নারীর স্বাস্থ্যসেবায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্য, স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সমপ্রসারণে ২৫ কোটি ইউরোর একটি পরিকল্পনা সামনে এসেছে। অক্টোবরের শুরুতে বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের এই উদ্যোগের খবর নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থায়নের পরিমাণ যত বড়ই হোক, সেই সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের কাছে কতটা পৌঁছাবে?
বাংলাদেশে নারীর স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ভবন থাকতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না–ও থাকতে পারেন। জেলা হাসপাতালে পরীক্ষা করার যন্ত্র থাকলেও সেটি চালানোর দক্ষ জনবল কিংবা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হতে পারে। আবার কোথাও চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও যাতায়াতের খরচ, পরিবারের সিদ্ধান্ত কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে নারীরা সময়মতো সেবা নিতে পারেন না। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের কার্যকারিতা নির্ভর করে অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার ওপর।
বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু কমানো, টিকাদান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অঞ্চলভেদে বৈষম্য রয়ে গেছে। শহরে যে চিকিৎসা তুলনামূলক সহজলভ্য, গ্রামে তা পেতে একজন নারীকে একাধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হতে পারে। বিশেষত জটিল প্রসব, ক্যানসার শনাক্তকরণ কিংবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হলে দূরত্ব এবং খরচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় মাতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে প্রধান জায়গা দখল করে আছে। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব–পরবর্তী সেবা অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু নারীর স্বাস্থ্যজীবন মাতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৈশোরে পুষ্টিহীনতা ও মাসিকসংক্রান্ত সমস্যা থেকে শুরু করে প্রজননস্বাস্থ্য, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং মধ্যবয়সের শারীরিক পরিবর্তন–সব পর্যায়েই প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও পরামর্শ।
বিশেষ করে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার নারীর স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুই রোগের ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ চিকিৎসার ফলাফলে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকাদান এবং উপযুক্ত বয়সে পরীক্ষার সুযোগ প্রয়োজন। স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও উপসর্গ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা, রোগনির্ণয় এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু ক্যানসার শনাক্তকরণকে শুধু একটি পরীক্ষার আয়োজন হিসেবে দেখলে চলবে না। পরীক্ষায় সন্দেহজনক ফল পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে কী হবে? কোথায় বায়োপসি করা যাবে, কত দিনের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যাবে, কোন হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হবে–এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার না থাকলে প্রাথমিক পরীক্ষার সুফল সীমিত হয়ে যায়। একজন রোগীকে বারবার হাসপাতাল বদলাতে হলে অর্থের পাশাপাশি সময় ও মানসিক শক্তিও ক্ষয় হয়।
এই জায়গায় নতুন স্বাস্থ্য বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শনাক্তকরণ, জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকতে হবে। রোগীকে যেন প্রতিটি ধাপে নতুন করে পথ খুঁজতে না হয়। চিকিৎসার পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনও এই ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত। অর্থায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জনবল। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা তুলনামূলক দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু সেই যন্ত্র নিয়মিত চালানো, ফলাফল ব্যাখ্যা করা এবং রোগীকে পরবর্তী চিকিৎসায় পাঠানোর জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মী প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর্মীদের পদায়ন, প্রশিক্ষণ এবং কর্মস্থলে ধরে রাখার ব্যবস্থা ছাড়া অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন।
নারীদের চিকিৎসা গ্রহণের পথে সামাজিক বাধাও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক নারী নিজের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেন না, অথবা সংসারের অন্য সদস্যদের প্র্রয়াজন মেটাতে গিয়ে চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। কারও নিজের আয় নেই, কারও হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সঙ্গী প্রয়োজন। আবার প্রজননস্বাস্থ্য কিংবা স্তনের সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন অনেকে। স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনায় এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করলে নতুন সুবিধা তৈরি হলেও তার ব্যবহার প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
এ জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গোপনীয়তা, মর্যাদাপূর্ণ আচরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নারী স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী যেন অপমান, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন কিংবা অবহেলার মুখোমুখি না হন। বিশেষত কিশোরী, অবিবাহিত নারী, প্রতিবন্ধী নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার পরিবেশ নিরাপদ ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা, হাওর, চর কিংবা উপকূলের মতো দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি সর্বত্র কার্যকর হবে না। কোথাও নৌপথে যাতায়াতের ব্যবস্থা জরুরি, কোথাও পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়, আবার কোথাও মৌসুমি দুর্যোগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে জাতীয় পরিকল্পনার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবায়ন কৌশল প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা নারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারেন, ঝুঁকির লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন এবং উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্ের যেতে উৎসাহিত করতে পারেন। তবে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বড় বিনিয়োগের সঙ্গে জবাবদিহিও জরুরি। কতটি নতুন সেবাকেন্দ্র চালু হলো, কতজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ পেলেন কিংবা কতটি যন্ত্র কেনা হলো–এসবের পাশাপাশি জানতে হবে, কতজন নারী সময়মতো চিকিৎসা পেলেন। পরীক্ষা থেকে চিকিৎসা শুরুর সময় কমল কি না, রোগীর নিজস্ব ব্যয় হ্রাস পেল কি না এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ল কি না–এসব সূচকও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিশেষভাবে নজর দিতে হবে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ভার কমানোর দিকে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত এবং থাকার খরচ অনেক পরিবারের জন্য চাপ তৈরি করে। একজন নারী যদি রোগ শনাক্ত হওয়ার পর অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হন, তবে শুধু শনাক্তকরণব্যবস্থা সমপ্রসারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। নারীর স্বাস্থ্যসেবায় নতুন বিনিয়োগ তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে অর্থায়নের ঘোষণা নিজে কোনো চিকিৎসা নয়। সেটি বাস্তব সেবায় রূপ নিতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সঠিক অগ্রাধিকার এবং নিয়মিত মূল্যায়ন।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারিত হবে কোনো চুক্তির অর্থমূল্যে নয়; নির্ধারিত হবে সেই নারীর অভিজ্ঞতায়, যিনি এত দিন চিকিৎসার জন্য দূরের শহরে যেতে বাধ্য হতেন। তিনি যদি নিজের এলাকার কাছাকাছি সময়মতো পরীক্ষা, সম্মানজনক সেবা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান, তবেই বড় বিনিয়োগের অর্থ তাঁর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন হয়ে উঠবে।












