পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ শিক্ষা ও আর্থিক পরামর্শক : টেকসই অর্থনীতির অপরিহার্য ভিত্তি

মোহাম্মদ আইয়ুব | সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুঁজিবাজার অপরিহার্য। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার দেশের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে। নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। ব্যবসা সমপ্রসারিত হয়। কর্মসংস্থান বাড়ে। একই সঙ্গে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপও কমে।

তবে শুধু একটি পুঁজিবাজার থাকলেই হয় না। সেই বাজারকে শক্তিশালী করে সচেতন বিনিয়োগকারী। আর সচেতন বিনিয়োগকারী গড়ে ওঠেন বিনিয়োগ শিক্ষা ও সঠিক আর্থিক পরামর্শের মাধ্যমে।

গত প্রায় ২৫ বছর ধরে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাকর্মচারী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত অর্থ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষক ও রিসোর্স পার্সন হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় বারবার উপলব্ধি করেছি। সফল বিনিয়োগের মূল ভিত্তি শুধু অর্থ নয়। প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, ধৈর্য, শৃঙ্খলা, তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

দেশবিদেশের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, অধ্যয়ন এবং বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। যেসব দেশে আর্থিক শিক্ষা বিস্তৃত এবং নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থা শক্তিশালী, সেসব দেশের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেন। এর সুফল ব্যক্তি, পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতিসবার কাছেই পৌঁছে।

একটি কথা প্রচলিত আছে-‘বুইজ্জা কাম করলে ঠকন লাগে না।’ অর্থাৎ বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক কমে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সহজ কথাটিই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের বাজার অস্থিরতার পেছনে নীতিগত, কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্বলতা ছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং অন্য কিছু কারণও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। পাশাপাশি বিনিয়োগ শিক্ষার ঘাটতি, নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শকের অভাব, গুজবনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়া বিনিয়োগও বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। এর ফলে অসংখ্য মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়েছেন। বহু পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে। এমনকি কয়েকজন বিনিয়োগকারী আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথও বেছে নিয়েছেন।

সমস্যা শুধু পুঁজিবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। আজও বহু মানুষ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ডেসটিনি, যুবক কিংবা ভুয়া সমবায় প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতারণামূলক প্রকল্পে অর্থ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। অবাস্তব মুনাফার লোভ দেখিয়ে তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। আবার অনেক মানুষ রিয়েল এস্টেট, ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে গিয়েও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে এমন ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে। শুধু সঞ্চয় করলেই আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সঠিক বিনিয়োগ শিক্ষা। প্রয়োজন দক্ষ ও নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শকের সহায়তা। ডিজিটাল যুগে বিনিয়োগের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু ঝুঁকিও অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, অনুমোদনহীন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, অবাস্তব মুনাফার প্রতিশ্রুতি, অনলাইন জুয়া এবং নানা ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ কার্যক্রম মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

বিশেষ করে তরুণ, প্রবাসী, নতুন বিনিয়োগকারী, কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই আর্থিক শিক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি একটি অপরিহার্য জীবনদক্ষতা।

একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা সহজ নয়। একটি ভালো বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের আগে কোম্পানির করপোরেট সুশাসন, উদ্যোক্তা পরিচালকদের গ্রহণযোগ্যতা, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, শেয়ারপ্রতি আয়, নিট সম্পদ মূল্য, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে একজন দক্ষ ও নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক বিনিয়োগকারীকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারেন। তাই বাংলাদেশে একটি কার্যকর নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সমপ্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট, আইসিএবি, আইসিএমএ এবং অন্যান্য উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক হিসেবে অনুমোদনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিনিয়োগকারীরা পেশাদার পরামর্শ পাবেন। বাজারের প্রতি আস্থা বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। শিল্প খাতে মূলধনের প্রবাহও বাড়বে। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো বহু বছর ধরেই লাইসেন্সধারী আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থার সুফল পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং প্রতিবেশী ভারতেও নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শকরা বিনিয়োগ, অবসর পরিকল্পনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিগত অর্থ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও মূল্যবান হতে পারে।

বিনিয়োগ শিক্ষা শুধু শেয়ার কেনাবেচা শেখায় না। এটি মানুষকে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ব্যক্তিগত অর্থ পরিকল্পনা শেখায়। ঝুঁকি মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়ায়। প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে শেখায়। সচেতন বিনিয়োগকারী নিজের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

বিনিয়োগ শিক্ষা এবং নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হবেন। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। উৎপাদন বাড়বে। কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসাবাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, আমদানিরপ্তানি, শিল্প ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এই অঞ্চলেও বিনিয়োগ শিক্ষা এবং পেশাদার আর্থিক পরামর্শক সেবার বিস্তার এখনও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। ফলে অনেক উদ্যোক্তা, প্রবাসী, চাকরিজীবী এবং নতুন বিনিয়োগকারী প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

একটি আধুনিক অর্থনীতির তিনটি প্রধান ভিত্তি হলোসচেতন বিনিয়োগকারী, দক্ষ ও নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক এবং স্বচ্ছ পুঁজিবাজার। এই তিনটি ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, দেশের অর্থনীতিও তত বেশি টেকসই হবে।

পুঁজিবাজার কোনো দেশের বিলাসিতা নয়। এটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগ শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে। একই সঙ্গে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আজকের এই বিনিয়োগই আগামী দিনের সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করবে।

লেখক: প্রশিক্ষক, রিসোর্স পার্সন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমাধারী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআহমদ ছফা কেন প্রাসঙ্গিক
পরবর্তী নিবন্ধনিউ ইয়র্কে অভিনেতা অপূর্বর একক সংগীত সন্ধ্যা