনের অভিমান বানিয়ে রাখতেন। ভাস্কর তা করেননি। বরং পরে লিখেছেন, রাজশাহীর নিউমার্কেটে এক ভাইকে তাঁর স্কুলপড়ুয়া বোনের জন্য হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের তালিকা হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখে তিনি বুঝেছিলেন, একজন লেখক কীভাবে দেশের প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারেন। তারপর নিজেই লিখেছিলেন-“একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?” অনুযোগের চেয়ে স্বীকৃতিকে বড় করে দেখার এই উদারতাও তাঁকে আলাদা করে।

অমর একুশের বইমেলায় আমার খুব বেশি যাওয়া হয়নি। তবে যতবার গেছি, ততবারই মনে হয়েছে বইমেলা আসলে বইয়ের চেয়ে মানুষের মেলা। সেখানে কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যা পরে সমৃতি হয়ে থাকে। ভাস্কর চৌধুরী তেমনই একজন। আরেকজন ছিলেন অভাজনের মহাভারতএর লেখক মাহবুব লীলেন।

ভাস্করদার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ভিন্নচোখএর প্রকাশক আলী আফজালদা। আমি তখন একজন মুগ্ধ পাঠক; সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন কবি, যার কবিতা বহুদিন ধরে আমার ভেতরে বাস করছে। উত্তেজিত ছিলাম আমি, তিনি নন। তিনি ছিলেন তাঁর লেখার মতোই নির্ভার, আন্তরিক, বিনয়ী। পরে ম্যাসেঞ্জারে মাঝেমধ্যে কথা হতো। প্রায়ই বলতেন, “ঢাকায় এলে দেখা করো, আড্ডা দেব।”

যাওয়া হয়নি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি কথাই বারবার সত্যি বলে মনে হয়আমরা অপ্রয়োজনীয় কাজগুলোই আগে সেরে ফেলি, প্রয়োজনীয় কাজগুলো পরে করার জন্য রেখে দিই। তারপর একদিন সেই ‘পরে’ আর আসে না।

ভাস্কর চৌধুরী বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি। পুরস্কার দিয়ে কোনো লেখকের মূল্য নির্ধারণ করা যায় নাএকথা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, কিছু অনুপস্থিতি ইতিহাসে থেকে যায়। ভাস্কর চৌধুরীর নামের পাশে বাংলা একাডেমি পুরস্কারটি যোগ হয়নি। এতে তাঁর সাহিত্য ছোট হয়নি; বরং বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকাতেই একটি অপূর্ণতা থেকে গেল।

হাসান আজিজুল হকের সেই কথাটি-“লেখকের পরিচয় তাঁর লেখার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকা ভালো”শেষ পর্যন্ত ভাস্কর চৌধুরী নিজের জীবন দিয়েই সত্য প্রমাণ করে গেলেন। হয়তো আগামী প্রজন্মের কোনো পাঠক আবারও ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’ দিয়েই তাঁর কাছে পৌঁছাবে। তারপর একদিন আবিষ্কার করবেনিরঞ্জন আসলে শেষ গন্তব্য নয়, শুরু। সেই দরজা পেরোলেই খুলে যায় বরেন্দ্রের লাল মাটি, সাঁওতাল জীবনের মহাকাব্য, সাহিত্যআড্ডার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, মানুষের প্রতি এক লেখকের গভীর আস্থা এবং এক বিশাল সাহিত্যভুবন।

নিরঞ্জন’ ছিল শুধু একটি দরজা। সেই দরজা পেরোলেই দেখা মেলে এক বিশাল সাহিত্যভুবনেরযার নাম ভাস্কর চৌধুরী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরক্তদোষ
পরবর্তী নিবন্ধমুফতি এ কে এম ফারুক সিদ্দিকীর ইন্তেকাল