টানা ছয় দিনের ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং উত্তাল সাগরের প্রভাবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজ থেকে খোলা পণ্য নামানো অনেকটা কমে গেছে। কমে গেছে কন্টেনার হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারি কার্যক্রমও। বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। এতে করে নানা ধরনের পণ্য বোঝাই ৬০টির বেশি মাদার ভ্যাসেল সাগরে অলস ভাসছে। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল অনেকটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে পণ্য পরিবহনও থমকে গেছে। কাজ না থাকায় চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজ কর্ণফুলী নদী এবং উপকূলে অপেক্ষমাণ। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, সার, ক্লিংকারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর সূত্র জানায়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত কয়েকদিনে কন্টেনার হ্যান্ডলিং স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারেনি। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১১ হাজার টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়, সেখানে ৭ জুলাই হয়েছে ৪ হাজার ৭৯৭ টিইইউএস, ৮ জুলাই ৫ হাজার ২৩০, ৯ জুলাই ৬ হাজার ৪১৪ এবং ১০ জুলাই ৭ হাজার ১৪৬ টিইইউএস। বৃষ্টির মাঝে ইকুইপমেন্ট মুভমেন্ট ঠিকভাবে করতে না পারায় কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে জলাবদ্ধতা এবং যানজটের কারণে বিভিন্ন ডিপো থেকে বন্দরে কিংবা বন্দর থেকে ডিপোতে কন্টেনার আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রেও সংকট বিরাজ করছে। ফলে কন্টেনার ডেলিভারি কমে গেছে। ৮ জুলাই ২ হাজার ৬০৬ টিইইউএস, ৯ জুলাই ২ হাজার ৮২০ এবং ১০ জুলাই ৩ হাজার ৪৫২ টিইইউএস কন্টেনার ডেলিভারি হয়েছে।
কন্টেনার হ্যান্ডলিং বা ডেলিভারি একটি পর্যায়ে থাকলেও বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থে নোঙর করা জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে পুরোদমে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টি বন্ধ হলে কিছুক্ষণ কাজ হয়, বৃষ্টি শুরু হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা নেই।
এদিকে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ৬০টির বেশি জাহাজ পণ্য নিয়ে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করলেও পণ্য হ্যান্ডলিং করতে পারছে না। বৃষ্টির পাশাপাশি সাগর উত্তাল থাকায় লাইটারেজ জাহাজগুলো পণ্য নেওয়ার জন্য মাদার ভ্যাসেলের কাছে ভিড়তে পারছে না। তাছাড়া মোহনা পার হয়ে সাগর পাড়ি দেওয়াও লাইটারেজ জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে করে লাইটারেজ জাহাজগুলো সাগরে যাচ্ছে না। চারশর বেশি লাইটারেজ কর্ণফুলী নদী এবং উপকূলে নোঙর করে আছে।
বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, উত্তাল সাগরের কারণে বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে ৬০টির বেশি জাহাজ অপেক্ষা করছে। প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার ডিমারেজ গুণতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ায় এই ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া অফশোর কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪–৫ হাজার শ্রমিকও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ছয় দিন ধরে মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে কোনো পণ্য স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নৌপথে পণ্য পরিবহনও শুরু করা যাবে না। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের ৭০ শতাংশের বেশি নৌপথে হয়। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৩০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম থেকে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে।
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্পেও। বিজিএমইএর একটি সূত্র জানিয়েছে, নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক কারখানায় যেতে পারেননি। ফলে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কমাতে হয়েছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়েছে। হারানো উৎপাদন পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত শিফটে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বন্দরে আমদানিকৃত কাঁচামাল ছাড়ে বিলম্ব হলে উৎপাদন আরো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরদিকে কয়েকটি বেসরকারি কন্টেনার ডিপোতে জলাবদ্ধতার কারণে আমদানিকৃত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বন্দরের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি জমে ছিল। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়নি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, আধুনিক বন্দরে দ্রুত পানি অপসারণের বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে শুধু বন্দরের ভেতরে নয়, চার থেকে পাঁচটি বেসরকারি কন্টেনার ডিপোতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোগত ঘাটতির জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষেরও দায় রয়েছে। বন্দর স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালালেও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনেক আমদানিকারকই পণ্য ডেলিভারি নিচ্ছেন না।
তবে ক্ষতিপূরণের দাবির বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষের জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতিকে ‘অ্যাক্ট অব গড’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ‘রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কন্টেনার), ২০০১’–এর ১৯৯(১৪) ধারা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ অনুযায়ী এ ধরনের ক্ষতির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয়।
ইয়ার্ডে কন্টেনারে পানি ঢোকা বা পণ্য নষ্টের ব্যাপারে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই।












