দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ধু ধু করছে আরবের মরুভূমি। সংযুক্ত আরব আমীরাতের দুবাই শহরের উপকণ্ঠের এই মরুভূমির দিকে তাকিয়ে অন্তর হু হু করে উঠছিল। কত বড় দুনিয়া! কত বিশাল এই দুনিয়ার নানা কিছু! সাহারা মরুভূমি দেখেছি মিশরে। দিগন্ত বিস্তৃত সেই মরুভূমির যেন শেষ নেই। একইভাবে দুবাইর মরুভূমিও যেন পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। যতদূর চোখ যায় ধু ধু করছে বালু। অথচ সাহারার সাথে এই মুরুভূমির কোন যোগসূত্র নেই। নেই কোন যোগাযোগও। তবে কী নিদারুণ মিল! দুই মরুভূমিই খাঁ খাঁ করছে। দুই মরুভূমিতেই পুড়ছে পৃথিবী। দুই মরুভূমিতেই রয়েছে বালু। খালি চোখে দেখা না গেলেও আশে পাশে প্রচুর মিহি বালু উড়াউড়ি করছে। পায়ের তলায়ও তপ্ত বালি। কাঁটাজাতীয় গাছের হালকা ঝোঁপঝাড় মরুর বুকে থাকলেও তাতে জীবনের কোন চিহ্ন আছে বলে মনে হচ্ছিল না।
দুবাই শহরের উপকণ্ঠের এই মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী যদি এরূপ মরুভূমি হয়ে যেতো তাহলে মানুষের কী হতো! জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে দেশে মরুকরণের যেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে! দেশে দেশে সীমানা থাকলেও জলবায়ুর কোন সীমানা নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের জন্য পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন হয়না। বিমানের টিকেটের জন্যও তা অপেক্ষা করেনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ধকল শুধু একদেশকেই নয়, সব দেশকেই নানাভাবে সামলাতে হয়। সেই সামলানোর ক্ষেত্রে মানুষের সীমাবদ্ধতা পৃথিবীকে মারাত্মক এক সংশয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। বিশ্বমান থেকে বহু কিছুতেই পিছিয়ে রয়েছি আমরা। অনেক কিছুর সংকট আমাদের। কিন্তু এত ‘নেই’র মাঝেও আমাদের মাথার উপরের সূর্য অনেক বেশি সহনীয়। পায়ের নিচে এখনো ‘নরোম’ মাটি আছে। এ যে কত বড় সান্ত্বনা তা এই মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম আমি।
ডেজার্ট সাফারি করার জন্য মরুভূমিতে যাচ্ছি আমরা। আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি নিশান পেট্রোল এবং প্রাডো জীপ ফোঁস ফোঁস করছে। চার হাজার সিসির জীপ। প্রতি জীপে আমরা চার জন করে বসেছি। আমাদেরকে নিয়ে মরুভূমির উপর দিয়ে এই গাড়ি ফোর হুইল গিয়ার লাগিয়ে ছুটবে। এটিই নাকি সাফারি! ডেজার্ট সাফারি!
সংযুক্ত আরব আমীরাতের সাতটি দেশেই ডেজার্ট সাফারি অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতিটি দেশেই এই সাফারির ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজে এই সাফারির টিকেট কেনা যায়। নানা অংকের টাকায় টিকেট কেনা যায়। ৭০ দিরহাম থেকে ২৫০ দিরহাম (১৬শ’ টাকা থেকে প্রায় ছয় হাজার টাকা) পর্যন্ত নানা দামের প্যাকেজ পাওয়া যায়। গাড়ির মান, খাওয়ার মান, বিনোদনের মান প্রভৃতির উপর সাফারির টিকেটের দাম নির্ভর করে। আবার ডিনার থাকা না থাকার উপরও নির্ভর করে টিকেটের দাম।
আমাদের জন্য অথেনটিক ট্যুরিজমের লায়ন আনোয়ারুল আজিম কি টিকেট কিনেছেন তা জানিনা। আমাদের পুরো প্যাকেজের মধ্যেই এই টিকেট অন্তর্ভুক্ত। এতে করে আমাদেরকে আলাদা করে টিকেট কিনতে হয়নি। যা করার ট্যুর অপারেটরই করেছেন। আমরা শুধু গাড়িতে উঠে বসে আছি। গাড়ি ফোঁস ফোঁস করছে।
আরব্য ঢঙ্গে জোব্বা এবং মাথায় গোলাকার চাকতির ভিতর পাকড়ি পরিহিত বাঙালি যুবক আমরা তৈরি আছি কিনা জানতে চাইলেন। লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছিল। তৈরিতো আছি। নিশান পেট্রোল জীপের পেছনের সিটেও বেল্ট বেঁধে বসেছি। আর কি করতে হবে। বাঙালি যুবক হাসলেন। হাসিটি কী একটু অন্যরকম!
হঠাৎ চলতে শুরু করলো গাড়ি। স্বাভাবিকভাবেই চলছে। দ্যুত, এত ভয়ের কি ছিল! আমরা রাস্তায় গাড়ি চালাই, আর এরা মরুভূমিতে চালাচ্ছে। আমাদের কম সিসির গাড়ি এখানে নামলে আটকে যাবে, উঠতে পারবে না। এগুলো বেশি সিসির শক্তিশালী ফোর হুইল গাড়ি, তাই বালুর উপর দিয়ে চলছে। আমাদের সামনে আরো কয়েকটি প্রাডো, নিশান পেট্রোল। সবগুলোই একই নিয়মে এগুচ্ছে।
একেবারে আচমকা একটি চক্কর দিয়ে সামনের গাড়িটা ধুলোর ঝড় তুললো। শুধু ধুলোর কুন্ডলী দেখছিলাম। ওই কুন্ডলীর ভিতর যে আস্ত একটা গাড়ি আছে তা বুঝা যাচ্ছিল না। ওটার দিকে তাকিয়ে ভিমরি খাওয়ার আগেই চক্কর মারলো আমাদের ড্রাইভার। কিছু বুঝে উঠার আগেই এমন করে গতি বাড়িয়ে ছুটতে লাগলো যে, কলজে ধুক করে উঠলো। শক্ত করে গাড়ির ডেক্সবোর্ডে হাত রাখলাম আমি। চোখ বন্ধ না করে খোলা রাখলাম। আগের গাড়িটির পথ অনুসরণ করে চলছি আমরা। তবে সেটি আমাদের থেকে অনেক দূরে। ওখানে গাড়ি নয়, ধুলোর কুন্ডলি বলে দিচ্ছিল যে আমাদের আগের গাড়িটি সামনে সমানে ছুটছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের সামনের দিকে সবকিছু দেখা গেলেও পেছনে ছিল ধুলোর ঝড়। আমরা পেছনে কিছুই দেখছিলাম না। চার হাজার সিসির নিশান পেট্রল জিপ কখনো সমতল মরুভূমি আবার কখনো বালুর ঢিবি। কখনোবা উঁচু-নিচু বালিয়াড়ির উপর দিয়ে এমন ভাবে ছুটছিল যে, বুকের সব রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পড়তে পড়তে বেঁচে যাচ্ছিল গাড়ি। কখনো একাৎ হয়ে যায়তো কখনো অন্যকাৎ। চালক ইচ্ছে করেই যেন বেছে বেছে বালিয়াড়ির উপর দিয়ে, পাশ দিয়ে ছুটছিল। আমরা ভিতরে সমন্বয়ে চিৎকার করছিলাম। উটের জকি নাকি যত কান্না করে উট ততই জোরে ছোটে। এখানেও মনে হলো একই অবস্থা। আমরা নিজেদের জকির ভূমিকায় আবিষ্কার করছিলাম। আমরা যতই হৈ হৈ করে চিৎকার করছি, চালক ততই বালিয়াড়ি ডিঙ্গাচ্ছিলেন। ততই বালিয়াড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ছিলেন। মরুর বুকে ঝড় তুলে গাড়ি চালানোর কথা শুনেছিলাম, কিন্তু তা যে এত ভয়ংকর তা কোনদিন কল্পনাও করিনি। বেশ কিছুক্ষণ ছুটলো আমাদের গাড়ি। কোথায় থেকে কোথায় আসলো তা বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে ধু ধু মরুভূমি। পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিন জুড়ে শুধু বালু আর বালু। বালুর পাহাড়।
আমাদেরকে এক জায়গায় নামানো হলো। অনেক গাড়ি থেমে আছে ওখানে। আরো বহু লোকজনও। আমাদের পরাণে পানি আসলো এই ভেবে যে, হারিয়ে যাইনি। যেভাবে মুরুর বুক ধরে ছুটেছি তাতে ঠিকমতো জায়গা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। একবার হারিয়ে গেলে এখানে নিজেকে আবার অন্যদের সাথে মিলানো যে কী পরিমাণ কষ্টকর তা ভাবতেও ভয় লাগছিল। সাগরের যেমন কোন দিক থাকে না, ঠিক তেমনি এখানেও কোন দিক নেই। চারদিকে শুধু ধু ধু বালু।
বালুর একটি পাহাড়ের পাদদেশে সমতল একটি জায়গা। সেখানে পাটকাঠির মতো কিছু একটি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তারা বলছেন রিসোর্ট। অদ্ভুদ টাইপের এই রিসোর্ট। কুঁড়েঘরের মতো সব আয়োজন। তেল পাওয়ার আগে মরুর বেদুইনেরা যেভাবে দিন কাটাতেন ঠিক সেই ধরনের আয়োজন বলেও আমার মনে হচ্ছিল। রিসোর্টে প্রবেশের জন্য ছোট্ট একটি পথ রাখা হয়েছে। আমাদেরকে ভিতরে যাওয়ার জন্য পথ দেখিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু আমার বাইরের জগতটিকে একটু ভালো করে দেখে নেয়ার ইচ্ছে করছিল। বেশ সুনসান মরুভূমি। বালু ছাড়া আর কিছুর চিহ্ন নেই। সন্ধ্যা নামি নামি করছে। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টাচ্ছে সূর্য। একই সাথে রঙ পাল্টে যাচ্ছে পুরো মরুভূমির। রঙ পাল্টে যাচ্ছে বালুর পাহাড়ের। সমুদ্রে সূর্যাস্ত অনেক দেখেছি। বহুভাবে দেখেছি। কিন্তু মুরুভূমিতে সূর্যাস্ত! সত্যিই এক মোহনীয় পরিবেশ ছড়িয়ে গেল পুরো মরুভূমি জুড়ে। সৃষ্টির সবকিছুর যে একটি সৌন্দর্য আছে তা এই মরুর সূর্যাস্ত আমাকে যেন শিক্ষা দিল। কি অদ্ভুদ এক শূন্যতা চারদিকে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। ডুবে যাচ্ছে দোর্দন্ড প্রতাপের সূর্য। দিনভর ৪৫/৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছড়ানো দাপুটে সূর্যকে কী যে অসহায় লাগছিল! আহা, কত মানুষও যে এভাবে অসহায় হয়ে যায়!!
রিসোর্টের দরোজার পাশেই দুইটি উট রাখা হয়েছে। উটের পিঠে চড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। রয়েছে আরবের লোকদের মতো মাথায় পাগড়ি জড়িয়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা। আমাদের কেউ কেউ কৃত্রিম আরব্য যুবক সেজে উটে চড়লেন। কেউবা ছবি তুললেন। তবে উটের পিঠে চড়া কঠিন একটি কাজ। এই কাজ থেকে বরাবরই দূরে থেকেছি আমি। এই মরুর বুকেও মরুর জাহাজে চড়ার সাহস করতে পারলাম না। উটের পাশ দিয়ে একটু এগুলেই রিসোর্টে প্রবেশের ছোট্ট পথ। ওই পথ দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই আলাদা একটি জগত। বড়সড় একটি উঠোন। উঠোনের চারপাশে পাটকাঠি টাইপের ওই বেড়ার উপরে খড়কুড়ো দিয়ে তৈরি করা ঘর। বিভিন্ন সাইজের কক্ষ। বেশ বড়সড় এলাকা। ঘরও অনেকগুলো। মাঝখানে মঞ্চের মতো। চারপাশের ঘর থেকে মঞ্চটি সমানভাবে দেখা যাচ্ছিল। ঘরের ফ্লোরে বালির উপর মাদুর। মাদুরের উপর প্লাস্টিক কার্পেট। প্রতিটি কক্ষে কয়েকটি করে কোল বালিশ। কোন কক্ষেরই দরোজা নেই। সামনের পুরোটাই খোলা। তিন পাশে পাটকাঠি টাইপের ঘেরা থাকলেও সামনের খোলা অংশের সামনেই মঞ্চ। বেশ আয়েশ করে বসার ব্যবস্থা। কোল বালিশ এবং পাশ বালিশ রয়েছে অনেকগুলো। রয়েছে হেলান দেয়ার আঞ্জামও। কয়েকটি কক্ষে সিসাও দেয়া হয়েছে। হুক্কার মতো সিসা টানার ব্যবস্থা। রয়েছে চা কফি। গাওয়া নামের এ্যারাবিয়ান কফি এবং খেঁজুরও রয়েছে। স্যান্ডউইচ এবং শর্মা টাইপের খাবারও রাখা হয়েছে একটি টেবিলে। সেখান থেকে যার যত খুশী নিচ্ছে। খাচ্ছে। আমাদের কেউ কেউ সিসা নিয়ে বসেছেন। কেউবা গাওয়া আর খেঁজুর নিয়ে। কারো কারো হাতে শর্মা। বেশ জমজমাট এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে তীব্র আলো পড়লো। বৈদ্যুতিক আলো। আর ঝলমলিয়ে উঠলো পুরো মঞ্চ। বালির স্তুূপের উপর কিছু একটা দিয়ে মঞ্চটিকে জাতে তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই মঞ্চে বেলি ড্যান্সের জমকালো এক প্রদর্শনী করা হলো। বেলি ড্যান্সের মেয়েটি কলের পুতুলের মতো নাচলো। মানুষের শরীরকে বাঁকানোর ব্যাপারে যত ধরনের কল্পনা করা যায় তার সবগুলোই তরুণি বাস্তবে করে দেখালো। আমাদের রিসোর্টের মঞ্চের ড্যান্স শেষ করে মেয়েটি দ্রুত পাশের অন্য একটি রিসোর্টে গেল। সেখানেও মেয়েটি একইভাবে অনেকক্ষণ ধরে নাচলো। তরুণী বিদায় হওয়ার পর এক যুবক মঞ্চে আসলো। আগুন নিয়ে কত ধরনের কসরত যে যুবকটি করলো! আরো অনেকক্ষণ নানা আয়োজনে আমাদের মুগ্ধ করে রাখা হলো। ইতোমধ্যে ডিনার সার্ভ করা হয়েছে আমাদের। বিরিয়ানি এবং রুটিসহ নানা খাবারে আমাদের ডিনার সাঙ্গ হলো। ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। কলজে মোচড়ে উঠলো। আবারো কী রোলার কোস্টারের মতো দোল খাবে আমাদের গাড়ি। না, আশ্বস্ত করা হলো যে, ওই সব আর হবে না। ডেজার্ট সাফারি শেষ হয়েছে। এখন আমরা স্বাভাবিক নিয়মে স্বাভাবিক গতিতে ফিরবো। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x