ব্যাঙামি ও ব্যাঙি

কবির কাঞ্চন | বুধবার , ৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

মিনাদের ধানক্ষেতের পাশে ব্যাঙামি নামের এক কোলাব্যাঙ বাস করতো। সে ছিল জন্মগতভাবে লুলা। স্বভাবগত দিক থেকে অন্যসব ব্যাঙের চেয়ে ভিন্ন। সবাই যখন মিনাকে দেখে দৌড়ে পালাতো তখন সে চোখ বুঁজে শুয়ে থাকতো।

একদিন লুলা ব্যাঙটির জন্য মিনার খুব মায়া হলো। সে ব্যাঙটির কাছাকাছি গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

– এই ব্যাঙ, আমি যখন এদিকে আসি তখন আমাকে দেখে সবাই যে যার মতো করে পালিয়ে যায়। কিন্তু তুমি যাও না। তুমি কী আমায় ভয় পাও না?

লুলা ব্যাঙটি এবার চোখ মেলে ভালোভাবে মিনার দিকে তাকিয়ে বলল,

– প্রাণের ভয় কার না আছে? আমিও ভয় পাই। কিন্তু তুমি তো জানোই আমি লুলা ব্যাঙ। আর সবার মতো করে আমি লাফিয়ে পালিয়ে যেতে পারি না। আমি জানি স্রষ্টার হুকুম ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। স্রষ্টা যদি আমায় বাঁচিয়ে দেন তাহলে কেউই আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।। এই ভরসায় আমি চোখ বন্ধ করে আমার স্রষ্টার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।

লুলা ব্যাঙের কথা শুনে মিনা চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকে।

এই ফাঁকে লুলা ব্যাঙ আবার বলল,

– কী হলো তোমার! কথা বলছ না কেনো?

– না, কিছুই হয়নি। শুধু তোমার কথাগুলো ভাবছিলাম। স্রষ্টার প্রতি তোমার যে অগাধ বিশ্বাস তা একজন বান্দা হিসেবে সবারই থাকা উচিত। তোমার কথাগুলো আমার খুবই ভালো লেগেছে। আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। সবাই যখন আনন্দে খেলাধূলা করে তখন তোমাকে ক্ষেতের এককোণে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখি। তুমি কেনো ওদের সাথে খেলো না? তোমার কী কোনো বন্ধু নেই? আর হ্যাঁ, তোমার নামটা যেনো কী?

লুলা ব্যাঙ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলল,

– আমি ব্যাঙামি। তোমাদের মতো আমাদের মাঝেও হিংসা–বিভেদের কমতি নেই। এখানেও কেউ কারোর উপকার করতে আসে না। পারলে ক্ষতি করে।

– তোমার কথা ঠিক বুঝলাম না।

– না বোঝার কী আছে! এখানে আমার সমবয়সী একটা ব্যাঙ আছে। কোলাব্যাঙ। ওর নাম ব্যাঙি।

শারীরিক দিক থেকে ও খুব সুন্দর। শক্তিশালীও। ও আমাকে দেখলে সবসময় লুলা বলে ব্যাঙ্গ করে। এতে আমার খুব খারাপ লাগে। ব্যাঙি একবারের জন্যও বুঝতে চায় না– আমিও ওর মতো একটা জীব। আমার মাঝেও মান–অপমান বোধ আছে। আমি নিজের ইচ্ছায় তো আর লুলা হইনি। আমার বিশ্বাস, আমার জন্য যা কল্যাণকর, আমার স্রষ্টা তা–ই করেছেন। হয়তো লুলা হয়ে জন্ম নেয়ার মাঝে আমার জীবনের কোনো মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে।

– তোমার কথা একদম ঠিক। তুমি ওর কথায় মনে কষ্ট নিও না। দেখবে একদিন ও নিশ্চয় বুঝতে পারবে।

– আমিও তা চাই। ওকে অভিশাপ দিতে গিয়েও বারবার থেমে গেছি। কারণ কাউকে বিপদে ফেলা সহজ। কিন্তু বিপদ থেকে উদ্ধার করা কঠিন। আর অভিশাপ না দিয়ে ওর ভুল ভেঙে দেয়ার মাঝে জীবনের সার্থকতা আছে। আমি সেরকম সার্থকতা চাই।

– ঠিক বলেছ। আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

– বলো।

– তোমার কোনো আপত্তি না থাকলে এসো না আজ থেকে আমরা দু’জন বন্ধু হয়ে যাই।

ব্যাঙামি আনন্দে লাফিয়ে ওঠে বলল,

– আমি রাজি। তোমার মতো এমন ভালো মেয়ের বন্ধু কে না হতে চাইবে?

মিনা হেসে ওঠে বলল,

– তা–ই, আমার মনে হয় তুমি এখনও কিছু খাওনি। তুমি একটু বস। আমি তোমার জন্য কিছু পোকামাকড় ধরে নিয়ে আসি।

এই কথা বলে মিনা পুরো জমি ঘুরে ঘুরে বেশকিছু পোকামাকড় ধরে এনে ব্যাঙামিকে নিজ হাতে খাওয়ে দিল।

অনেকদিন পর ব্যাঙামি পেট ভরে খেতে পেরে মিনার দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে রইল।

এমন সময় খানিক দূর থেকে ব্যাঙি ‘’ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাং” সুরে ডাকতে শুরু করলো। মিনাকে সেদিকে এগুতে দেখে ব্যাঙামি বলল,

– ওদিকে যেও না, বন্ধু।

– কেনো?

– একটু আগে যার কথা তোমায় বলেছি, ও ওখানে বসে আমাকে ব্যাঙ্গ করছে। এখন আমি কিছু বললেই ঝগড়া শুরু করবে। মনে হয় তোমাকে দেখে ভয়ে এদিকে আসছে না।

– তা–ই!

এই কথা বলে মিনা চুপিচুপি ব্যাঙির দিকে এগুতে লাগল। মিনার উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যাঙি লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গেল। এরপর মিনা আবার ব্যাঙামির কাছে ফিরে এলো।

ব্যাঙামি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

– বন্ধু, ব্যাঙিকে কিছু করোনি তো!

– না, আমি ওর কাছে যেতে না যেতেই পালিয়ে গেল।

ব্যাঙামি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

– ভালোই হলো। কাউকে কষ্ট দেয়া ঠিক নয়, বন্ধু।

– ও যে তোমাকে কষ্ট দেয়!

– সবার বুঝ এক হয় না, বন্ধু।

মিনা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,

– বন্ধু, আমাকে এখন বাসায় ফিরতে হবে। আব্বু আম্মুকে বলে আসিনি। আমার জন্য খুব চিন্তা করবেন। তুমিও ফিরে যাও।

– আচ্ছা।

একদিন ব্যাঙি বুকে ভর দিতে দিতে ব্যাঙামির সামনে এসে পড়ল। ব্যাঙামি ওকে ভালোভাবে দেখে বলল,

– তোমার আবার কী হয়েছে?

– আর বলো না। গতকাল খেলতে বেরুচ্ছিলাম। হঠাৎ কতকগুলো দুষ্টছেলে আমাদের তাড়া করলো। তখন প্রাণভয়ে সবার সাথে আমিও দৌড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ধানগাছের সাথে ধাক্কা লেগে আমি পড়ে যাই। তখনই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করি। সফলও হয়েছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটি দুষ্টছেলের চোখে ধরা পড়ে যাই। তারপর আমার এই দশা হলো। এখন তো আমিও তোমার মতো লুলা হয়ে গেলাম।

– একদম মন খারাপ করো না, বন্ধু। মনে রেখো, স্রষ্টা আমাদের জন্য যা কিছু করেন, সবই আমাদের ভালোর জন্যই করেন। তুমি লুলা হয়েছো তাতে কী! বেঁচে তো আছো। এই, আমাকে লক্ষ্য করো না। জন্মের পর থেকে লুলা হয়ে জীবনযাপন করছি। কৈ আমার তো কিছু হয়নি। আর কে কী বলল ওসব নিয়ে না ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ, বুঝলে?

– আমি তোমাকে কতো অপমান করেছি।কারণে–অকারণে ক্ষেপিয়েছি। কিন্তু তুমি কোনোদিন তার কোনো প্রতিউত্তর করোনি। ভেবেছিলাম আজ আমাকে এই অবস্থায় দেখে তুমি উপহাস করবে। কিন্তু তা না করে সান্ত্বনা দিলে। সত্যি তোমার কোনো তুলনা হয় না। তুমি আমায় ক্ষমা কর, বন্ধু।

– তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছ। এটাই আমার কাছে বড় আনন্দের বিষয়।

হঠাৎ করে ব্যাঙামি ও ব্যাঙির সামনে মিনা এসে হাজির হয়। সে দু’জনকে একসাথে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

– বন্ধু, এটি কী সেই ব্যাঙ যে তোমাকে সবসময় লুলা বলে খোঁটা দিতো।

ব্যাঙামি আস্তে করে বলল,

– হ্যাঁ, ওই ব্যাঙি।

– ওর এই দশা কেনো?

– গতকাল এক দুষ্টছেলে ওর এমন হাল করেছে।

– ভালোই করেছে। অহংকারীদের আল্লাহ এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকেন।

– ওভাবে বলো না, বন্ধু। কারো অমঙ্গল চাইতে নেই। এতে স্রষ্টা অখুশি হন। ব্যাঙি তার ভুল বুঝতে পেরেছে। আর আমিও তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এখন থেকে ও আমার বন্ধু।

মিনা হেসে ওঠে বলল,

– তোমার বন্ধু হলে তো আমারও বন্ধু।

এরপর ব্যাঙির সামনে এসে বলল,

– কী তুমি আমার বন্ধু হবে?

ব্যাঙি হাসিমুখে জবাব দিলো,

– ঠিক আছে। আজ থেকে আমরা তিনজন বন্ধু হলাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরঙিন প্রজাপতি
পরবর্তী নিবন্ধঅন্য কোনো দুনিয়ার সুড়ঙ্গ?