সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু বদলের পরিক্রমায় আমরা ছয় ঋতুর বিভিন্ন রূপ অবগাহন করি। তবে এই ক্ষেত্রে বর্ষা ঋতুর বিষয়টা একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিক। এই ঋতুকে কেন্দ্র করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল থেকে শুরু করে শত শত কবি, সাহিত্যেকের লেখনিতে বর্ষার রূপ গুণগান অবলোকন করি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে ’৯১ এর জলোচ্ছ্বাস পর্যন্ত বর্ষার রূপ ছিল একরকম। আবার ’৯১ এর পর থেকে বর্ষার রূপ দেখা যায় অন্য রকম। বেশির ভাগ পুকুর, জলাশয় ভরাট শুরু হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল নিয়ে বিশেষ করে চট্টগ্রামের শহরতলী গ্রামের মূল্যবান ধানের জমি, বাগান বাড়ি, ক্ষেত, সব জায়গায় অপরিকল্পিত দালান–কোঠা তৈরি হতে থাকে। শহর এলাকায় সিডিএ প্লেন অনুযায়ী (সিটি কর্পোরেশন আওতাভুক্ত) কোন বিল্ডিং আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। কেননা নালা, নর্দমার যে দিকনির্দেশনা সিডিএ প্লেন এ থাকার কথা, সেটা যারা বাড়ি–ঘর তৈরি করেছেন, কেউ নিয়ম মেনে করেন নি। আমরা বরাবরই জানি সিডিএ প্লেনে একটা সিট থাকে। সার্ভে করা হয়। তাহলে যারা দায়িত্ব পায়, তারা কী করে?
এবারে আসা যাক, নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের কথায়। সমিতি থেকে তারা লোন নিয়ে উঠানের যত ফল–মূলের বৃক্ষ আছে, সেগুলো কেটে ভাড়া দেয়ার জন্য সেমিপাকা বা পাকা ঘর তুলে ভাড়া দেয়। কিন্তু আসে–পাশে পানি যাবার বা, বর্জ্য ফেলার কোন জায়গায়ই রাখে না। যার কারণে অশিক্ষিত, অসচেতন নাগরিক সিটি কর্পোরেশন এর বড় নালাগুলোতে প্রতিদিনের বর্জ্য ফেলছে। যদিও সিটি কর্পোরেশন বিদেশের অনুকরণে প্লাস্টিক এর বড় বড় ডাস্টবিন মোড়ে মোড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো বেশিদিন এই দেশে স্থায়ী হয় না। টোকাইরা পুরানো, ভাঙা জিনিস বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আবার অনেকে পানির ড্রাম হিসেবে বাথরুমে ব্যবহার করছেন ও রান্না ঘরে চাল রাখছেন। জুলাই ৬ তারিখ থেকে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে শুরু হলো জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রামের প্রায় এলাকা বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়। উত্তর কাট্টলী এলাকায় অবস্থা ভয়াবহ। ভরাট হয়ে গেছে কাট্টলী খাল, সিটি কর্পোরেশন এর নালা–নর্দমা। বড় ইন্ডাস্ট্রি, মিল–কারখানার বর্জ্যের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। যার কারণে আশে–পাশে নিচতলা ঘর স্কুল ঘর সব ডুবে গেছে। বাথরুম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। মানুষ অমানবিকভাবে সময় অতিবাহিত করছেন। ইতিমধ্যে খবর পাওয়া গেছে স্লুইস গেইটের লোহা খুলে নিয়ে গেছে একদল ডাকাত। যার কারণে ৭ তারিখে বঙ্গোপোসাগরের নিম্নচাপের কারণে জোয়ারের পানি এলাকায় ঢুকে পড়ে। স্লুইস গেইট সঠিক সময়ে বন্ধ করা যায়নি। ফলে জোয়ারের পানি এবং বৃষ্টির এই পানির ঢল একত্রে মিশে বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রতিদিনের ময়লা, আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ডাস্টবিন না ফেলে যেখানে সেখানে রাস্তায় ফেলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছি আমরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সারা বাংলাদেশের এত জঞ্জাল পরিষ্কার করবেনটা কে? আমি, আপনি, নাকি সরকার? আমাকে যদি করতে বলা হয়, তাহলে এর অধিকার পেতে হবে। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে এর গুরুত্ব দিতে হবে। যদি সুশীল সমাজকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে তাঁদের বিশ্বাস করতে হবে। তাঁদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এখানে কোন ধরনের কোন দলকে কাজে হস্তক্ষেপ করতে দেয়া যাবে না। সরকার নিজে দায়িত্ব নিলে, সরকারের কাজের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ নাগরিক চায় মৌলিক চাহিদাগুলো সঠিকভাবে পূরণ হোক। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা। সুতরাং এসবের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে সরকার কে উৎপাদনমুখী কাজে সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে নালা–নর্দমা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে কর্মীদেরকে মাসিক পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সিটির আবর্জনা রাতের ১২ টা থেকে শুরু করে ভোর ৫টা অব্দি পরিষ্কার করার আইন বলবৎ করতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। সকলের হাত একত্রিত করে, আমরা যেকোন সমস্যার সমাধান করতে পারি। দরকার সহযোগিতা, সহমর্মিতা, আস্থা ও বিশ্বাস।
লেখক: প্রাবন্ধিক, টিভি উপস্থাপক, রন্ধনশিল্পী।











