মানুষ প্রয়োজনেই জন্মগতভাবে পর্যটক। এপম্যান থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকার সাথে পর্যটনও একধরনের শর্ত। মানুষ নিরক্ষীয় অঞ্চলে বসবাস পর্যটন বা বলতে গেলে স্থানান্তর ছাড়া সম্ভব ছিলো না। কারণ মানুষের আদিবাস ছিলো আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে। তো এই আদি মানবেরা স্থানান্তর এর মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এই স্থানান্তর আধুনিক অর্থে পর্যটন না বোঝালেও পর্যটনের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভৌগলিক সংস্কৃতি বোঝার উপায়।
আমরা কোন নির্দিষ্ট স্থানে বসে, বিশ্বের সামাজিক, অর্থনীতিক, রাজনৈতিক ঘটনাবলী বইতে পড়ি, তা তো এক পর্যটনই। টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখে কিছুর জানান নেয়া তো পর্যটনই।
পর্যটন আধুনিক সমাজের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনা। সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যটনকে কেবল অবসর বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি জটিল সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পর্যটনের সমাজতত্ত্ব পর্যটকের আচরণ, পর্যটনের সামাজিক কাঠামো, হোস্ট সমপ্রদায়ের উপর তার প্রভাব এবং বৈশ্বিকীকরণের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
এই ক্ষেত্রটি ১৯৭০–এর দশক থেকে স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়েছে। ডিন ম্যাকক্যানেল, জন উরি এবং ইরিং গোফম্যানের মতো সমাজতাত্ত্বিকগণ এর ভিত্তি স্থাপন করেন। বর্তমান বিশ্বে পর্যটন শিল্প বিশ্ব অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ দখল করে আছে এবং এটি সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সমাজতাত্ত্বিক মাত্রা, তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক প্রভাব এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জসমূহ একটু আলোচনায় আনা যাক।
পর্যটনকে সমাজতত্ত্বে একটি ‘আধুনিকতার আয়না’ হিসেবে দেখা হয়। ডিন ম্যাকক্যানেল (১৯৭৬) তার ক্লাসিক গ্রন্থ The Tourist : A New Theory of the Leisure Class–এ পর্যটককে আধুনিক সমাজের ‘অনুসন্ধানকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, আধুনিক জীবনের অপ্রামাণিকতা (inauthenticity) থেকে পালিয়ে পর্যটকরা ‘প্রামাণিকতা’ (authenticity) খুঁজে বেড়ায়। তবে এই অনুসন্ধান প্রায়শই স্তরভিত্তিক হয় পর্যটক যা দেখে তা প্রায়ই ‘স্টেজড অথেন্টিসিটি’।
জন উরি (১৯৯০) ‘টুরিস্টিক গেজ’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন যে, পর্যটন দৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। পর্যটকের দৃষ্টি সামাজিকভাবে নির্মিত হয় এবং এটি স্থান, সংস্কৃতি ও মানুষকে বস্তুরূপে রূপান্তরিত করে। এই গেজ পাশ্চাত্য কেন্দ্রিক হতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশের সমাজকে ‘এক্সোটিক’ বা ‘পিছিয়ে পড়া’ হিসেবে চিত্রিত করে।
পর্যটনের সমাজতত্ত্ব বিভিন্ন তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে:
কার্যকরীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি : এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পর্যটন সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। তবে এটি সামাজিক অসমতুল্যতা উপেক্ষা করে।
সংঘাত তত্ত্ব : মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যটনকে পুঁজিবাদী শোষণের একটি রূপ হিসেবে দেখা হয়। বড় আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন এবং ট্যুর অপারেটররা স্থানীয় সমপ্রদায়ের সম্পদ শোষণ করে, যেখানে লাভের বৃহত্তর অংশ বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যায়। এটি স্থানীয় অর্থনীতির ‘লিকেজ’ ঘটায়।
প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ : এই দৃষ্টিভঙ্গি পর্যটক ও হোস্টের মধ্যে দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়া এবং অর্থ নির্মাণের উপর জোর দেয়। পর্যটনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো পুনর্র্নিমিত হয়।
উত্তর–আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি: উত্তর–আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকরা পর্যটনকে ‘হাইপার–রিয়ালিটি’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে বাস্তবতা ও প্রতিরূপের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায় (যেমন থিম পার্ক বা হেরিটেজ সাইট)।
পর্যটনের সামাজিক প্রভাব দ্বিমুখী। ইতিবাচক দিক হলো সাংস্কৃতিক বিনিময়, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। অনেক সমপ্রদায় পর্যটনের মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে।
নেতিবাচক প্রভাবসমূহ উল্লেখযোগ্য। ‘ডেমোনস্ট্রেশন ইফেক্ট’–এর ফলে স্থানীয় যুবকরা পর্যটকদের জীবনযাত্রার অনুকরণ করে, যা সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ঘটাতে পারে। কমোডিফিকেশন অফ কালচার–এর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নৃত্য ও ঐতিহ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়।
সামাজিক অসমতা বৃদ্ধি পায় যখন পর্যটনের সুবিধা শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। লিঙ্গভিত্তিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ; অনেক ক্ষেত্রে নারীরা হাউসকিপিং বা সার্ভিস সেক্টরে নিযুক্ত হয়ে শোষণের শিকার হয়। উপরন্তু, পর্যটনকেন্দ্রিক অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
বৈশ্বিকীকরণ পর্যটনকে ত্বরান্বিত করেছে। এয়ারলাইন্স, অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়া পর্যটনকে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। তবে এটি সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করেছে।
টেকসই পর্যটন সমাজতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এটি পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কমিউনিটি–বেসড ট্যুরিজম মডেল স্থানীয় সমপ্রদায়কে ক্ষমতায়ন করে এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। সমসাময়িক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ওভারট্যুরিজম–যা ভেনিস, বার্সেলোনার মতো শহরে স্থানীয়দের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। কোভিড–১৯ মহামারি পর্যটনের সামাজিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছে এবং ডিজিটাল নমাড– এর উত্থান নতুন সামাজিক গতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।
পর্যটনের সমাজতত্ত্ব প্রমাণ করে যে, পর্যটন কোনো নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি ক্ষমতা, পরিচয়, সংস্কৃতি ও অসমতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি সমাজকে উন্নয়নের সুযোগ প্রদান করে আবার সামাজিক ক্ষতিরও কারণ হতে পারে। ভবিষ্যতে পর্যটনের সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা টেকসইতা, ন্যায়বিচার এবং স্থানীয় সমপ্রদায়ের অধিকারের উপর অধিক জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কক্সবাজার, সুন্দরবন ও সিলেটের মতো পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে পর্যটন নীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে পর্যটনকে একটি সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিল্পে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী; উপাচার্য, চট্টগ্রাম বি জি এম ই এ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম।












