চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম, সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন। একই সঙ্গে বন্দর এলাকায় পানি প্রবেশে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে গতকাল রোববার পাঠানো এক যৌথ আবেদনে এসব দাবি জানানো হয়। আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং দি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
আবেদনে বলা হয়, চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে বন্দরে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। আমদানিকৃত তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক, প্যাকেজিং সামগ্রী, খাদ্যপণ্যসহ আর্দ্রতা সংবেদনশীল বিভিন্ন পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও কৃষিপণ্যসহ রপ্তানিযোগ্য পণ্যের শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাতিল, মূল্যছাড়, বিলম্বজনিত জরিমানা এবং ব্যয়বহুল বিমানপথে রপ্তানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বৃষ্টির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং বেসরকারি কন্টেনার ডিপোতে পানি প্রবেশ করে পণ্যভর্তি কন্টেনারের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি অস্বীকার এবং এ বিষয়ে দায় ও জবাবদিহি গ্রহণ না করার অবস্থান জানায়। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এ ধরনের একতরফা অবস্থান ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে যদি পণ্যের ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, দীর্ঘ সময় কন্টেনার ও পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, স্টোরেজ, শেড ও ইয়ার্ড চার্জ বহন করতে হচ্ছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন, নগদ অর্থপ্রবাহ, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ, ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক দায়দায়িত্ব পালনে গুরুতর চাপ তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আবেদনে অতীতের মতো ঋণ পরিশোধের সময় বৃদ্ধি এবং জরিমানা সুদ মওকুফের মতো সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক–রেল যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে সচল করা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন, ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, স্টোরেজ ও সংশ্লিষ্ট চার্জ আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ, কাঁচামাল ও জরুরি পণ্যের জন্য ফাস্ট ট্র্যাক কাস্টমস সেবা চালু, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্পসুদের পুনঃঅর্থায়ন ও কার্যকরী মূলধন ঋণ, ঋণ পরিশোধে সময় বৃদ্ধি ও পুনঃতফসিলের সুযোগ, এলসি ও রপ্তানি সংক্রান্ত সময়সীমা বাড়ানো, ইউটিলিটি বিল ও কর পরিশোধে সময় বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল গঠন। এছাড়া একটি উচ্চ পর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে টেকসই ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, কন্টেনার ইয়ার্ডের উচ্চতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কোল্ড–চেইন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্যোগ–সহনশীল সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ন্যাশনাল ট্রেড কন্টিনিউটি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নেরও সুপারিশ করা হয়েছে।











