ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ শেরে বাংলা

এ.কে.এম. আবু বকর চৌধুরী | মঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক হতে এই উপমহাদেশকে পরাধীনতার (২৩ জুন ১৭৫৭ ১৪ আগস্ট ১৯৪৭) শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে অন্যান্য অঞ্চলের নেতাদের মত অবিভক্ত বাংলায যারা জাতীয় পর্যায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নবাব সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেন, বাংলার বাঘ শ্রী আশুতোষ মুখার্জী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, গণতন্ত্রের মানস পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম খান, বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাসে একমাত্র অন্ধ রাজনীতিবিদ আবুল হাশিম, শরৎ চন্দ্র বসু প্রমুখের নাম ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। এঁরা বাঙালি জাতির এক একটি হীরকখণ্ড।

আজ শেরে বাংলা আবু কাসেম ফজলুল হকএর ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৭৩’র ২৬শে অক্টোবর বরিশাল জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯০ সালের বরিশাল জেলা স্কুল হতে বিভাগীয় বৃত্তি সহ এন্ট্রাস পাশ করে প্রেসিডেন্সী কলেজ হতে স্নাতকে গণিত শাস্ত্র, পদার্থ বিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজী সাহিত্য ও অংক শাস্ত্রে কৃতিত্বের সাথে এম.. ও ১৮৯৭ সালে ডিস্ট্রিংশন সহ আইন ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন যেমন বৈচিত্রপূর্ণ তেমনি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন ও বিচিত্রতম ছিল। ১৮৯৭ সালে প্রথমে বিয়ে করেন নবাব সৈয়দ মুহাম্মদ আলী কন্যা খরশীদ তালাত বেগমকে। এই বিয়ে বেশীদিন টিকে নাই। এই ঘরে দু’টি কন্যা সন্তান ছিল। দ্বিতীয় বিয়ে করেন হুগলী জেলার সাতপুরা নিবাসী সৈয়দ ইবনে আহমদের কন্যা বেগম জিনাতুন নেছাকে। তিনিও নিঃসন্তান হওয়াতে ৬৭ বছর বয়সে শেষবারের মত বিয়ে করেন মারাঠী মহিলা মোছাম্মৎ খাদিজা বেগমকে। এই মহিলার গর্ভেই জন্ম নেন ১৯৪৪ সালে শেরে বাংলার একমাত্র অধ্যাপক ও কবি পুত্র এ.কে.ফজজুল হক। ১৯৬২র ২৭ এপ্রিল শুক্রবার ৮৮ বছর বয়সে বাংলার অন্যতম মহানায়ক বাংলার মুকুটবিহীন সম্রাট একে ফজলুল হক ইন্তেকাল করেন। সেদিন সারা বাংলার মানুষ অঝোরে কেঁদেছিল।

বৈচিত্রপূর্ণ শতাব্দীর রাজনৈতিক জীবনে শেরে বাংলা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পদে আসীন ছিলেন। ১৯০৬ সালে ৩০ শে ডিসেম্বর ঢাকার নবাব বাড়ীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির তিনি ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯১৭১৮), নিখিল ভারত কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (১৯১৮), বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি (১৯১৬১৭ ও ১৯৩৮৪১) ও সাধারণ সম্পাদক (১৯১৩১৫) কৃষক প্রজা পার্টি (কৃষক শ্রমিক পার্টি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯২৭৪৭ ও ১৯৫৩৫৬ইং ছিলেন)। ১৯১৬ সালে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রচেষ্টায় ঐতিহাসিক “লখনৌ চুক্তি” সম্পাদনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ভোট যুদ্ধে ও তিনি ছিলেন অপরাজেয় ভোটযোদ্ধা। ১৯০১ সালে বরিশাল পৌরসভা ও ১৯০২ সালে জেলা বোর্ডের নির্বাচনের বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভের মাধ্যমে তাঁর ভোট যুদ্ধে জয়ের সূচনা হয়। সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কাউন্সিলে ঢাকা বিভাগীয় এক উপনির্বাচনে রায় বাহাদুর মহেন্দ্র কুমার নাথ মিত্রকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে অবিভক্ত বাংলা ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ (১৯১৩৫৮), বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ (১৯৩৫৪৬), সাবেক পাকিস্তান গণ পরিষদদ্বয় (১৯৪৬৫৪ ও ৫৫৫৬) এবং সাবেক পাকিস্তানের প্রথম সাংসদের (১৯৫৬৫৮) সদস্য ছিলেন। ১৯২২ সালে প্রাদেশিক আইন পরিষদে ও ১৯৩৫৪৬ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং মুসলিম লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ১৯৩৭ সালে ২টি (একটিতে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করেন) ও ১৯৪৬ ও ২টি আসনে বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেন। সংসদীয় ইতিহাসে অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী সদস্য থাকার দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন।

১৯৩৪ ও ১৯৩৫ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়রও নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক জীবনের প্রথম মন্ত্রী হন ১৯২৪’র ১লা জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে এবং সর্বশেষ মন্ত্রী হন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসাবে (আগস্ট ’৫৫ মার্চ ’৫৬। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ছিলেন (মার্চ ’৫৬ এপ্রিল ’৫৮)। তিনি অবিভক্ত বাংলার ১ম ও ২য় (এপ্রিল ১৯৩৭ ১লা ডিসেম্বর ১৯৪১ ও ১০ই ডিসেম্বর ১৯৪১ ২ শে মার্চ, ১৯৪৩) প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় (২রা এপ্রিল ৩০ শে মে, ১৯৫৪) মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর তিনিটি মন্ত্রী সভাই ছিল কোয়ালিশন সরকার। শেরে বাংলার প্রথম মন্ত্রীসভায় (এপ্রিল ’৩৭ ১ ডিসেম্বর ’৪১) সর্বজনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন, নবাব হাবীবুল্লাহ বাছার, নলিনী রঞ্জন সরকার, দ্বিতীয় মন্ত্রীসভায় শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ও সর্বশেষ মন্ত্রীসভায় (এপ্রিল মে ’৫৪) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, আবু হেসেন সরকার আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ নেতৃবর্গ ছিলেন।

১৯৩০’র ১২ই নভেম্বর ও ১৯৩১’র ৭ই নভেম্বর লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক সমাধান সংক্রান্ত গোল টেবিল বৈঠকে বাঙালি মুসলিম নেতাদের মধ্যে একমাত্র ফজলুল হকই উপস্থিত ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি একজন মনেপ্রাণে বাঙালি ছিলেন এবং বিংশ শতাব্দীর ষাট দশক পর্যন্ত তিনি একটি ইতিহাস। বাঙালির উপর অবাঙালির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তিনি বার বার বিদ্রোহী করেছেন। ফলে মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হয়েও তাঁকে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪১’র ১০ই ডিসেম্বর দল হতে বহিষ্কার করতে দ্বিধাবোধ করেননি, অথচ ১৯৪০’র ২৩ শে মার্চ লাহোরের লীগ ও অধিবেশনে তথাকথিত দ্বিধাজতিতত্ত্ব ভিত্তিক পাকিস্তান প্রস্তাব শেরে বাংলায় উত্থাপন করেছিলেন। নেতৃত্বের সংঘাত তাঁকে তখন “বিশ্বাসঘাতক” আখ্যাও দেয়া হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর পদ হতে পদচ্যুত করে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব মুহাম্মদ আলী বগুড়া (১৯৫৩৫৫) পুনঃ তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” আখ্যাদিতে এতটুকু দ্বিধা ও লজ্জাবোধ করেননি। এই সিংহ পুরুষ ইংরেজ কর্মচারীদেরকেও তোয়াজ করতে না।

তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মুসলিম লীগ, কংগ্রেস ও কৃষক শ্রমিক পার্টি তাঁর অতুলনীয় নেতৃত্ব লাভে ধন্য হয়েছিল। এই সব দলের প্রসার ও জনপ্রিয়তার মূলে ছিলে তার বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব জনপ্রিয়তা। রাজনৈতিক দর্শনই ছিল বাঙালি কৃষকদের ডাল ভাতের ব্যবস্থা করা। তিনি নিজেই বলতেন “বাংলার সাধারণ মানুষকে ভালবেসেছি এই ছিল আমার একমাত্র অপরাধ, তা নাহলে কখনো কোন নির্দিষ্ট মত ও পথ থেকে সরে যাবার প্রয়োজন দেখা দিত না। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের কল্যাণের জন্য নীতি, নীতির জন্য মানুষ নয়। তিনি বলেন “নিম্ন কৃষকের কথা মনে করে আজকের যেই কাজটি উত্তম বলে গ্রহণ করেছি হয়তো পরের দিন প্রত্যক্ষ করেছি যে, রাজনৈতিক কুটিল আবর্তে তাকে সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। তখন বাধ্য হয়ে নীতি পাল্টাতে হয়েছে।

শেরে বাংলা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করতে না পারলেও প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে ১৯৩৮’র ৫ই নভেম্বর ফ্রাসিস ক্লাউডের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ১৯৪০’র ২১ শে মার্চ জমিদারী প্রথা বিলোপের সুপারিশ সম্বলিত রিপোর্ট প্রদান করে এবং জমিদারের দেয় রাজস্বের অনুপাতে ইহার ৫ হতে ১০ গুণ টাকা ক্ষতি পূরণ স্বরূপ জমিদারকে দেয়ার প্রস্তাব করেন। ক্লাউড কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে জমিদারী প্রথা বিলোপের জন্য তিনি আইন পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁর মন্ত্রীসভার জমিদার গোষ্ঠী মন্ত্রীদের তীব্র বিরোধিতা ও তাঁকে গদীচ্যুত করার চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রস্তাবটি পাশ করান। কিন্তু এই প্রস্তাবকে আইনের খসড়ার রূপ দেয়ার পূর্বে তিনি পদত্যাগ করায় জমিদারী উচ্ছেদ করা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। ঋণসালিশীবোর্ড গঠন করে জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচার হতে কৃষক প্রজাদেরকে রক্ষা করেন। বাংলার ৬০ হাজার ঋণ সালিশীবোর্ড স্থাপন করে কয়েক কোটি কৃষক প্রজার ঋণ ও জমি মুক্তির ব্যবস্থা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ও তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৯র মহান ১১ দফা আন্দোলন তথা গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বরা ছাত্র সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’, শ্রী সুভাষ চন্দ্র বসুকে ‘নেতাজী’, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’, শ্রী চিত্ত রঞ্জন দাসকে ‘দেশবন্ধু’, শ্রী যতীন্দ্র মোহন সেনকে ‘দেশপ্রিয়’, স্যার আশুতোষ মুখার্জীকে ‘বাংলার বাঘ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল বাঙালিরা আর ফজলুল হককে ‘শেরে বাংলা’ উপাধি দিয়েছিল তাঁর অসীম সাহস ও তেজোদীপ্ত ভাষণে মুগ্ধ হয়ে ১৯৩৭ সালে লখনৌতে অনুষ্ঠিত মুসলিম সম্মলনে লক্ষ্মৌবাসী তথা অবাঙালিরা।

জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মূল্যায়ন সাবেক রাষ্ট্রপতি (২৫ জানু১৫ আগস্ট ’৭৫ ও প্রধানমন্ত্রী ১২ জানুয়ারি ’৭১ ২৫ জানুয়ারি ’৭৫) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদগাতা হিসাবে এবং বাঙালির সার্বিক কল্যাণে তার গৌরবময় ভূমিকা ইতিহাসের এক প্রোজ্জ্বল অধ্যায় আছে। (দৈনিক বাংলা / ২৭/০৪/৭৫), জননেতা মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন ১৯৩৭ খৃস্টাব্দে লক্ষ্মৌতে জিন্নাহ জিন্দাবাদ যখন একবার বলেছে ‘শেরে বাংলা জিন্দাবাদ’ তখন ৫০ বার উচ্চারিত হয়েছে। তিনি আমাদের জাতীয়তাবাদের জনক ও উদগাতা।

৫২র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ৫৪’র ৩৭ মার্চ অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শেরে বাংলাসোহরাওয়ার্দ্দীমৌলানা ভাসানীমাওলানা আতাহার আলীআবুর হাশিমের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় লাভে এক দৃঢ়চিত্ত নেতৃত্ব দেন তিনি। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনসহ সকল প্রাদেশিক মন্ত্রীসহ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মুহাম্মদ আলীও পরাজিত হন। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২২৩, মুসলিম লীগ ৯ ও স্বতন্ত্র ৫জন নির্বাচিত হন। জাতীয় জীবন থেকে হীনস্মন্যতার অবসান ও ঘটানোই হচ্ছে তাঁর জীবনের সব চাইতে বড়দাম। তাঁর সংস্পর্শে আত্ম বিশ্বাস ফিরে পায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডক্টর আবদুল করিম তাঁর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলার সুসন্তান ফজলুল হক ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। মহাপুরুষদের সংজ্ঞা দেওয়া সহজ নয়। মহাপুরুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানবপ্রেম, জনসেবা। তাঁরাই মহাপুরুষ, যাঁরা মনে করেন জনসেবাই ভগবৎ সেবা, যাদের পেশায় ও কর্মে মানুষের সুদুর প্রসারী কল্যাণ সাধিত হয়। তিনি ছিলেন জনদরদী, তাঁর ছিল মানব প্রেম, মানুষের সুদুর প্রসারী কল্যাণের জন্যই তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে, বাংলার জনগণের মধ্যে রূপকথার নায়কের মত ছিলেন, (বিচিত্রা / ২০০৬৮০) বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব কামাল উদ্দিন হোসেন বলেন ফজলুল হক ছিলেন পূর্ণাঙ্গ ডেমোক্রেট। বাংলার মুসলমান নানাভাবে তাঁর নিকট ঋণী। তাঁর কতকগুলি পদেক্ষপ যা আগে আমার কাছে আপাত বিরোধী মনে হয়েছিল, এতদিন পরে সেগুলিতে গণতান্ত্রিক বোধের স্পষ্ট পরিচয় পাচ্ছি যেমন তাঁর রাজনৈতিক দল ত্যাগের কথা। তিনি জীবনে বেশ কয়েকবার দল বদল করেছেন। তাঁর এই পদক্ষেপগুলি একটু অনুধাবন করে দেখি তবে দেখব মোটামুটি গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে রাখার জন্য তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছেন দৈনিক বাংলা ও দৈনিক ইত্তেফাক ২৬১০৭৩। অবিভক্ত বাংলার এককালীন অস্থায়ী গভর্ণর স্যার রবার্ট এনরভি তাঁর ইয়ারস অব চেইঞ্জ ইন বেঙ্গল এন্ড আসাম বইতে বলেন মুসলমানদের মধ্যে জনাব ফজলুল হকের দারুণ প্রভাব রয়েছে। আমার বিচারে পুরনো আইন সভা অর্থাৎ ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের কার্যকালে তিনি নিজেকে খুবই একজন ধীশক্তি সম্পন্ন ও সফল বিতর্ককারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর অমলেন্দু দে’র দৃষ্টিতে ফজলুল হক শুধুমাত্র একটি নাম নয়। তিনি হলেন নিপীড়ন আর বিভেদ পন্থার বিরুদ্ধে বঙ্গীয় জাতীয়তা, উদার ও সংস্কারমুক্ত মনের মূর্ত প্রতীক। তিনি বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত (“পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক” পৃষ্ঠা২৪০)

আমার স্মৃতিতে ১৯৫৭ সালের রমনা গার্ডেনে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাক প্রাদেশিক স্কাউট র‌্যালীতে তাঁকে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল স্কাউট দলের সদস্য হিসাবে গার্ড অব অনার দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলেন। তিনি তখন প্রাদেশিক গভর্ণর (১৯৫৬৫৮)। প্রথা ভঙ্গ করে গাড়ী থেকে বের হয়ে আমাদের প্রত্যেককে করমর্দন করে বললেন তোমরা আমার নাতী তোমরা প্রত্যেকে শেরে বাংলা হবে।

১৯৬২র ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সমগ্র বাংলা অঝোর ঝরে কেঁদেছিল তার অগ্নিগর্ভা সন্তান অর্ধ শতাব্দীর মুকুটবিহীন সম্রাট, কৃষক প্রজা আন্দোলনের মহানায়ক, অবিভক্ত ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, অবিভক্ত বাংলা প্রথম প্রধান মন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে। দীর্ঘ ৬৪ বছর পর সেই ছেলে হারানো বেদনার করুণ আর্তনাদ কাল বৈশাখীর বাতাসে বার বার প্রতিধ্বনিত হয় এবং আবহমান কাল ধরে রেশ চলবে।

লেখক : জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ার সেই জাঙ্গালিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা, এবার মাইক্রো খাদে পড়ে নিহত ৩
পরবর্তী নিবন্ধমহেশখালীতে ৩৫ বছর পর বাজার দখলমুক্ত