ইসলামের ইতিহাসে দারুল আরকাম একটি প্রসিদ্ধ বরকতময় নাম। ইসলামের শুরুর দিকে মহান সাহাবা আরকাম ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আরকাম (র.)’র বাড়িটি হল পবিত্র কাবার দক্ষিণ পূর্ব দিকে সাফা পাহাড়ের সংলগ্ন অনেকটা দৃষ্টির আড়ালে পড়ে। আল্লাহর রসূল (স.)’র জন্মস্থান পবিত্র কাবার ৩/৪ শ’মিটার পূর্ব দিকে। নবুওয়াত লাভ করার সাথে সাথে আল্লাহর রসূল (স.) অতি গোপনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। এতে মহিলা জগতে উম্মে খাতুন মোমেনীন হযরত খাদিজাতুল খোবরা, শিশু তথা বালকের মধ্যে হযরত আলী (ক.) সাধারণ পুরুষের মধ্যে হযরত আবু বকর (র.) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর হযরত আরকাম (র.) অন্যতম একজন। আল্লাহর রসূল (স.) নিজ বাড়ি থেকে এসে হযরত আরকাম (র.)’র বাড়িতে অবস্থান নিয়ে গোপনে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। যেহেতু এই বাড়িটি হয়ত বা পাহাড়ের গোহায় সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে। এই ঘরে আল্লাহর রসূল (স.) বসে বসে গোপনে ইসলাম প্রচার এবং ইসলাম গ্রহণকারীগণকে শিক্ষা দান করতেন।
মূলত সাফা পাহাড়টি আমাদের দেশীয় ভাষায় টিলা বলে। ইহা সুউচ্চ পর্বত সাদৃশ্য জবলে আবু কুবাইস এর উত্তর–পশ্চিম দিকে এই টিলা তথা বরকতময় সাফা পাহাড়। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগেও এই জবলে আবু কুবাইসের চতুর্দিকে শত শত বাড়ি ঘর ছিল। তারা অনেকটা বিদেশ থেকে আগত বলা যাবে। তৎমধ্যে আমাদের এই অঞ্চলের আরাকান এবং আফ্রিকা অঞ্চল থেকেও অবগত বলতে পারি। জবলে আবু কুবাইস এর একদম শীর্ষে ৪০/৫০ জন নামাজ পড়তে পারে মত একটি মসজিদ ছিল। এই মসজিদকে মসজিদের বেলাল বলে। জবলে আবু কুবাইস কেন্দ্রিক রয়েছে একাধিক বরকতময় ইতিহাস। তথা–হযরত নূহ (আ.)’র প্লাবনের সময় হাজরে আসওয়াদ এখানে রক্ষিত থাকা; আল্লাহর রসূল (স.) কর্তৃক চাঁদকে দি–খিন্ডিত করাসহ একাধিক বরকতময় ইতিহাস।
১৯৭০ এর দশকে হজে গমন করলে এই জবলে আবু কুবাইস পর্বত শীর্ষে সকালে বা আছরের পর একাধিক বার উঠবার সুযোগ হয়।
আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগে এই পর্বত থেকে বসতি সরিয়ে পর্বতকে কেটে অনেক নিচু করে এখানে ৫/৭ টি রাজকীয় প্যালেস নির্মাণ করে সৌদি সরকার।
দারে আরকাম ইসলামের সূচনালগ্নে আল্লাহর রসূল (স.) কর্তৃক ইসলামে প্রচার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। হযরত আরকাম (র.) আল্লাহর রসূলের প্রতি সাথে সাথে ইসলামের প্রতি এত বেশি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন যে, তিনি তাঁর নিজের ঘরকে অতীব খোলামনে আল্লাহর রসূল (স.) কে ব্যবহার করতে দিতে অতীব উৎসাহিত ছিলেন যা স্মরণীয়।
মতান্তরে প্রথম ৩ বছর আল্লাহর রসূল (স.) এই দারে আরকাম ব্যবহার করেন। মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৪০ জন পার হলে সাথে হযরত ওমর (র.) ইসলাম গ্রহণ করলে পরবর্তীতে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। হযরত আরকামের পুরো নাম আল–আরকাম ইবনে আবি আল–আরকাম। তিনি বনু মাখজুম শক্তিশালী গোত্রের সন্তান। তিনি মাত্র ১৬/১৭ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করে বলে জানা যায়। এক বর্ণনায় তিনি সপ্তম ব্যক্তি হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আরকাম (র.)’র বনু মাখজুম ছিল ইসলামের কঠোর বিরোধী গোত্র। তারপরও এই সাহসী যুবক হযরত আরকাম (র.) ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আরকাম (র.) এর নিজ বাড়ি ব্যবহার করতে দিয়ে ইসলামের সূচনালগ্নে যে অবদান রেখেছেন তার জন্য অনেক ঐতিহাসিক অন্যতম অবদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বস্ত ও নিবেদিত এই মহান সাহাবী ইসলামের প্রারম্ভেই ঈমান আনার সাথে সাথে নিজের সম্পদ ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেন।
আরকাম যখন ঈমান আনেন তখন তাঁর পিতা তথা আবুল আরকান বেঈমান ছিল। (আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
আরকাম যখন ঈমান আনেন তখন মুসলমানগণের সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল ৩৮ জন।
ইবনে হাজার উল্লেখ করেন যে, হযরত আরকাম প্রথম ১০ জনের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। আরকাম ইবনে আবুল আরকাম হলেও তাঁর পূর্ণ নাম আবদে মানাফ ইবনে আসাদ। প্রথম দিকে তাঁর বাড়িতে আল্লাহর রসূল সংগোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন। (সীরত বিশ্বকোষ)
পরবর্তী জীবনে তিনি পবিত্র মদিনা হিযরত করেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অংশগ্রহণ করেন। যদিওবা তিনি আলোচিত সাহাবীগণের মধ্যে অন্তর্ভুর্ক্ত দেখা যায় না। তেমনিভাবে যুদ্ধবীর হিসেবে পরিচিত নন। কিন্তু তার অবদান ছিল কৌশলগত ইসলামের ভিত্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহসী অবদান। তিনি ছিলেন তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। তার বাড়ি দান করা ছিল একটি বড় ত্যাগ। যা ইসলামের প্রারম্ভে আল্লাহর রসূল (স.)’র জন্য অতীব প্রয়োজন ছিল।
ইসলামের ইতিহাসে এও উল্লেখ দেখা যায়, ইসলাম প্রচারের জন্য অকফ বা দান করে দেন। এই মহান সাহাবা আনুমানিক ৫৫ হিজরীতে পবিত্র মদিনায় ইন্তেকাল করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
ওমাইয়া আব্বাসীয় ফাতেমী আমলে জবলে আবু কুবাইস ও পরবর্তীতে অতঃপর তুর্কি আমলেও জবলে আবু কুবাইস ও সাফা পাহাড়ের অবকাঠামো অবিকল ছিল বলা চলে।
তুর্কি আমলের শেষের দিকে পরবর্তী সৌদি আমল থেকে মসজিদুল হারমের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রয়োজনে জবলে আবু কুবাইস হুবহু থাকলেও সাফা পাহাড় ও আশেপাশের এরিয়ায় ন্যূনতম হলেও পরিবর্তন হয়ে আসছে।
১৯৭৫ সালে আমার জীবনে প্রথম হজ করার সৌভাগ্য হয়। ঐ সময় বাদশাহ ফাহাদ কর্তৃক মসজিদুল হারমের পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণ ছিল না। মসজিদুল হারমের চতুরর্দিকে ছোট ছোট গাড়ি, টেক্সী, কার, মাইক্রো মিনি ট্রাক চলাচল করত। তেমনিভাবে জবলে আবু কুবাইস পর্বত থেকে সাফা পর্বতকে পৃথক করা হয়। উভয় পর্বত পাহাড়ের মধ্যখান দিয়ে যাতায়াত ছিল। সাথে সাথে ছোট ছোট গাড়িও চলাচল করত।
১৯৭০ এর দশকেও হজযাত্রীর সংখ্যা হয়ত ৫/৭ লাখ হবে। বিদেশ থেকে ওমরাহকারী তেমন ছিল না বললেই চলে। ফলে হজ সিজন বাদে মসজিদুল হারম কেন্দ্রিক পবিত্র মক্কায় বিদেশীদের আনাগোনা তেমন ছিল না।
১৯৭৫ সালে দারুল আরকামের অস্তিত্ব কোথায় কোন দিকে ছিল তা আমার পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব হয়নি। মূল মসজিদুল হারম তুর্কি আমলের পর সউদ ও ফয়সালের আমলে তিনতলা বিশিষ্ট পুনঃ নির্মাণ করে। বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলে এই মসজিদুল হারমকে ৩ বছর মেয়াদী তিনভাগ করে ভেঙ্গে পুনঃ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য বাদশাহ আবদুল্লাহর আগে বাদশাহ ফাহাদের আমলকে সৌদি আরবের স্বর্ণযুগ বলা হয়। বিশেষ করে ১৯৮৫ সালে মসজিদে নববী ৮/১০ গুণ বড় করে দৃষ্টিনন্দন সম্প্রসারণ এবং সাথে সাথে পবিত্র মদিনা শহরকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেন। ১৯৮৮ সালে মসজিদুল হারম পশ্চিম দিকে দুই মিনারসহ বিশালভাবে সম্প্রসারণ করেন।
বাদশাহ ফাহাদ পরবর্তী বাদশাহ আবদুল্লাহর আমল থেকে মসজিদুল হারমের অবকাঠামো এবং সিস্টেমসহ যাবতীয় কিছুতে অনেক পরিবর্তন আনা হয়। গাড়ি চলাচল আন্ডারগ্রাউন্ড বা অনেক দূরে সরিয়ে নেয়া হয় হজ ও ওমরাহকারীর কল্যাণে। বর্তমানকালে যারা হজ বা ওমরাহ করতে যান তারা জবলে আবু কুবাইস তথা বর্তমান ৫/৭টি রাজকীয় প্যালেসের নিরাপত্তা দেওয়ালের বাহিরে বরকতময় সাফা পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে শুধু হেঁটে যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অতএব এই দার আরকাম ইসলামের ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘর তথা স্থাপনাটি আজও ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষী দেয়। বাস্তবতায় নেই বলা যাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।













