কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিদ্রোহীর কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এই দুয়ের সম্মিলন ছাড়া বাঙালি অসম্পূর্ণ। বাংলার সাহিত্যাকাশে একটাই সূর্য রবিঠাকুর আর একটাই চন্দ্র কবি নজরুল। এই দুজন ছাড়া বাংলার সাহিত্যাকাশের অন্য সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র জ্যোতিষ্ক সবটাই নিষ্প্রভ, ম্রিয়মাণ।
কবিগুরু ছিলেন জমিদার বংশের সন্তান। কিন্তু তাঁর যৌবন বয়সে উপনীত হওয়ার আগে থেকেই এই জমিদারী প্রথা জৌলুস হারাতে হারাতে প্রায় নিঃস্ব হতে থাকে। কবিগুরুকে তাঁর সহধর্মিণীর গয়না বিক্রি করে শান্তিনিকেতনের খরচ বহন করতে হয়েছিল।
অন্যদিকে আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা দুখু মিয়া ছিলেন আজীবনই দুখী। তাঁর মতো করে কষ্টের সাথে দিনযাপনের ইতিহাস খুব কম কবিরই আছে। জন্ম থেকেই দুঃখ অভাব–অনটন তাঁর সঙ্গী। জীবনের রুটিরুজি যোগাড় করতে তিনি কি না করেছেন!
বাঙালির প্রেম বিরহ আনন্দ বেদনায় ছায়া খুঁজতে যায় রবিঠাকুরের কাছে। আর রাগে ক্ষোভে বিদ্রোহে ছুটে যায় নজরুলের কাছে। কবি রবি যদি শিখিয়ে থাকেন ক্ষমা, ঔদার্য, সহমর্মিতা সেখানে নজরুল শেখান স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা, অধিকারবোধ, শৌর্য, পৌরুষ, স্বকীয়তা। নজরুলের প্রেম বিরহ আর রবিঠাকুরের প্রেম বিরহের মধ্যে অনেক অনেক ফারাক।
রবিঠাকুর বলছেন, ‘প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো দোঁহারে, বাঁধন খুলে দাও,’ কিংবা ‘আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন তোমাতে করিব বাস, দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরষ মাস’
আর নজরুল বলছেন, ‘তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল‘ কিংবা ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দিব না ভুলিতে’, ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়, ফিরে আয়।’ প্রেমের চেয়েও বিরহে কবি নজরুল যেন চির ভাস্বর, চির উজ্জ্বল!
কবি নজরুলের ‘কারার ওই লৌহ কপাট, এই শিকল পরা ছল, চল চল চল, মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানগুলো শুনে ভেতরের রক্ত টগবগ করে ওঠে না, দেশের জন্য টান অনুভব করে না এমন বাঙালি আদৌ আছে কিনা সন্দেহ!
আবার, যদি আধ্যাত্মিক প্রেমের কথা ধরি, তবে সেক্ষেত্রে আমার কাছে নজরুল শ্রেষ্ঠ। যিনি লিখেছেন, ‘ওরে ও মদিনা বলতে পারিস কোন পথে তোর, খেলতো ধুলা–বালি নিয়ে মা ফাতিমা’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, আবার তিনিই গাইছেন, ‘আমি শুধাই ব্রজের ঘরে ঘরে কৃষ্ণ কোথায় বল, ওরে কেউ কহেনা কথা হেরি সবার চোখে জল’, ‘আমার শ্যামা মায়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।’ আধুনিক যুগের কৃষ্ণ কীর্তনগুলো সব কবি নজরুলের লেখা। প্রতিটা কৃষ্ণ ভজন এত গভীরতা দিয়ে সৃষ্টি, চোখ বন্ধ করে অনুভব করে শুনলেই চোখে জল চলে আসে। রামপ্রসাদী গান ছাড়া ঈশ্বরের সাথে এমন একাত্মতা আর কোন গানে এমন করে পাওয়া যায় না।
রবিঠাকুরের আধ্যাত্মিক প্রেম আমাদের শেখায় আত্মসমর্পণ। আর নজরুলের আধ্যাত্মিক প্রেম আমাদের শেখায় আবাহন, স্রষ্টাকে কাছে পাওয়ার আকুতি।
নজরুলের আরবি, ফার্সি, বাংলা ভাষার দখল ছিলো অসাধারণ। দুই ভাষার সংমিশ্রণে ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন, দিল্ ওহি মেরা ফাঁস গেয়্যি’ এর মত অসাধারণ গান বাংলা সাহিত্যে আর একটা আছে কিনা আমার জানা নেই!
কবির সন্তান বিয়োগের যন্ত্রণাটা কী নিদারুণ ছিলো তা বলার বাইরে। বুলবুলের লাশের দাফন কাফনের টাকা যোগাড় করতে তিনি এক কলমের খোঁচায় লিখলেন, ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’ সেই গানের টাকা এনে বুলবুলের লাশ দাফন হয়। এর চেয়ে মর্মান্তিক বেদনা মানুষের জীবনে আর কি হতে পারে! ঈশ্বরকে আমার মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুর মনে হয়। তিনি নজরুলের থেকে এক এক করে তাঁর সব ক‘টা প্রিয় জিনিস কেড়ে নিয়েছেন। শেষমেশ বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তিটাও কেড়ে নিলেন!
কবি নজরুল নিজের স্বকীয়তাকে প্রকাশ করেছেন এই বলে,
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,
আর হাতে রণতূর্য!’
বাঙালি নজরুলের অগ্নিবীণায় সুর তুলে গীতবিতানের সুর সাধে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আর কবি নজরুল বাঙালির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা সাহিত্যে কারো অবদান কোন অংশে কম নয়। রবি–নজরুলের বিভেদ করে অজ্ঞরা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম দুজন কবিই স্বীয় স্বকীয়তা ও মহিমায় মহিমান্বিত। এদেরকে ছোট–বড়, হিন্দু – মুসলিম দিয়ে বিভেদ করা যায় না। তাঁদের আসন এতটা উচ্চতায় যে, এই তুচ্ছতা তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। বাঙালির সৌভাগ্য যে এই দুজন শ্রেষ্ঠ মানুষ বাংলাতেই জন্ম নিয়েছেন। নইলে বাঙালির ঐতিহ্য এবং অহংবোধ বলতে কিছু থাকতো না। তাঁরা ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে, প্রেম দিয়ে, উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করে রেখেছেন আজো। নতুন কবি, সাহিত্যিক সৃষ্টির অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন সেই থেকে অদ্যাবধি। যাঁরা এঁদের মধ্যে বিভেদ করতে চায় তারা মূলতঃ বাংলার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চায়। বাঙালির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। যা কখনোই কাম্য নয়।
কবি নজরুলের ভাষাতেই বলি,
‘সব মালিন্য দূর হয়ে যাক মানুষের মন হতে
তাহার আলোক প্রতিভাত হোক
এই ঘরে ঘরে পথে পথে।’
জন্ম দিনে প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রণতি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।












