গত সপ্তাহে তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে পাম্পগুলোতে গাড়ির চাপ কমেছে। আগে যেখানে ২০–২২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে হতো, সেখানে এখন ১০–২০ মিনিট দাঁড়ালে তেল পাওয়া যায়। কিন্তু কেন তেলের এতো সংকট? প্রথমত এটা আমাদের নিজেদের ক্রিয়েট করা একটা সমস্যা। পরে তেল পাবে কিনা এই আশঙ্কায় অনেকে চাহিদার বেশি তেল কিনতে গেছে। অনেকে গাড়িতে তেল থাকার পরেও আবারো তেল নিতে গেছে। তেল কিনে স্টক করেছে ও গোপনে বেশি দামে বিক্রি করেছে। আবার অনেকে প্রতিবেশী দেশে পাচার করেছে। অথচ তেলের সংকট বিশ্বব্যাপী। তবে আর কোন দেশে নিজেদের ক্রিয়েট করা এই ধরনের সমস্যার নজির আছে কিনা সন্দেহ। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি একটি বড় ইস্যু। তেল গ্যাস কয়লা সোলার যাই হোক না কেন, পর্যাপ্ত এনার্জি ছাড়া কোন দেশ চলতে পারবে না।
এবারের আমেরিকা ইজরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে ১৯৭০ দশকের পর পুরো বিশ্ব আবারো নতুন করে জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৭০ সালে শুধু তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল, এখন একসঙ্গে তেল ও গ্যাস দুটোরই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তবে ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিসর ও সিরিয়ার (ইয়োম কুপ্পির) যুদ্ধের পর ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ অনুভব করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশই তখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প অনুসন্ধান শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তেল অনুসন্ধান শুরু করে। এতে তেল না হলেও অনেকগুলো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। আশি ও নব্বইয়ের দশকজুড়ে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও (ব্রিটেন ও ইউরোপ) গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রও বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে থাকে। ইউরোপ ধীরে ধীরে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন ইউরোপের গ্যাসের বাজার রাশিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে আনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে গ্যাস রপ্তানি করতে হলে তা তরল করে (এলএনজি) আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়, যার খরচ পাইপলাইনের গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ এলএনজির জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ও বড় অবকাঠামো দরকার। গ্যাসকে তরল করতে হয়, তারপর কার্গো জাহাজে করে পাঠাতে হয়। গন্তব্যে গিয়ে আবার তা গ্যাসে রূপান্তর করতে হয়, তারপর কনভার্ট করে পাইপলাইনে বিতরণ করতে হয়। এদিকে বিশ্বে পরিবেশদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ বাড়তে থাকায় অনেক দেশ কয়লা থেকে সরে আসতে শুরু করে। নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বহু দেশই যুক্তরাষ্ট্রের পথ ধরে এলএনজিকে ‘কৌশলগত জ্বালানি’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। মূলত ২০১০–এর দশকে এলএনজির বাজার দ্রুত বাড়ে। এই ঢেউ বাংলাদেশেও এসে লাগে। ফলশ্রুতিতে মহেশখালীতে করা হয় এলএনজি ডিপো। গ্যাসের চাহিদা মিটাতে নিয়মিতভাবে বিশ্ব বাজার থেকে এলএনজিবাহী জাহাজ আনা হচ্ছে।
এদিকে ২০১০ সাল থেকে জাপানের সহায়তায় বাংলাদেশে যে পাওয়ার ‘মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন শুরু হয়, তার ২০১০, ২০১৬ ও ২০২৩ সংস্করণে এলএনজি ও কয়লার উপর নির্ভরতা বাড়ানোর কথা জোর দিয়ে বলা হয়। সেই পথ ধরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এলএনজি নির্ভরতা বাড়াতে থাকে। পাশাপাশি ২০১০–এর দশক জুড়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লার উপর ভর করে প্রায় ৫,৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে।
ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রাখতে গিয়ে এসব প্রকল্পে জাপানি, ভারতীয় ও চীনা কোম্পানিকে সুযোগ দিতে হয়েছে। রাশিয়াকে সুযোগ দিতে গিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বর্তমানে বিশ্ব আবার নতুন করে জ্বালানি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। কোভিড–পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধসব মিলিয়ে আবারো গভীর জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। তবে যেসব উন্নত দেশের তেল ও এলএনজি মজুত করার সক্ষমতা আছে, তাদের দুর্ভোগ তুলনামূলক কম। বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশ, যাদের অর্থ ও অবকাঠামোর অভাবে জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, তারা এখন বেশি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে কার্যত নিঃস্ব হওয়ার পথে। দেখা গেছে ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশকে জ্বালানি কিনতে ৪০% বেশি খরচ করতে হবে। আর বাংলাদেশে এলএনজি–নির্ভরতা বেশি হয়েছে, কারণ বিগত সরকার গত কয়েক বছরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেয়নি। এখন দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরো দুইটি টার্মিনালের নির্মাণ প্রথমে স্থগিত হলেও আবার নতুন করে এসব টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
গত বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছে। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গার্মেন্টস সেক্টরে আরোপিত অতিরিক্ত ১৯% পাল্টা শুল্ক শূন্যে নামানোর বেশ কিছু শর্তের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বাংলাদেশ পরবর্তী ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি কিনতে হবে।
লক্ষণীয় হলো, সামপ্রতিক সংকটের সময় রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি নির্ভরতার জন্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভূরাজনীতির কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আমাদের আবারো দেখালো এলএনজি নির্ভরতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশ কত বড় সংকটে আছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো সৌর বিদ্যুৎ ও সমুদ্রবক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলন। তবে সমুদ্রবক্ষে গ্যাস উত্তোলনে সময় লাগলেও দ্রুত সমাধান হিসেবে এখনই বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়ন করা যায়। এর মধ্যে আছে এলাকাভিত্তিক বড় সৌর প্রকল্প, ছাদভিত্তিক (ছাদে) সৌরবিদ্যুৎ এবং সেচের জন্য সৌর পাম্প। এসব প্রকল্পে ব্যবহৃত প্যানেলের বড় অংশ আসে চীন থেকে। তবে এগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দিক থেকে কিছু স্পষ্ট প্রণোদনা, আমদানি শুল্ক মওকুফ ও নীতিগত নিশ্চয়তা দরকার। তাহলেই দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অনেকেই এগিয়ে আসবে এবং আগামী ২–৩ বছরে দেশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাবে। তবে এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের মডেলটি অনুসরণ করা যায়। ভিয়েতনাম ২০১৮ সালে শূন্য থেকে শুরু করে ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ১৬,৫০০ মেগাওয়াট সৌর সক্ষমতা তৈরি করেছে। যা তাদের মোট সক্ষমতার প্রায় ২৫%। শুধু ২০২০ সালে তারা প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করেছে, যার ৪৮% হচ্ছে রুফটপ সোলার। তবে ভিয়েতনামের এই সফলতার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল সরকারের পলিসি ও ‘ফিড–ইন ট্যারিফ’ প্রণোদনা। ফিড–ইন ট্যারিফ হলো এমন একটি নীতিমালা, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রিডে সরবরাহকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট (সাধারণত বাজারদরের চেয়ে বেশি) মূল্যের নিশ্চয়তা দেয়। ভিয়েতনাম সরকার ঘোষণা করেছিল, যারা ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে পারবে, শুধু তারাই ২০ বছরের জন্য নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রির গ্যারান্টি পাবে। নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে ‘উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছু বেশি দামে’ দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত বিনিয়োগে নামেন। ফলে এই নীতির লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে। তবে এবারের সংকট শুরুর পর দেখা যাচ্ছে,যে দেশ যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে, তারা তত বেশি নিজেদের অর্থ সাশ্রয় করতে পারছে। ইউরোপের দেশগুলো ছাড়াও চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান সাশ্রয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে পাকিস্তান ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে। তাই যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও সাম্রাজ্য বাদী আগ্রাসন মোকাবিলা করতে হলে আমদানি নির্ভরতা কমানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
অন্যদিকে এলএনজি কিনতে সরকার বছরে যে লাখ লাখ ডলার ভর্তুকি দিচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগ দেওয়া যাবে এবং নিজেরা বিনিয়োগ করলে গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতাও বাড়বে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা দিলে শুধু অর্থ সাশ্রয়ই হবে না, ভূরাজনীতিতে দর–কষাকষির ক্ষেত্র আরো মজবুত হবে। তাই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সৌরবিদ্যুৎ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে পারলে দ্রুত দেশ স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট














