দুই চোখে আলো নেই, লাকী জ্বালাবেন শিক্ষার আলো

নেজাম উদ্দীন আবির | বৃহস্পতিবার , ১৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

দুই চোখে আলো নেই। নিজের হাতে লিখতে পারে না। পরীক্ষার হলে তাই ভরসা করতে হয় শ্রুতিলেখকের ওপর। পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত ব্রেইল বইও সবসময় মেলে না। একবার শ্রুতিলেখক না পাওয়ায় সব পরীক্ষায় অংশও নিতে পারেনি। এত প্রতিকূলতার পরও থেমে থাকেনি ফটিকছড়ির লাকী আক্তার। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩ দশমিক ৬১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে লাকী। এখন তার স্বপ্নউচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষক হওয়া।

চট্টগ্রাম নগরের হামজারবাগের রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় লাকী। বিদ্যালয়টির ৮ শতাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ছিল ৯ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭ জন। আর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে লাকী।

ফল প্রকাশের পর লাকীর মুখে ফুটে ওঠে সাফল্যের হাসি। চোখে পৃথিবীর আলো না থাকলেও কণ্ঠে ছিল জয়ের আনন্দ। কারণ তার এই ফল শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অভাব আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইও। লাকী বলে, চোখে দেখতে না পেলেও পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন সবসময় ছিল। অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি। সামনে আরও পড়তে চাই। ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হতে চাই।

লাকী নিজের হাতে লিখতে পারে না। তাই পরীক্ষায় তার প্রয়োজন হয় শ্রুতিলেখকের। কিন্তু উপযুক্ত শ্রুতিলেখক পাওয়া তার জন্য বরাবরই কঠিন। গত বছর শ্রুতিলেখক না পাওয়ায় সব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এবার একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্রুতিলেখক হিসেবে পায়। নবমদশম শ্রেণির বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিয়ে সেই শিক্ষার্থীর ওপর ভরসা করেই পরীক্ষায় বসতে হয়েছে তাকে।

লাকীর ভাষায়, আমার শ্রুতিলেখক যদি আমার সমসাময়িক কোনো শিক্ষার্থী হতো, তাহলে হয়তো প্রশ্ন বুঝিয়ে দেওয়া ও উত্তর লেখার ক্ষেত্রে আরও সুবিধা হতো। ফলাফলও হয়তো আরও ভালো হতে পারত। তারপরও আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি, আমি পাস করেছি।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও লাকীর কাছে প্রয়োজনীয় সব বই ছিল না। কখনো দুএকটি পুরোনো ব্রেইল বই পেয়েছে, আবার অনেক সময় সেটুকুও জোটেনি। ফলে শুনে শুনেই পড়া আয়ত্ত করতে হয়েছে তাকে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবারের ওপর পড়েছে বাড়তি আর্থিক চাপ। শ্রুতিলেখকের খরচসহ এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য এই অর্থও কম নয়।

রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার নাম জেবুন নিছা খানম বলেন, লাকী অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সে যেভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে, তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার। তার এই ফলাফলে আমরা গর্বিত। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা সবসময় তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবেএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

চট্টগ্রাম নগরের শাহজাহান হাউজিং সোসাইটির একটি সংগঠন পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান ‘অপলা সুইট হোমে’ থাকে লাকী। এখান থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে সে। লাকীর পাশে রয়েছেন তাঁর বোন মরিয়ম আক্তার। তিনিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করছেন। দুই বোনের পথচলায় প্রতিকূলতা থাকলেও শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহই সবচেয়ে বড় শক্তি।

রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কয়েক কদম এগোলেই শাহজাহান হাউজিং সোসাইটি। সেখানকার ‘অপলা সুইট হোম’ থেকে প্রতিদিন নতুন স্বপ্ন নিয়ে পথচলা লাকীর। চোখে আলো না থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্নে কোনো অন্ধকার নেই। এসএসসিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৬১ তার সেই স্বপ্নযাত্রারই আরেকটি উজ্জ্বল ধাপ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান সবুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
পরবর্তী নিবন্ধচুয়েটে পুকুরে ডুবে আবারও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু