আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

| শুক্রবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারের আজ ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। যে কথা অনেকেই জানেন, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ছিলেন আপাদমস্তক একজন ধর্মপ্রাণ ও মানবিক মানুষ। তাঁর পবিত্র হাতের সৃষ্টি আজকের আলোকিত ও সমাজ পরিবর্তনের আলোক দিশারী ‘দৈনিক আজাদী‘। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। মানবিকতার দিক দিয়ে আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার গরীব ও মেহনতি মানুষের পাশে থেকে তাদের কর্মের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার উৎসাহ যুগিয়েছেন।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী রাউজান এলাকার সুলতানপুর গ্রামে জন্ম মোহাম্মদ আবদুল খালেকের। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই। সেদিন মা–বাবার কোল আলোকিত করে জন্মেছিল যে শিশুটি পরবর্তীকালে সেই চারাগাছটি মহীরূহ হয়ে উঠলো, চট্টগ্রাম অঞ্চল আলোকিত হয়েছিল তার আলোকচ্ছটায়। তাঁর জন্ম এমন একটা বিরুদ্ধ সময়ে, যখন ব্রিটিশ ভারতে এ পশ্চাদপদ চট্টগ্রামকে আগামীর পথে এগিয়ে নিতে আলোকিত মানুষের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ বেলায়েত আলী চৌধুরী এবং মাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা । মোহাম্মদ আবদুল খালেক মা–বাবার মুখ উজ্জ্বল করে গেছেন তাঁর কর্ম দিয়ে।

মোহাম্মদ আবদুল খালেক হলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার, যিনি নিজের উজ্জ্বল পেশা ছেড়ে লাইব্রেরি, প্রেস ও পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজকে শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি‘ কবিতাটি তিনি ছেপেছিলেন অসীম সাহসিকতায়। বায়ান্নের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে শুরু হয়ে যায় কবিতাটি প্রকাশের কার্যক্রম। গভীর রাতে কম্পোজ ও প্রুফের কাজ যখন সমাপ্ত প্রায়, তখন সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী হঠাৎ হামলা শুরু করে প্রেসে। কিন্তু প্রেস কর্মচারীরা অতীব দ্রুততায় সম্পূর্ণ কম্পোজ ম্যাটার এমনভাবে লুকিয়ে ফেলে যে, তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজির পরও পুলিশ তার খোঁজ পায়নি। ফলে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি‘র প্রকাশনার কাজ শেষ করা যায়। পরদিন তেইশে ফেব্রুয়ারি তারিখে লালদিঘির প্রতিবাদ সভায় কবিতাটি পাঠের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। পাক–সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করতে এলে প্রেস ম্যানেজার দবির আহমদ চৌধুরী নিজ কাঁধে ছাপার দায়িত্ব তুলে নেন। তাই গ্রেফতার করা হয় প্রেস ম্যানেজার দবিরকে। অবশ্য পরে তাঁর জামিন দেয়া হয়েছিল। ভাষা ও দেশ মাতৃকার সেবায় নিবেদিত ব্যক্তিত্ব আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার পরবর্তী সময়ে আজাদী প্রকাশে ব্রত হন।

কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসকে ঘিরে আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার লেখার ও লেখকের একটি আলাদা জগত তৈরি করেন। কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে মুদ্রিত ‘কোহিনূর মঞ্জিল‘ থেকে আবদুল খালেক কর্তৃক প্রকাশিত এবং কোহিনূর লাইব্রেরি কর্তৃক পরিবেশিত ১৯৫৭ সালে প্রথম প্রকাশিত তাঁর ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন‘ জীবনী পুস্তকের শেষ পৃষ্ঠায় ১০টি গ্রন্থের পরিচয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র নাথ, শেখ এ চাটগাম কাজেম আলী, চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার দখল ১৯৩০, বার আউলিয়া ও নেপোলিয়ান– এই ৬টি গ্রন্থ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক রচিত। উল্লিখিত ৬টি ছাড়া আরো ১১টি গ্রন্থের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো : প্রাথমিক ভূগোল, বিজ্ঞান ও গ্রাম্য জীবন, রচনার প্রথম ছড়া, উর্দু প্রাইমার, বয়েস ইংলিশ গ্রামার, ফাস্ট বুক অব ট্রান্সলেশন, চাইল্ড পিকচার ওয়ার্ড বুক, ব্যাকরণ মঞ্জুষা, তাওয়াফ (হজ্বের বই), ঝলমল (শিশুপাঠ), মুসলিম বাল্য শিক্ষা এবং সহজ পাঠ (শিশুপাঠ্য)। বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, তিনি আশির অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ সাধনেও আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক আজাদী‘র ভূমিকা অপরিসীম। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দৈনিক আজাদী স্বাধীনভাবে লেখনী চালিয়েছে। এ মহান ব্যক্তিত্ব তাঁর জীবৎকালে দেখিয়ে গেছেন মানবমুক্তি এবং সমাজমুক্তির লক্ষ্যে কাজ করাই সাংবাদিকদের প্রকৃষ্ট পথ। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকতার টেবিলেই অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই চলছে আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে