মোয়াজ্জেম হোসেনের আকর গ্রন্থ ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মনীষা’

ইসমাইল জসীম | শুক্রবার , ১৫ মে, ২০২৬ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

মোয়াজ্জেম হোসেনএর ‘সাতকানিয়ালোহাগাড়া মনীষা, শুধু একটি গবেষণাগ্রন্থ নয় এটি আমাদের শেকড়ের সন্ধান, ইতিহাসের আত্মকথন। মোয়াজ্জেম হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি গবেষণায় আত্মনিবেশ করেন। তিনি একজন মুক্তচিন্তার গবেষক হিসেবে সমাজ ও ইতিহাসকে দেখেছেন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে। তাঁর লেখায় যেমন বস্তুনিষ্ঠতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাহিত্যিক সৌন্দর্য।

মানুষ তার ভূগোলের সন্তান, আর ইতিহাস তার পরিচয়ের ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা প্রায়ই জাতীয় বা বৈশ্বিক ইতিহাসের ভিড়ে নিজেদের আঞ্চলিক ইতিহাসকে ভুলে যাই। আমাদের আশেপাশের সেই মানুষগুলো, যারা নীরবে সমাজকে আলোকিত করেছেন, তাদের নামপরিচয় অনেক সময় ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় না। এই অনুল্লিখিত মানুষদের জীবনের আলোকরেখা ধরেই নির্মিত হয়েছে এই অসাধারণ গ্রন্থ।

সাতকানিয়ালোহাগাড়া মনীষা’ বইটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাসভাণ্ডার, যেখানে সময়ের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা মনীষীদের জীবনকথা একত্রিত হয়েছে। এখানে শুধু জীবনী নেই আছে সময়ের প্রতিচ্ছবি, সমাজের বিবর্তন, এবং মানুষের সংগ্রামের মহাকাব্যিক বর্ণনা। প্রতিটি জীবন যেন এক একটি গল্প, এক একটি আলোকবর্তিকা, যা আমাদের পথ দেখায়। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ বহুমাত্রিক প্রতিভার মানুষ। তাদের মতো মনীষীদের জীবন আমাদের শুধু তথ্য দেয় না, আমাদের ভাবতে শেখায়, অনুপ্রাণিত করে, আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়।

গ্রন্থটির ভাষা ও উপস্থাপনায় একটি সাহিত্যিক সৌন্দর্য বিদ্যমান। এটি নিছক তথ্যের সমষ্টি নয়; বরং গবেষণার কঠোরতা ও সাহিত্যের মাধুর্যের এক চমৎকার সংমিশ্রণ। লেখক তথ্যকে প্রাণবন্ত করেছেন, ইতিহাসকে করেছেন অনুভবযোগ্য। ফলে পাঠক কেবল জানেন না, তারা অনুভব করেন, উপলব্ধি করেন।

এ বইয়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো এটি আমাদের স্থানীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করছে। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে, যখন সংস্কৃতির সীমানা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে, তখন নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরা অত্যন্ত জরুরি। এই গ্রন্থ সেই শিকড়ের সন্ধান দেয়, আমাদের বলে আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের পূর্বসূরিরা কারা ছিলেন।

. আ ফ ম খালিদ হোসেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা বইটির মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে

ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর ‘Dark Ladz থেকেউদ্ধৃত করে লিখেছেন– “I Shall Make You Immoratal. My Pen Has That Capacity’. ‘আমি তোমাকে অমর করে রাখবো আমার কলমে সে শক্তি রয়েছে।’ আমাদের প্রীতিভাজন জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন সেই শক্তি দিয়েই আলোক বর্তিকাবাহী সেই মানুষদের অমর করে রাখার কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একজন ঐতিহ্যপ্রেমী ও শেকড়সন্ধানী গবেষক। তিনি এতদঞ্চলে সময়ের আবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অথবা অন্তরালবর্তী মনীষীদের জীবনকাহিনী তথ্যসূত্র সহকারে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। শ্রমসাধ্য এই কাজ সম্পাদনে তিনি বারে বারে মানুষের দুয়ারে গিয়েছেন উপাত্ত সংগ্রহের তাগিদে। তিনি ‘সাতকানিয়ালোহাগাড়া মনীষা’ গ্রন্থে এমন মনীষীদের জীবন ও কর্ম তুলে এনেছেন যা পাঠককে রীতিমতো বিস্মিত করার পাশাপাশি বিমোহিতও করবে।” প্রবীণ শিক্ষাবিদ প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও ইসলামী সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক আহমদুল ইসলাম চৌধুরী বইটি সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানাতে গিয়ে বলেন, ‘কীর্তিমানের কথা বললেই কীর্তিমান মানুষের আবির্ভাব হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে যদি আলোকিত ও কৃতী ব্যক্তিদের কর্ম, ত্যাগ, দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা তুলে ধরতে হবে। না হলে তারা যে প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, সে প্রদীপ ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ হতে থাকবে। আজ তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তাদের চিন্তা, চেতনা ও মননে বিধ্বংসী মনোভাব। ক্ষমতার জন্য, রাজনীতির জন্য, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বার বার আঘাত হানছে মানুষের উপর। নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়কে নিয়ে গেছে ধ্বংসের কিনারায়। এই ধ্বংসের কিনারা থেকে তাদের বাঁচাতে হবে। তাদের দিতে হবে নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন শিক্ষা, মানুষের মাঝে অমর হয়ে বেচে থাকার প্রেরণা। তাই তাদের মহৎ মানুষের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে হবে। এই সত্যটি উপলব্ধি করলে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হবে, যে সব গুণী ব্যক্তি ও মনীষী বিগত সময়ে আবির্ভাব হয়েছে তাদের অবদানের কথা তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। মহৎ মানুষের জীবনী থেকে সত্যিকারের সফল মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাবে। দেশ পাবে সোনার মানুষ। আর সোনার মানুষের মাধ্যমে দেশ হবে সুখী ও সমৃদ্ধশালী’।

প্রতিটি গ্রন্থের কিছু সীমবদ্ধতা থাকে, থাকে দায়, লেখক তাঁর এ দায়বোধ থেকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক আলোকিত ব্যক্তি আছেন, যারা নিজেকে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখেন এবং নিজের যশখ্যাতি অন্য কাউকে জানতে দিতে চান না, কিম্বা তাঁর উত্তরাধিকারগণ জানাতে চান না অজ্ঞতা বশত কিম্বা এড়িয়ে চলার মানসিকতায় এমন অনেক মনীষীর জীবনী এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করতে পারিনি। আবার এমন অনেকে আছেন, যাদের কৃতি, যশ ও খ্যাতির খবর আমাদের দৃষ্টির অগোচরে রয়েছে, স্বাভাবিকভাবে তাদের কীর্তি এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়নি।’। তিনি আরো বলেছেন, ‘বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে ১০০ জন গুণীজন বাছাই করে তাদের জীবনী সংগ্রহ করা খুবই দুষ্কর।’ তিনি সেই দুঃসাধ্য কাজটি করেছেন অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও বন্তুনিষ্ঠ আন্তরিকতায়।

সাতকানিয়ালোহাগাড়া মনীষা’ এমন একটি আলোকবর্তিকা যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করেছে। এই গ্রন্থ আমাদের শুধু ইতিহাস জানায় না, আমাদের পরিচয় গড়ে তোলে, আমাদের গর্বিত করে। আসুন, আমরা এই ধরনের গবেষণা ও সাহিত্যচর্চাকে আরও উৎসাহিত করি, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যায়, বরং গর্বের সাথে ধারণ করে।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅভিমানে সময় হারিয়ে যায়
পরবর্তী নিবন্ধইসলামী শাসন ব্যবস্থার পতন : কারণ ও প্রতিকার