আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিবছর এই দিনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই দিবসটিকে পালন করা হয়। এ দিবস পালনের পেছনে উদ্দেশ্য হলো, পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ দ্বারা পালিত হয়েছিল এই দিনটি। প্রতি বছরই দিবসটি আলাদা আলাদা শহরে, আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পালিত হয়। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য হলো– ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’
সত্যি বলতে কী, আমরা সবাই প্রকৃতির সন্তান। তাই প্রকৃতিকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য প্রতিদিনই হতে পারে পরিবেশ দিবস। তবে প্রকৃতি না বাঁচলে মানবজাতিই যে বিপন্ন হবে তার গুরুত্ব এবং এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই মূলত ৫ জুনের বিশেষত্ব। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের জেরে গোটা বিশ্বজুড়েই পরিবেশের দফারফা। বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘুম ছুটিয়েছে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের। যে ভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে, ভূগর্ভে সঞ্চিত জল ও জ্বালানি তলানিতে এসে ঠেকেছে , তাতে অদূর ভবিষ্যতে মানব সভ্যতার সামনে যে বিশাল সংকট এসে উপস্থিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার ওপরেই বর্তায়। একটু চেষ্টা করলেই পরিবেশ রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারি আমরাও।
বিশ্লেষকরা বলেন, পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে। পরিবেশবিদরাও নানা আন্দোলন করছেন। তাতে যে খুব একটা লাভ হচ্ছে না, তা দূষণ অব্যাহত ও অবনতি থেকে বোঝা যায়। অথচ দেশের সবধরনের দূষণ রোধে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ওয়াসা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারা কি কাজ ও দায়িত্ব পালন করছে, তা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। রাজধানীতে দূষণ এতটাই মারাত্মক যে, এখানে বসবাস অসম্ভব পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এখানে সবধরনের দূষণ অব্যাহত রয়েছে। বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে যানবাহন, ইটভাটা, কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও উন্নয়ন কাজের ধুলোবালি অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ থাকলেও তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করায় বায়ুদূষণ এতটুকু কমছে না। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপ রাজধানীকে রীতিমতো বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করেছে।
পরিবেশ নির্মল রাখতে নদনদীর স্বাভাবিক গতি ও জলাশয়ের পানির স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সারাদেশের নদনদী ও জলাশয় অবৈধ দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কলকারখানাসহ গৃহস্থালির সবধরনের বর্জ্য নদনদী ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে এগুলোর স্বাভাবিক বিশুদ্ধতা নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশের জন্য প্লাস্টিক বর্জ্য এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটি এমন এক বর্জ্য যা অপচনশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক পাঁচশ’ বছরেও পচে না। মাটিতে বা নদীর তলদেশে জমে থাকে। এতে মাটির উর্বরতা বিনষ্টের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নদীর পানিতে থাকা প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কেমিক্যালের কণিকা মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এতে ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্লাস্টিক শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি শিল্প, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংকটও। শিল্প মন্ত্রণালয় উৎস থেকে দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিমসটেক অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতা বাড়াতে হবে। তাঁরা উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, ‘বাংলাদেশের বিস্তৃত নদী ও উপকূল প্লাস্টিক দূষণের তীব্রতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর ৮৭ হাজার টন আন্তঃমহাদেশীয় প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে একটি দ্রুত কর্মকৌশল প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে আমাদের জন্য।’ পরিবেশ রক্ষায় বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য একটি দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ ২০১৮ সালের মাঠ জরিপ অনুযায়ী মোট ভূমির ১৪.১% উন্নীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবেশ বিশুদ্ধ করার দায়িত্ব যাঁদের তাঁদেরকে বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ দিয়ে বাহবা নেয়ার মানসিকতা পরিহার করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবেশ বিনষ্টের কারণ দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে সোচ্চার ও তৎপর হতে হবে।








