বিরল কাব্যপ্রতিভা

তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী | শুক্রবার , ২১ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ

বাংলা সাহিত্যে কবি নজরুল এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচনার পরিধি বহুধাবিস্তৃত ও ব্যাপকতর, কণ্ঠে বিচিত্র সুরের মূর্ছনা। বাংলার সাহিত্যাকাশ যখন ‘ রবি কর’ এ দীপ্তমান, ঠিক তখনই নজরুলের উন্মেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সচেতনভাবে রবি ঠাকুরএর কাব্যবলয় অতিক্রম করার প্রচেষ্টা না চালিয়েও রবি ঠাকুর থেকে ছিলেন স্বতন্ত্র, স্বতন্ত্র ছিল তাঁর কবিতার বহমানতা। রবি ঠাকুর স্বয়ং তাঁর প্রতিভা দীপ্তিতে চমকিত হয়ে তাকে ‘বসন্ত’ নাটকটি উৎসর্গ করে অভিনন্দিত করেন। প্রকৃত অর্থে নজরুলই বাংলা কবিতায় মহাসমুদ্রের উত্থাল তরঙ্গের মতো বেগবান প্রবাহ আমদানি করে একে বাঙালির সম্পদে পরিণত করেছেন। বাংলা কবিতার পাঠকদের জন্য তা ছিল অভূতপূর্ব।

কবি পোপ বলেছেন, মানব জাতির প্রকৃত অধ্যয়ন ক্ষেত্র হলো মানবজীবন। নজরুলের জীবনে এ বিশেষ দিকটির বিশেষ প্রভাব দেখা যায়। ব্যক্তিগত জীবনে নজরুল বিদ্যালয় শিক্ষা খুব একটা বেশি গ্রহণ করার সুযোগ না পেলেও মানবজীবন সম্পর্কে ছিল তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ। শ্রেণিগত অবস্থানজনিত নৈকট্য তাঁকে মানুষের সুখদুঃখ, ব্যথাবেদনাকে খুব কাছে থেকে গভীরভাবে অনুভব করতে প্ররোচিত করে। আর এই অনুভব বাঙময় হয়ে ওঠে তাঁর কবিতায়। তাইতো তিনি ছিলেন বেদনা সুন্দরের কবি, গণমানুষের কবি, বিদ্রোহী কবি। তিনি যা কিছু দেখেছেন, যা কিছু অনুভব করেছেন, তারই তিনি প্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর কবিতায়। কারণ তাঁর ছিল, ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।’ তিনি বলেছেন, ‘আমি উঁচু বেদির উপর সোনার সিংহাসনে বসে কবিতা লিখিনি, যাদের মূক মনের কথাকে আমি ছন্দ দিতে চেয়েছি, মালকোঁচা মেরে সেই তলার মানুষের কাছে নেমে গেছি।’ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই তলার মানুষের কাছে নেমে গিয়ে তাদের সাথে অবস্থান করে আজীবন অর্থসংকট ও অস্থিরতার মধ্যে থাকলেও, ‘কাব্যলক্ষী’ তাকে ছাড়েনি।

অনেকে অবশ্য নজরুলের ছন্নছাড়া জীবন, সামসময়িক সমাজ ও সময়কে তাঁর কবিপ্রতিভা বিকাশের একমাত্র কারণ মনে করেন এবং এ মানদণ্ডে তাঁর কবিতাকে উপলব্ধি করতে চান। কিন্তু আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, একজন কবির জীবন, সময় ও সমাজ তাঁর কবিতায় প্রভাব বিস্তার করলেও এটা তাঁর কবিতা উপলব্ধির একমাত্র মানদণ্ড ও পথ নয়। শোনা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর বৌদি কাদম্বরী দেবীর প্রেম ছিল, ফরাসি কবি করবিয়ের আজীবন বেশ্যাপাড়ায় কাটান, বিখ্যাত কবি কীটস ও শেলী স্পর্শকাতরতা ও সমকামিতার মতো কুঅভ্যাসে ভুগতেন, মীর্জা গালিব ও রুশ উপন্যাসিক দস্তয়েভস্কি ব্যক্তিগত জীবনে জুয়া খেলতেন। কিন্তু এগুলোই তাদের জীবনের সবকিছু নয়। শুধু এগুলো দিয়ে তাদের সাহিত্য বিচার করা হলে ভুল হবে। কারণ এগুলোর বাইরেও তাদের সাহিত্যে, কবিতায় সার্বজনীন, চিরন্তন আবেদন রয়েছে। নজরুলের বেলায়ও ঠিক তাই হয়েছে ।

নজরুলের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ১৩২৬ সালের শ্রাবণ মাসে। কবিতাটির নাম ছিল ‘মুক্তি’। তারপর থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর অসংখ্য কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এসব কবিতা লক্ষ করলে দেখা যায়, এগুলো নানামুখী বাঁক ও গতিধারায় বৈচিত্র্যময়। এর অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে এটাও একটা কারণ যে, পাহাড়ি নদীর মতো প্রাণউচ্ছ্বসিত এই কবির মাঝে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কবিতা লিখে সকলকে চমকিত করার মতো এক বিরল গুণের সমাবেশ ছিল। এছাড়া তিনি নিজেই বলেছেন, ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।’ এজন্য তাঁর কবিতায় কিছুটা স্ববিরোধিতা, বৈপরীত্যের ঐক্য বা দ্বান্দ্বিক সমন্বয়ও লক্ষ্য করা যায়। তিনি তার কবিতায় ধ্বংস ও সৃষ্টি, কঠোরতা ও কোমলতা, আধ্যাত্মিকতা ও দ্রোহের মতো বিপরীতধর্মী উপাদানগুলোকে একই বৃত্তে মিলিয়েছেন। কখনো তিনি বিধাতার বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার মতো অপরিসীম দম্ভোক্তি সহকারে আপনারে ছাড়া কাউকে কুর্নিশ জানাতে অস্বীকার করেছেন, আবার কখনোবা বিধাতার কাছে আত্নসমর্পণের ভঙ্গিতে বিধাতার গুণ গেয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।’ কখনো তিনি স্রষ্টার শনি, মহাকাল ধূমকেতু ; আবার কখনও তিনি ‘চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন চুড়ির কন কন।’ তাঁর সৃষ্টি বৈচিত্র্যের একদিকে অগ্নিবীণা / বিষের বাঁশী / প্রলয় শিখা / ভাঙ্গার গান ; অন্যদিকে সাম্যবাদী / পূবের হাওয়া / সিন্ধু হিল্লোল / দোলনচাঁপা / চক্রবাক। তাঁর ‘বিদ্রোহী’র উদ্দাম ঝঞ্ঝার সাথে ‘সাম্যবাদী’র স্থির প্রত্যয়ের কোনো মিল নেই।

নজরুল মননে প্রলয়োল্লাসোচিত ভাঙ্গনের পটভূমি এবং সে ভাঙনের আড়ালে সৃষ্টির প্রেরণা উপ্ত। আসলে নজরুলের কবিতার বৈপরীত্যই আমাদেরকে তাঁকে বুঝতে সহজ করে দিয়েছে। কারণ এখানে তাঁর মান, অভিমান, রাগ, দ্বেষসবকিছু ধরা পড়েছে। সমগ্র নজরুল আমাদের কাছে সমুপস্থিত হয়েছেন তাঁর কবিতার স্বচ্ছ দর্পণে। প্রকৃতপক্ষে একাধিক বিরোধী প্রবণতার সমীকরণেই নজরুল মানস গঠিত। বহু বিরোধের গোপন সহবাসে তার কাব্য তৃপ্ত।

নজরুলের কাব্যশরীর বিশ্লেষণ করলে প্রধানত দুটি ভিন্নধর্মী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর একটি হলো তাঁর সংগ্রামমুখর চৈতন্য এবং অন্যটি তাঁর প্রেমিক মানস। এই দুই বিপরীতমুখী প্রবণতার সমীকরণ হলো তাঁর মানববীক্ষণ ও মনুষ্যত্ববোধ। ফলতঃ বলা যায়, নজরুলের কাব্যসাধনা একান্তই মানবকেন্দ্রীক। তিনিই প্রকৃত অর্থে মানব মনের অন্তর্বেদনা হৃদয় দিয়ে আন্তরিকভাবে অনুভব করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির কাবা নেই।’ তিনি বলেছেন, ‘স্রষ্টাকে আমি দেখিনি, কিন্তু মানুষকে দেখেছি। সকল ব্যথিতের ব্যথায়, সকল অসহায়ের অশ্রুজলে আমি আমাকে অনুভব করি, এই ব্যথিতের অশ্রুজলের মুকুরে যেন আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।’ তিনি মানুষকে সবার উপরে স্থান দিয়ে গেয়েছেন

গাহি সাম্যের গান,

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নাহি কিছু মহিয়ান।’

সুতরাং তিনি যে মানুষের কবি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ড. আহমেদ শরীফের ভাষায়, ‘বিংশ শতাব্দীতে যদি সাধারণ মানুষের কবিকে আমরা চিহ্নিত করি, তবে সর্বপ্রথম নজরুলের নাম উল্লেখ করলে সত্যের অপলাপ হবে না।’

তিনি মানুষের কবি ছিলেন বলেই মানুষের ভালোবাসা তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ করেছে। অসুস্থ হওয়ার বছরখানেক পূর্বে এক অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রেমই যেন আমার অস্তিত্ব। এই অস্তিত্ব, এই প্রেমকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলেই যেন আমি সংহারের পথে চলেছিলাম।’ আসলে মানুষের যন্ত্রণাই তাঁকে দগ্ধ করেছে, এই যন্ত্রণার সুতীব্র প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর ১৩৯ পংক্তির বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি সুউচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি সেইদিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না। /অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’ তাঁর বিদ্রোহ নীরস আস্ফালন শুধু ছিল না, শুধু বিদ্রোহ ও ভাঙনের কথাই তিনি কবিতায় বলেননি, সাথে সাথে তিনি প্রেমের কথাও বলেছেন। একদিকে তিনি বিদ্রোহ করেছেনদেশকালসমাজের শোষণ, বঞ্চনা এবং অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ; আবার অন্যদিকে প্রচণ্ড আবেগ অনুভূতি রসে দেশমাটিমানুষপ্রকৃতির প্রতি দেখিয়েছেন অপরিসীম প্রেম। তাঁর উচ্চস্বর গ্রামে রচিত ‘বিদ্রোহী’র বাইরে যদি ‘চক্রবাক’ গ্রন্থের রোমান্টিক প্রেমের কবিতার অন্দরমহলে চোখ রাখেন, তাহলে পাঠক অন্যরকম স্বাদ পাবেন।

নজরুল একাধারে বিদ্রোহী, অন্যদিকে প্রেমিকও। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘মম একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,/আর হাতে রণতূর্য।’ একদিকে তিনি দাম্ভিক উচ্চারণে উচ্চলয়ে হুঙ্কার তোলেন, “লাথি মার, ভাঙরে তালা! যত সব বন্দীশালায়আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল্‌ উপারি”। আবার অন্যদিকে তিনি ‘চরকার গান’ এ গন্ধীর অহিংস সুর তুলে বলেন, “ঘোর/ঘোর রে ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর/ঐ স্বরাজরথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর। “নজরুল দুু’হাতে লিখেছেন। একদিকে তিনি লিখেছেন ইসলামি গান; আবার অন্যদিকে শ্যামাসংগীত। তার ইসলামী সংগীত, “দিকে দিকে পুণঃ জ্বলিয়া উঠেছে/, দীনইসলামী লাল মশাল”, “বক্ষে আমার কাবার ছবি, চক্ষে মোহাম্মদ রসুল”, “মুসলিম আমার নাম, আহসান আমার কাম,/সত্যের তরে দিতে পারি মোরা হাসিমুখে প্রাণ”, “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই,/যেন গোর থেকে আজানের ধ্বনি শুনতে আমি পাই।” এর পাশাপাশি যখন আমরা শুনি নজরুলের শ্যামাসংগীত “আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে/ জপি আমি শ্যামের নাম,/ ওগো, মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু/ আমার ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম”, “আমি ‘ম’ দেখিতেই দেখি শ্যামা,/ আমি ‘ক’ দেখতেই কালী বলে/নাচি দিয়ে করতালি” তখন অন্য এক নজরুল আমাদের সম্মুখে দেদীপ্যমান। এখানেই নজরুলের কবিতার চমৎকারিত্ব ও অসাধারণত্ব। এজন্যই তিনি বলতে পেরেছেন, “আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে” কবিতায়– “ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে/ চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,/ আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার/ লক্ষ বাগের ফুল হাসে/ আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে!”

নজরুলের কবি জীবনের পরিধি স্বল্পতর। কিন্তু স্বল্পতার সীমাবদ্ধতায়ও তিনি কবিতার ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন, তা আপন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। তাঁর কবিতায় দেশকালঐতিহ্যলগ্নতাএকে করেছে চিরন্তন চিন্তার স্বর্ণখনি। বাঙালির চিন্তাচেতনা দৈনন্দিন জীবন প্রবাহে তাঁর কবিতার ব্যাপকতর প্রভাবের কথা চিন্তা করলে বোঝা যায়, কবিতার ক্ষেত্রে তিনি কতখানি গৌরবদীপ্ত। অন্নদা শংকর রায় ‘নজরুল’ ছড়ায় লিখেন, ‘সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে,/ভাগ হয়নিকো নজরুল।’ অবশ্য এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রচনারীতির দিক দিয়ে আধুনিক কবিতার সবচেয়ে বড় যে দিক মননশীলতা, তাকে নয় ; বরং হৃদয় তথা ভাবাবেগকেই তিনি বেশি প্রধান্য দিয়েছেন। এজন্য তাঁর বিদ্রোহমূলক, এমনকি প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক কবিতায়ও অনেক সময় অসংযম ও অতিকথন লক্ষ করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা পথিকৃৎ এর। বাংলা কবিতার আত্মস্ফুর্তি ও আত্মমুক্তির তিনি অগ্রপথিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলা কবিতায় পালাবদল এবং একজন শামসুর রাহমান
পরবর্তী নিবন্ধমহানগর গণপরিবহন শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের ৭ দফা দাবি আদায়ে কর্মসূচি