বাংলাদেশে কিডনি রোগীর চিকিৎসা সংকট ও সরকারি সহায়তার প্রস্তাবনা

মো. দিদারুল আলম | শনিবার , ৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এই মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষের কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে এবং জীবন বাঁচানোর জন্য তাদের নিয়মিত ডায়ালসিস বা কিডনি সংযোজনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসার খরচ এত বেশি যে অধিকাংশ সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না। একটি দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারে যখন কেউ কিডনি রোগে আক্রান্ত হন, তখন সেই পরিবারের পুরো আর্থিক ভিত্তি ধসে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে জমিজমা ও ঘরবাড়ি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যেতে হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কিডনি হলো মানবদেহের প্রাকৃতিক ফিল্টার বা ছাঁকনি। এটি আমাদের রক্ত থেকে ক্ষতিকর ও বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। এছাড়াও শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে কিডনি। কোনো কারণে যদি দুই কিডনি তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন রক্তে ক্ষতিকর বর্জ্য জমা হতে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় কিডনি বিকল হওয়া। কিডনি বিকল হলে কৃত্রিম উপায়ে মেশিন ব্যবহার করে রক্ত পরিষ্কার করতে হয়, যাকে আমরা ডায়ালসিস বলি। ডায়ালসিস হলো এমন একটি চিকিৎসা যা রোগীকে সাময়িকভাবে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার ডায়ালসিস করাতে হয় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বা কিডনি প্রতিস্থাপন না করা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে কিডনি ডায়ালসিস করার খরচ অত্যন্ত চড়া। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব সীমিত সংখ্যক রোগীদের জন্য কম খরচে বা বিনামূল্যে ডায়ালসিসের সুবিধা রয়েছে, কিন্তু রোগীর সংখ্যার তুলনায় সেই ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। বেশিরভাগ রোগীকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যেতে হয়। সেখানে প্রতিবার ডায়ালসিসের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা গুণতে হয়। শুধু ডায়ালসিসের খরচই নয়, এর সাথে যুক্ত হয় নিয়মিত ওষুধ, বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি এবং হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে একজন কিডনি রোগীর চিকিৎসার পেছনে যে টাকা ব্যয় হয়, তা দেশের সিংহভাগ মানুষের মাসিক আয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

এই চরম বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা দেখেছি, সরকার দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা বয়স্ক ভাতার মতো নানা ধরনের কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু করেছে। এই কার্ডগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবা পেয়ে থাকে। ঠিক একইভাবে যদি কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষ কোনো ‘কিডনি সুরক্ষা কার্ড‘ বা ‘চিকিৎসা কার্ড‘ চালু করা যায়, তবে তা দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে।

এই বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে একজন নিবন্ধিত কিডনি রোগী যেন যেকোনো সরকারি বা তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে ডায়ালসিস সুবিধা পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। কার্ডধারী রোগীদের ওষুধ ও রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের সরকারি ভতুর্কি দেওয়া যেতে পারে। যাদের কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন, তাদের জন্য অনুদান ও আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। এতে করে অসচ্ছল পরিবারগুলো চিকিৎসার ব্যয়ের চাপ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে এবং অন্তত টাকার অভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো মানুষকে অকালে প্রাণ হারাতে হবে না।

এর পাশাপাশি আমাদের সমাজে কিডনি রোগ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা দরকার। কিডনি রোগ সাধারণত এক দিনে তৈরি হয় না। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাবার খাওয়া, কম পানি পান করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করার কারণে মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় যদি রোগ শনাক্ত করা যায়, তবে সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়া থামানো বা দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। তাই দেশের সব সরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক কিডনি পরীক্ষার ব্যবস্থা সহজ ও সুলভ করা উচিত।

শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের কাছে কিডনি স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন। বিদ্যালয়গুলোতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পরিমিত পানি পান ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের শিক্ষা দিতে হবে। সরকার যদি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে কিডনি রোগীদের জন্য একটি সার্বজনীন চিকিৎসা সহায়তা নীতি ও কার্ড ব্যবস্থা চালু করে, তবে দেশের হাজার হাজার গরিব ও অসহায় মানুষ নতুন করে বাঁচার আলো দেখতে পাবে। এটি শুধু একটি চিকিৎসা সহায়তা হবে না, বরং লাখ লাখ পরিবারের আর্থিক ও মানসিক সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি হয়ে উঠবে।

লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমেরিকায় রবীন্দ্র সাংস্কৃতিক উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধজাহাজভাঙা ইয়ার্ডে খাণ্ডবদাহন আর কতকাল চলবে