পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর কমানো হয়। এতে জুনের শেষার্ধ ও জুলাইয়ে দেশের পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল ছিল। তবে বিরূপ আবহাওয়া, জ্বালানি সংকটে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতায় আগস্টের শুরু থেকেই পাইকারিতে প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। পাইকারিতে দাম বাড়ার প্রভাব দেশব্যাপী খুচরা বাজারেও পড়ছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে ও অগ্রিম কর সর্বোচ্চ ৫ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। অগ্রিম কর নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা একপর্যায়ে ফেরত পান। কিন্তু দেশে বিদ্যমান ব্যবসায়িক চর্চার প্রেক্ষাপটে সেটি বাস্তবে পণ্য বিক্রি হওয়ার পর পরই ফেরত আসে না। বরং ব্যবসায়ীদের প্রদেয় বিভিন্ন শুল্ক–করের সঙ্গে সমন্বয় হয়।
ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রিম করকে (এআইটি) পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে লাভ–লোকসান হিসাব করে। ফলে বাজেটে এআইটি কমানোর কারণে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাশ্রয় হওয়ায় পণ্যের দাম কমার কথা। যদিও সামপ্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বুকিংয়ে দর বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ ও রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সংঘাত তীব্রতর হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে সচল না থাকায় প্রভাব পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি ঘাটতিতে দেশে অনেক পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মাসে পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, নিম্নবিত্ত–মধ্যবিত্তের কাছে এখন বাজারে যাওয়া মানেই আতঙ্ক আর অস্থিরতা। দরিদ্র ও কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্য এমনিতে প্রণোদনা দরকার। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি চরম অমানবিক ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন। কালোবাজারী, মুনাফাখোর, মজুতদার প্রভৃতির কারণে খাদ্যদ্রব্য, চাল, ডাল, তেল, লবণ, মরিচ, চিনি, দুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য দ্রব্যগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন এবং ক্রমে এসব পণ্য সংগ্রহ কঠিনতর হচ্ছে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারের এ দুর্বিসহ অবস্থা দু’একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা থেকে দেশের সব পর্যায়ের ভোক্তা–ক্রেতা শ্রেণির যেন পরিত্রাণ নেই। আয়ের তুলনায় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। কেননা নিত্যপণ্যের মূল্য হরদম বেড়েই চলেছে।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইনের বক্তব্য পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে গমের দাম বেড়েছে এক মাসও হয়নি। দেশে গম আমদানি হতে কয়েক মাস সময় লাগে। এরই মধ্যে দেশের বাজারে গমের পাশাপাশি আটা–ময়দার দাম বেড়ে গেছে। বর্ষাকালীন মৌসুমে শাকসবজির জোগান কমলে ডালজাতীয় খাদ্যের চাহিদা বাড়ে। সরকার বাজেটে খাদ্যপণ্য আমদানিতে সুবিধা দিলে কিছুদিন বাজার স্থিতিশীল ছিল। এখন যুদ্ধ ও চাহিদার বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ চেইন যত দ্রুত ও মসৃণ হবে, বাজারে তত দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় তারা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম সমন্বয় করছেন। তবে ভোক্তারা মনে করছেন, এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করছে।
তাঁরা বলেন, যদি বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকে, তাহলে এ খাতের সিন্ডিকেটগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তাই সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু বাজার তদারকি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন খরচ কমাতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।







