‘Beware. Do not go to extreme in religion. Many nations before you have been destroyed due to excess’. অর্থাৎ ‘সাবধান। তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিও না। এই বাড়াবাড়ির কারণে ইতিপূর্বে বহু ধর্ম ধ্বংস হয়েছে’। ইসলামের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ) আজ থেকে বহু বছর আগে ৬৩২ খ্রীস্টাব্দের ৯ মার্চ শুক্রবার আরাফাতের ময়দানে সমবেত লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উদ্দেশ্য তাঁর খুতবাতুল বিদা বা শেষ ভাষণ বা বিদায় হজ্বের বাণীর এক পর্যায়ে এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি সমবেত মুসলমানদের তাঁর বক্তব্য মনযোগ সহকারে শুনার, সাক্ষী থাকার এবং যারা অনুপস্থিত তাদেরকেও পৌঁছানোর জন্য অনুরোধ করেন।
এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিকের ধর্মকে নিয়ে বাড়াবাড়ির এই একটি ঘটনা আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) এর শিক্ষাকে ধারণ করতে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ব্যর্থ নই চেষ্টাই করিনি। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ দীপু দাসকে গাজীপুরের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা, দীপু ছিল ওখানকার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর সাধারণ একজন নিম্ন স্তরের মাননিয়ন্ত্রণ ম্যানেজার। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই অসহায় দীপুকে উচ্ছৃঙ্খল একদল লোক টেনে হেচঁড়ে পিটিয়ে হত্যা করে। তারা এখানেই থেমে থাকেনি মৃত দীপুকে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়। প্রতিবাদ ত নয়ই বরং সমবেতদের অনেকেই অতিউৎসাহে এ অর্ধমের এ কুর্কমের ভিডিওও ধারণ করেছে। পরে তদন্তে দেখা গেল দীপু চন্দ্র দাশ নির্দোষ।
২০২৪ এর অক্টোবরে অতিউৎসাহী কিছু লোক ধর্মের লেবাসে চট্টগ্রামের জে এম সেন হল’এর পূজা মণ্ডপে গান পরিবেশন করেন। এ প্রসঙ্গে ইসলাম ধর্ম তথা পবিত্র কোরআন মজিদে সুরা কাফিরুন’ এর ৬ নাম্বার আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন’ অর্থাৎ ‘তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম এবং আমার জন্য আমার ধর্ম’। এসব ঘটনা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে আমরা নবী করিম (সঃ) এর আদেশ এবং পবিত্র কোরআনে বর্ণিত পথের বাইরে গিয়ে নাফরমানী করেছি।
এর বাইরেও রাজনৈতিকভাবে নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য যেমন মেটিকুলাস ডিজাইনের মাহফুজ আলম, মেঃ জেঃ ফজলুর রহমান (অবঃ) দের পূর্ব ভারতকে ঘিরে ‘অসম্পূর্ণ মানচিত্র সম্পূর্ণ করতে হবে’ ‘আক্রমণ করে দখল করে নিতে হবে’ ইত্যাদি রাজনৈতিক উস্কানীমূলক বক্তব্যের আলোকে ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর অপপ্রয়াস সচেতন মানুষ উপলব্ধি করেছে।
এই সমস্ত ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক বক্তব্য বিবৃতি বি জে পি (ভারতীয় জনতা পার্টী) নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। এরই সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতি আসাম পশ্চিম বঙ্গে’র সংখ্যালঘু মুসলমানরা নিজেরা দলবদ্ধ হওয়ার গরজ অনুভব করে এবং মূল ধারার রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। ১৭ মে ২০২৬ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় তাদের কলকাতা সংবাদদাতা শুভজিত বাগচী লিখেছেন ‘এই প্রথম দেখা গেল, মুসলমান সমাজ নির্দিষ্ট অঞ্চলে জোট বেঁধে মুসলমান প্রধান দুটি দল ’দক্ষিণ বঙ্গ ইন্ডিয়ান স্যাকুলার ফ্রন্ট এবং উত্তরবঙ্গে আমজনতা উন্নয়ন পার্টীকে ভোট দিয়েছে। চারের দশকে ফজলুল হকের উত্থানের পর এই প্রথম পশ্চিম বঙ্গে মুসলমান জনগো ষ্ঠীর দুই নেতা নওশাদ সিদ্দিকী ও হুমায়ূন কবিরের পেছনে দাঁড়াল মুসলমান সমাজ। ধর্মের ভিত্তিতে এই একই ভোট ভাগ অতীতে সাংঘাতিক সুবিধা আসামে করে দিয়েছে বি জে পি’কে। সেখানে বাঙ্গালী মুসলমানদের ভোট দুই টুকরা হয়ে কংগ্রেস এবং ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টে চলে যাওয়ায় হেরেছে কংগ্রেস জিতেছে বি জে পি’। অন্যদিকে হিন্দুরা সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে অনেকটাই এক হয়ে বি জে পি’র পিছনে কাতার বেঁধেছে। এই সুযোগ বি জে পি’ পুরাপুরি কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের সংখ্যালুঘু মুসলমানদের প্রতিকূল পরিবেশে ঠেলে দিয়ে দুটি রাজ্যেই ক্ষমতারোহন করে।
এরকম এক আবহে উভয় প্রদেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে এক ধরনের হিংসার ক্রম বিস্তারও ঘটেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই ধর্মীয় রাজনৈতিক কূটকৌশলের চালের বলে, যেখানে এক দশক আগেও বি জে পি’র ভোটের হার ছিল মাত্র ১২% তারা সেখানে ২০১৬ সালে আসামে ক্ষমতা দখল করে। আর এবার ৯ এপ্রিল ২০২৬ এ অনুষ্ঠিত ভোটে ১২৬ আসনের ৮২ আসন বি জে পি জয় করে নেয় এবং বি জে পি’র অন্যান্য শরীক দল আরো ২০ আসনে জয়লাভ করে। বর্তমানে আসামে বি জে পি’র ভোটের হার ৩৮% এর উপর।
শপথ গ্রহণের পরপরই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব র্শমা প্রসঙ্গক্রমে ১৯৫১ সালে আসামে মুসলমানদের সংখ্যা কত শতাংশ ছিল আর এখন কত শতাংশে উন্নীত হয়েছে তার হিসাব দেওয়া নেওয়াও শুরু করেন। তিনি রাজ্যের মাদ্রাসা সমূহ বন্ধ করার অভিমতও ব্যক্ত করছেন অবশ্য কায়দা করে আবার মুসলিম ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসার পরিবর্তে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিকের নানা হুমকি সহ্য করা হবে না বলে উল্লেখ করে তিনি হিংসাশ্রিত রাজনীতির ঢালপালা বিস্তারেও মত্ত হয়েছেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন ১৯৪৭ সালে নেহেরুর মত দুর্বল একজন নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকার কারণে ভারত ভাগ হয়েছিল, সে সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মত কেউ থাকলে ভারত ভাগ সম্ভব হত না।
এ প্রেক্ষাপটে বাস্তব সত্য হল মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব র্শমা ইতিহাস থেকে পাঠ গ্রহণ করেননি, ইতিহাসের আলোকে বাস্তবতা হল, ১৯৪৭ এর ভারত বিভক্তির সময়, কেবিনেট মিশন ভারত পাকিস্তানের বাইরে ‘আসাম বেঙ্গল’ তৃতীয় একটি দেশ গঠনের প্রস্তাব করেছিল। কংগ্রেস এ প্রস্তাবে ঘোরতর আপত্তি উত্থাপন করে। বিশেষ করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, বল্লভ ভাই প্যাটেল আসামের গোপিনাথ বড়দুলুই ‘আসাম বেঙ্গল’ রাষ্ট্রের তীব্র বিরোধীতায় ফেটে পড়েন। তারা হিসাব করে দেখান বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেই হিসাবে সংখ্যানুপাতে ‘আসাম বেঙ্গল’ রাষ্ট্র গঠিত হলে এর নির্ধারিত ৬০ সদস্যের আসনে মুসলমানরা ৩৩ আসন এমনিতেই পেয়ে যাবে, তার বাইরে সাধারণ আসনের আরো ৩ টি আসন নিশ্চিত, সব মিলিয়ে ৬০ আসনের ৩৬ আসন মুসলিমদের হাতে যাবে নিশ্চিতভাবে এবং তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসাবে ‘আসাম বেঙ্গল’ এর দণ্ডমুণ্ডের মালিক হবে। এসব বিষয় সামনে এনে গোপিনাথ বড়দুলুই কেবিনেট মিশন ঘোষণার বিরোধীতায় আদাজল খেয়ে নামেন, গান্ধী কেবিনেট মিশন ঘোষণার ব্যাপারে বড়দুলুই এর পক্ষাবলম্বন করলে শেষ পর্যন্ত ‘আসাম বেঙ্গল’ আলাদা রাষ্ট্র আর আলোর মুখ দেখেনি। সে আলোর মুখ না দেখার বেদনা বুকে নিয়ে এই চট্টগ্রামে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর এখনও বিদ্যমান।
ফিরে আসি প্রসঙ্গে। ধর্মীয় সহনশীলতা ব্যতিক্রম শুধু ভারত বিভক্তির সময়, অন্যথায় আমাদের এই উপ–মহাদেশের গৌরবের বিষয়। ভারতীয় লোক সভার বিরোধী দলীয় নেতা শ্রী রাহুল গান্ধীর অতি সাম্প্রতিক বিবৃতিতেও তা অনুরণিত। তিনি উল্লেখ করেছেন ‘৫০টা নয় ৫০০টা নির্বাচনে হারলেও আমি কখনো হিন্দু মুসলিম বিভাজন তৈরী করে দাঙ্গা লাগিয়ে ভোটে জিততে চাই না কারণ ভোটের চেয়ে মানবতা অনেক বড়’। ভারতীয় লোকসভায় তৃণমূলের সদস্য শ্রী কল্যান বন্ধ্যোপাধ্যায় তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন ‘ভারতে মুসলমানদের ৬০০ বছরের ইতিহাসে কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি’।
চলুন ইতিহাসে চোখ ফিরাই, ১১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩ শিকাগোর “বিশ্ব ধর্মীয় পার্লামেন্ট” এর সভায় স্বামী বিবেকানন্দ তার বক্তব্যে কি বলেছিলেন। এই বক্তব্যই পরর্বতীতে তাকে বিশ্ব খ্যাতি এনে দেয়। সেই বক্তব্যের এক পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দ যুগ যুগের লক্ষ মানুষের মুখে স্তবগীত হওয়া এবং তারও স্মরণাতীত থেকে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্ত্তুতি হিসেবে গানের বাণী তুলে ধরেন– ‘As the different streams having their sources in different paths which men take through different tendencies, various they appear, crooked or straight all lead to Thee’. নানা উৎস, নানা মত, নানা পথ, সরল অথবা জটিল, মানুষ বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত, নিবেদিত, অবশেষে সব ত তোমার কাছেই সমর্পিত’।
সেই বক্তব্যে স্বামী বিবেকানন্দ ভগবত গীতা থেকেও উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘Whosoever comes to me, through whatsoever form, I reach him, all men are struggling through paths which in the end lead to me. Sectarianism, bigotry, and its horrible descendant, fanaticism, have long possessed this beautiful earth. They have filled the earth with violence, drenched often and often with human blood, destroyed civilization and sent whole nations to despair. Had it not been for these horrible demons, human society would be far more advanced than it is now ’. এ দীর্ঘ উদ্ধৃতির সারর্মম হল ‘তুমি যেভাবে যে পথেই আমার কাছে আসনা কেন আমি সাড়া দিই। এই অপরূপ পৃথিবীকে মানুষের বিভক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ বহুকাল ধরে গ্রাস করে আছে। এ থেকে উৎসারিত হয়েছে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, হানাহানি রক্তপাত যা সভ্যতা এমনকি কোন কোন জাতিসত্তার ধ্বংসও ডেকে এনেছে। এ বীভৎস বর্বরতা যদি না ঘটত তবে পৃথিবীর মানব সভ্যতা বর্তমানের চেয়ে আরো বেশি অগ্রসরমান আরো বেশি উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছাত’।
এই উপ–মহাদেশের ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে তুলে ধরার জন্য রোমানদের দ্বারা নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং বিতাড়িত ইহুদিদের উত্তর পূর্ব ভারতে আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টিও স্বামী বিবেকানন্দ ঐ সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন। অথচ আজ সেই উত্তর পূর্ব ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুরে সময়ে সময়ে মনুষ্য সৃষ্ট জাতের নামে বজ্জাতিতে অসহায় মানুষ নিষ্পেষিত হয়।
When I do good, I feel good. When I do bad, I feel bad. And that is my religion. এটি আব্রাহাম লিংকনের কথা, মর্মার্থ হল আমি খারাপ কিছু করলে খারাপ অনুভব করি, আর ভালো কিছু করলে ভালো অনুভব করি। এটিই আমার ধর্ম। এই মহৎ অনুভূতির আলোকে আমার প্রিয় একজন মনীষী হেলেন কেলারের একটি অপূর্ব বক্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি It is wonderful how much time good people spend fighting the devil. If they would only expend the same amount of energy loving their fellow men the devil would die in his own tracks of annul. অর্থাৎ “এটি আশ্চর্য্যজনক, ভাল মানুষেরা যে পরিমান সময় নষ্টামির বিরুদ্ধে, শয়তানকে মোকাবিলায় কাটায় তার সম পরিমাণ শক্তি তারা যদি তাদের আশেপাশের মানুষদের ভালবেসে কাটাত তবে শয়তান তার আঁতুর ঘরে এমনিই মারা যেত”। (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












