দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ২০ অক্টোবর, ২০১৯ at ২:৫২ পূর্বাহ্ণ
25

আন্তর্জাতিক নাকি আভ্যন্তরীণ?

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ট্রলি ঠেলে সবার শেষে সেই অনুভূতিপ্রবণ দরজাটি পেরিয়ে ঢুকতেই শরীরে টের পেলাম, ওম ওম ভাবের আরাম । এদিকে দেখছি , শুধু আমি কেন? দীপ্র অভ্র ও জানে এ বিল্ডিং এর ভেতর ম্যাকডনাল্ডসের ঠিকানা ! অতএব মহা উৎসাহে লাফাতে লাফাতে অভ্র দরজা দিয়ে ঢুকেই হাঁটা ধরেছে বাঁ দিকে, তার পেছনে দীপ্র; আমাদের সবাইকে পিছু ফেলে । এদিকে আমরা তিনজন হাঁটছি একজন আরেকজনের পিছু পিছু। আমাদের তিনজনের মধ্যে এ মুহূর্তে সবার সামনে ট্রলি ঠেলে ঠেলে এগুচ্ছে হেলেন, তার পেছনে লাজু হাঁটছে গজেন্দ্রগমনে , কিছুটা পা টেনে টেনে । সবার পেছনে আমি । লাজুর হাঁটার ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছি, ওর পা টা ধাতস্থ হতে আর কিছু সময় লাগবে । অতএব এগুচ্ছি আমি শম্বুক গতিতে ট্রলি ঠেলে।
এ সময়, চকিতে একটা কথা মনে পড়ায় ঘাবড়ে গেলাম মনে মনে। কথাটা হলো , আমরা তো যাচ্ছি বেইজিং । তার মানে ধরতে হবে আমাদের তো ডোমেস্টিক ফ্লাইট। আর এখন তো আমরা ঢুকেছি কানমিং আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে । ঘটনা দাঁড়ালো কি তা হলে ? ঢাকার মতো যদি এখানকার আভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরের টার্মিনাল দূরে কোথাও হয় , তবে তো মহা ঝক্কি হবে । কিম্বা যদি হয় আরো দূরে কোথাও, তবে তো ফের ধরতে হবে কোন ট্যাঙি বা ভ্যান । আর ভ্যানই যে পাবো এখানে তারও তো কোন ঠিক ঠিকানা নেই । ওসব ধরার জন্য তো আবার পড়তে হবে হয়তো, প্রথম দিন পরিচিত হওয়া তিন দেশি পাবলিকের হাতে! যারা নাকি আবার আমাদের তুলে দেবে ফের কোন চায়নিজের হেফাজতে , তাতে শেষ পর্যন্ত আবারো যাত্রা করতে হবে, কোরবানির গরুর মতো চাপাচাপি করে, প্রয়োজনের তুলনায় ছোট্ট কোন গাড়িতে করে।
মনের ভেতর আচমকা হাজির হওয়া এই টেনশন দূর করার জন্য , প্রথমে ভাবলাম আচ্ছা বন্ড মিয়াকে যখন ঠিক করছিলাম আমাদেরকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেওয়ার জন্য , তখন কি বলেছিলাম যে আমাদের গন্তব্য বেইজিং? যদি তা হয়ে থাকে , তবে নিশ্চিত সে জেনে বুঝেই আমাদের এখানে নামিয়েছে । হোটেল থেকে গাড়ি ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে সে যেমন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল , আমরা পাসপোর্ট টিকিট এসব ঠিক থাক নিয়েছি কি না; ওরকম দায়িত্বের পরিচয় সে যেহেতু দিয়েছিল, তার পক্ষে আমাদের ভুল জায়গায় নামানোর সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাকে আমরা আমাদের বেইজিং যাত্রার কথা বলেছিলাম কি না তাই তো মনে করতে পারছি না এ মুহূর্তে । সুতরাং টেনশন কমলো না।
টেনশন না কমলেও, আশার কথা হলো ঐ যে বলেছিলাম যে, ছোট বেলায় আব্বার কাছ থেকে ট্রেন ছাড়ার অনেক আগেই স্টেশনে হাজিরা দেবার অভ্যাস টি রক্তে ঢুকে যাওয়ায় , সময় আছে হাতে প্রচুর । অতএব ও নিয়ে দুশ্চিন্তা নাই। আর দ্বিতীয়ত মনে পড়লো, আজকাল আধুনিক এয়ারপোর্ট গুলোতে আন্তর্জাতিক আর আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট গুলো সাধারণত ছাড়ে একদম এক বিল্ডিং থেকে না হলেও, পাশাপাশি টার্মিনাল থেকে । আর খুব বড় এয়ারপোর্ট যেমন সিঙ্গাপুর, দুবাই এয়ারপোর্টের এমন কি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল গুলো দূরে থাকলেও, একটি থেকে আরেকটিতে যাওয়ার অত্যন্ত সুব্যবস্থা আছে। টার্মিনালের ভেতরেই এরকম যাতায়াতের জন্য চমৎকার সব ট্রেন আছে; যেগুলো আসা যাওয়া করে দু তিন মিনিট পর পর । আর এই এয়ারপোর্টের যা আকার দেখছি, তাতে মনে হয়না এর টার্মিনাল গুলো একটা আরেকটা থেকে খুব দূরে আছে । তবে ঝামেলা হবে যদি সেই টার্মিনাল টি এই এলাকা থেকে আসলেই অনেক দূরে হয়, আর ওদিকে যেতে গিয়ে পড়ি যদি জ্যামের পাল্লায় । কারণ ম্যাকডোনাল্ডসে অভ্রর নাস্তা শেষ করেই তো রওয়ানা দিতে হবে ঐদিকে। আর নাস্তাটাও শেষ করতে বলতে হবে তাড়াতাড়িই। এরকম ভাবনা মনে আসতেই, ফের টেনশনটা জাপটে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে।
টেনশনে আমি আছি, তা থাকি । ঐটি কিন্তু টের পেতে দেয়া যাবে না কাউকে। না হয় অযথা লাজুর সাথে একটা কথা কাটাকাটির উপলক্ষ এসে যাবে সামনে এখুনি। কারণ আমি যে একটা বেহদ্দ বেকুবের মতো কাজ করেছি, এ ভোরে সেটা সে সটান বলে দেবে। কথাটা যদিও সত্য, তারপরও মেজাজ চড়ে যাবে আমার, ফলে আমিও দিয়ে দেবো কোন ত্যাড়া উত্তর কোন, তা হলেই তো হলো।
এয়ারপোর্টে লোকসমাগম কম থাকায়, আর এ মুহূর্তে এয়ারপোর্টে, কিছুক্ষণ পর পর একঘেয়ে নারী কণ্ঠের ঘোষণা দেয়ার ব্যাপার না থাকায়, এই এয়ারপোর্ট বিল্ডিংয়ের এই অংশটা খোলামেলা থাকলেও, বেশ কিছুটা দূর থেকে অভ্রর গলা চিৎকার করে ডাকা গলার আওয়াজ মৃদুভাবেই কানে লাগলো তখন। তাড়া দিচ্ছে ও আমাদেরকে দ্রুত হাঁটার জন্য । ম্যাকে পৌঁছানর তাড়া তো, ওরই বেশী । ভেতরের টগবগ টেনশনের ভেতরে পুত্রদের দিকে অবচেতনভাবে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখার কারণে, দূর থেকে দেয়া, চায়নার বাতাসে ভেসে আসা অভ্র র বাংলা তাড়া “বাবা বাবা তাড়াতাড়ি আসো তোমরা” । কানে এসে পৌঁছাতে ভুল করলো না।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগঠক

x