প্রতিটি পেশাই স্বতন্ত্র ও জীবিকা নির্বাহের অন্যতম হিসেবে সমান গুরুত্বপূর্ণ হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেটার প্রভাব সমাজে পড়ে প্রত্যক্ষভাবে। সংবাদপত্রের একটি সংবাদ যেমন বদলে দিতে পারে সমাজের চেহারা তেমনি ধ্বংসও ডেকে নিয়ে আসতে পারে অনায়াসে। এজন্য সাংবাদিককে যেমন হতে হয় সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী ও শিক্ষিত; তেমনি তাঁর পরিবেশিত সংবাদ বা লেখনী হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। পাঠক সংবাদপত্র পড়ে যথেষ্ট আস্থাশীল হয়। পত্রিকায় যেসব সংবাদ ছাপা হয়, তার সবটাই সত্য, কোথাও কোনো মিথ্যার ছোঁয়া নেই–এ বিশ্বাস পূর্ণ থাকে কানায় কানায়। যদি কখনো সংবাদপত্রে ভুল সংবাদ ছাপা হয়, তখনো তাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয় পাঠক। সংবাদপত্র সব সময় সত্যাশ্রয়ী বলে তাকে বলা হয় ‘সত্যের দর্পণ’।
সাংবাদিকতা সমাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে বলে সাংবাদিককে কখনো কখনো পথ প্রদর্শকেরও ভূমিকা নিতে হয়। নৈতিকতা ও নীতিবোধ যেমন প্রচণ্ডভাবে থাকবে, তেমনি দেশের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কেও থাকতে হয় সচেতনতা। এজন্য ইচ্ছে করলেই একজন সাংবাদিক সব কিছু ছাপাতে পারেন না, তাঁকে ভাবতে হয় এর পরিণতি সম্পর্কেও।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ঘটেছে এক সরব বিপ্লব। সংবাদপত্রের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়েছে এর প্রত্যক্ষ ছাপ। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নানা নিয়মের উপর পড়েছে নতুন খড়গ। কিছু কিছু পত্রিকা ‘আধুনিকতা’কে ধারণ করতে গিয়ে ক্রমশ লংঘন করে চলেছে সাংবাদিকতার নীতিমালা। তছনছ করে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠিত ধ্যান ধারণা। কেউ কেউ এটাকে অভিনন্দিতও করছে। সংবাদপত্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্রকে মানবিকতার ঝাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। সাংবাদিককে হতে হয় মানবিক। এটাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখে কাজ করে যতে হবে সাংবাদিকদের।
এই প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় খুবই আশাব্যঞ্জক এবং সবচেয়ে বড় আনন্দের ব্যাপার আমি লক্ষ করলাম গত ৩ মে রোববার মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশনে বারবার উচ্চারিত হলো মানবিকতার প্রসঙ্গ। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা: সুযত পাল তাঁর বক্তৃতায় বললেন, আমরা শিক্ষার্থীদের কেবল ডাক্তারি পড়াশোনায় গড়ে তুলবো না, আমরা তাদের মানবিকতার পাঠ দেবো, আমরা আর্ট শেখাবো।
বলা জরুরি যে, মানুষের যে গুণটি সবার আগে থাকা উচিত সেটি হচ্ছে মানবিকতা। মানুষকে মানুষ বলা হয় কারণ তার মধ্যে মানবিকতা আছে, বোধ–বিবেক আছে, হিতাহিত জ্ঞান আছে, ভালো–মন্দ যাচাই করার সক্ষমতা আছে যা অন্য কোনো প্রাণী বা জীবের মধ্যে থাকে না। আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যম থেকে পাচ্ছি অসংখ্য অমানবিক সংবাদ। কখনো নির্মমভাবে পিটিয়ে শিশুহত্যা, কখনো শিশু ধর্ষণ, কখনো ধর্ষণের পর হত্যা নয়তো বা কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করার খবর।
আর যখনই এ ধরনের খবরগুলো শুনতে হয় তখনই মনে হয় আমরা বোধ হয় সভ্য জগত থেকে আজও অনেক দূরে। সভ্যতার আলো বোধহয় আমাদের স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আজ বিবেকহীন হয়ে গেছি! আমাদের মাঝে মানবতা নেই বললেই চলে!
বার্নার্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘আমাদের ধর্ম হোক ভালোবাসা আর জাত হোক শুধু মানবতা। তবেই আমরা জয়ী হবো।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব, তাহাকে আর কোনো নাম দেবার দরকার পড়েনা।’ তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘মনুষ্যত্বের মূলে আর একটি প্রকাণ্ড দ্বন্দ্ব আছে ; তাকে বলা যেতে পারে প্রকৃতি এবং আত্মার দ্বন্দ্ব। স্বার্থের দিক এবং পরমার্থের দিক, বন্ধনের দিক এবং মুক্তির দিক, সীমার দিক এবং অনন্তের দিক–এই দুইকে মিলিয়ে চলতে হবে মানুষকে।’
আমি যখন শুনলাম, মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজে নিয়মিত বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, সংগীতসহ নানা বিষয়ের চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও মানবিক মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার প্রয়াস রয়েছে, তখন বুকটা ভরে গেলো। মানবতার পাঠশালা, আর মানবিক বোধ জাগ্রত করার এমন প্রয়াস সত্যি প্রশংসাযোগ্য। শিক্ষার্থীদের শপথ গ্রহণের মধ্যে উঠে এসেছে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ।
চিরায়ত সংস্কৃতি বিকাশের বাহন মানবতার পাঠশালাগুলোকে এমন হতে হবে। বিজ্ঞান, চিকিৎসার পাশাপাশি শুদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ যেমন জরুরি, আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। ‘ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধকে পরিশুদ্ধ করার নিমিত্তে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সর্বার্থে মানুষ হওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরি।’ আমরা অন্ধ বিবেকের বদ্ধ ঘরে থাকতে চাই না। আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ সুন্দরভাবে সাজাতে চাই। মানবিক আলোয় ভরে তুলতে চাই আমাদের সমাজ। সত্য, সুন্দর ও স্বচ্ছতায় জাগিয়ে তুলতে হবে বিবেক। সবার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা মানবিকতা এবং মনুষ্যত্ব জাগ্রত হোক।
২.
মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের ১ম বর্ষ এমবিবিএস কোর্সের (সেশন ২০২৫–২০২৬) ওরিয়েন্টেশন উপলক্ষ্যে মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডাঃ সুযত পালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগাং এর উপাচার্য প্রফেসর ডাঃ মোঃ জাহিদ হোসেন শরীফ, সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গর্ভনিং বডির (বিএমডিসি প্রতিনিধি) সদস্য প্রখ্যাত চিকিৎসক সংগঠক ডাঃ খুরশীদ জামিল চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডাঃ মো: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এমসিএমসিএইচ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: মো: আবদুস সালাম, এমসিএমসিএইচ এর উপদেষ্টা ও পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ শরীফ, কলেজের উপাধ্যক্ষ ও একাডেমিক কোঅর্ডিনেটর প্রফেসর ডাঃ কামরুন নেসা, এমসিএমসি এর মেডিকেল এডুকেশন ইউনিট এর চেয়ারম্যান ও ফেইজ ১ কোঅর্ডিনেটর প্রফেসর ডা: দিলরুবা সিরাজী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখি আমি ও এমসিএমসিএইচ এর গাইনী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ ফাতেমা খান। শিক্ষার্থীদের পক্ষে আমাদের মেয়ে আয়মার রউফও তার প্রতিক্রিয়া জানায় তার বক্তব্যে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা: সুযত পাল নবাগত ছাত্রছাত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ১ম ২য় ৩য় ও চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় অত্র কলেজের ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অর্জনকারী ছাত্রছাত্রীদেরকে সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের নিদের্শনা অনুযায়ী নবাগত ৬৫ জন শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রজাতির ৬৫ টি গাছের চারা রোপণ করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ সাগরিকা শারমীন। অনুষ্ঠানটি খুবই আন্তরিক পরিবেশে সম্পন্ন হয়। অধ্যক্ষ–উপাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে সকলের আন্তরিকতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। আতিথেয়তায় সচিব পংকজ দা–ও কম যান না।
৩.
শুরুটা করেছিলাম সাংবাদিকতায় মানবিকতা প্রসঙ্গ নিয়ে। সব পেশার প্রতি সম্মান রেখে বলতে পারি, আমাদের ভাবনায় চিকিৎসা হলো সকলের জন্য উপকারী এক পেশা, যদি তা মানবিক হয়। সামাজিক প্রভাব এতে প্রবল। চিকিৎসকরা তাই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন। সকল পেশাই মানবিকতার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ থাকুক, তাতে ভরা থাকুক অমৃত সুধা– সেই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;
ফেলো, বাংলা একাডেমি।













