দুই চাকায় বাদাবনের সমীপে

বাবর আলী | সোমবার , ৪ এপ্রিল, ২০২২ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

পর্ব-৮
খানিক বাদেই আমাদের কাঠিযোদ্ধা একজন বাড়লো। স্থানীয় এক লোক বাজার করে ফেরার পথে বাড়িয়ে দিলেন সাহায্যের হাত। উনি সজোরে কাঠি করাতে কাজের গতি বেড়ে গেল বহুগুণ। মিনিট পনেরো বাদে কাদার অংশটুকু পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে স্বস্তি। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে এই রাস্তার আলাদা কোন নাম জানতে পারিনি। কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে এই রাস্তা ‘কাঠিমারা সড়ক’ হিসেবেই জ্বলজ্বল করবে! রাস্তার শুকনো অংশে উঠতেই সূর্য আর মেঘের খেলায় সূর্য বাজেভাবে হেরে গেল। চারপাশ কাঁপিয়ে বেশ একটা ঠান্ডা হাওয়া উঠতেই আবার সাইকেলে চাপলাম আমরা। খানিক বাদেই ইটের সলিন রাস্তা পাওয়া গেল। বেশ প্রশস্ত বলাই যায়। পথচলতি এক মহিলা প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘অপরিচিত মেহমান, কারা এরা?’ আরেকজন পাশেরজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি হানতে হানতে বললেন, ‘বল দিখি, কোন সংস্থার লোক এরা?’ এইসব প্রশ্নে কান পাততে পাততেই সোরা।
গাবুরা ইউনিয়নের সোরাতেই বাড়ি সুন্দরবনের বিখ্যাত শিকারী পচাব্দী গাজীর। তার বাপ-চাচাও ছিলেন ডাকাবুকো শিকারী। পিতা মেহের গাজী এবং চাচা নিজামদি দুইজনেই ছিলেন মানুষখেকো বাঘ শিকারে কিংবদন্তি। পিতামহ কিনু গাজীও শিকার করেছেন অনেকগুলো মানুষখেকো। বনের বাঘ কোন কারণে মানুষখেকো হয়ে উঠলেই ডাক পড়ত পচাব্দীর। মৌয়াল আর জেলেদের কাছে আতংক হয়ে উঠা বাঘ শিকার করে স্বস্তির বাতাস ছড়াতেন পচাব্দী। সোরা হয়ে চাঁদনিমুখা বাজার। খোলপেটুয়া নদী তীরবর্তী এই বাজারটা বেশ জমজমাট। এরপর থেকে রাস্তা সরু। আদিতে এই রাস্তা ছিল বিপুলা। শেষাংশে একেবারে তন্বী তরুণীর মতো রাস্তা আর বাঁক। খানিক এগোতেই একেবারে গামলা ঢালা বর্ষণ শুরু হলো। একটা দোকানের সামনে সাইকেলগুলো রেখে ওই দোকানেই সাজিয়ে রাখা মুড়ি-চানাচুর মাখিয়ে ঝালমুড়ির আয়োজন করে ফেলা হলো। দোকানীকে ফুঁসলিয়ে পাশের বাড়ি থেকে একটা গামলাও আনার ব্যবস্থা করলেন তানভীর ভাই। ঝালমুড়ি পর্বের পরও বৃষ্টি ধরে না আসায় দোকানের পাশের ছাউনি দেয়া ফাঁকা জায়গাটায় এক দান ক্যারমও খেলে ফেললাম।
খানিকবাদে গামলা ঢালা বর্ষণ টিপটিপ বৃষ্টির রূপ নিতেই আবার সাইকেলে। এইদিকের রাস্তা অসম্ভব সরু। দুইটা সাইকেল পাশাপাশি চলতে পারে না। রাস্তার দুই পাশের জলাভূমিতে প্লাস্টিকের কালো বঙে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে। কাঁকড়াকে বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক রন্ধনশিল্পী। জলাশয়ে ঝরে পড়া পাতাকে ছোট অংশে ভাগ করে মীনকুলের অন্য সদস্যদের খাবার যোগান দেয় সে। বেশ অনেকগুলা কাঁকড়ার প্রজেক্ট দেখলাম পরপর। এইসব প্রজেক্টে কাঁকড়াদের জীবন সঙ্গীহীন। একটা বাঙে একটাই কাঁকড়া। বিশাল জলাশয়ের পানিতে আবাস হলেও তার অবাধ বিচরণের সুযোগ নেই এইখানে। ততক্ষণে বৃষ্টির মাত্রা বেড়েছে আরো। সাইকেলের চাকার নিচে কাদা আর মাথার ওপর বাজেরকমের বৃষ্টি। তার উপর আছে সরু এই রাস্তার অসংখ্য বাঁক। সবমিলিয়ে একেবারে নাস্তানাবুদ অবস্থা সবার। বারকয়েক আছাড় খেতে খেতে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়ে পৌঁছে গেলাম ডুমুরিয়া বাজারে। রাবাত ভাইয়ের চেহারা ততক্ষণে ঝড়ে পড়া বকের মতো হয়ে গিয়েছে। দ্বীপান্তরিত হওয়ার পর রবিনসন ক্রুসোও সম্ভবত এতটা বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলেন না! এর মধ্যে ভদ্রলোককে মনে করিয়ে দিলাম, গরীবের গাড়ি সাইকেলই এইসব রাস্তায় ভালো!
ডুমুরিয়া বাজারে আবারো খেয়া পারাপার। ঝুম বৃষ্টি নামায় প্রথমে ওপারে কেউ যেতে চাচ্ছিল না। আমরা মাঝিদের কথাবার্তার খেই ধরে থাকলাম। গুরুদেব শিবরাম চক্রবর্তী বলে গিয়েছেন, ঠিকঠাক কথাবার্তার খেই ধরে থাকতে পারলে খেয়া পার হওয়া যায়। আকাশের অঝোরধারা একটু ক্ষান্তি দিতেই পার হলাম খোলপেটুয়া নদী। এই নদীই পেছনে গিয়ে মিলিত হয়েছে আড়পাঙাশিয়ার সাথে। গাবুরা ইউনিয়ন নামক দ্বীপটাকে চারপাশ থেকেই ঘিরে রেখেছে মোহনীয় সব নদী। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া আর আড়পাঙাশিয়া। হাতের বামে দৃষ্টিসীমায় মোহনীয় সুন্দরবন। কি ঘন বন! দেখেই মনে প্রশান্তি আসে। খেয়া নামিয়ে দিল যে ঘাটে, তার নাম নীল ডুমুর। ঘাট লাগোয়া ছাপড়া ভাতের হোটেলে দুপুরের খাবার সারলাম দাতিনা কোরাল মাছ দিয়ে। ঘাট লাগোয়া দোকান দেখে ভেবেছিলাম, মীন প্রজাতির অন্য কোন সদস্যকে পাতে তোলার সৌভাগ্য হবে। খোলপেটুয়া নদী থেকে সমুদ্রের দূরত্ব এমন বেশি কিছু নয়। স্বাদু আর নোনা পানির মিশ্রণ থাকায় এই জায়গায় নানান প্রজাতির মাছের বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়াতে দাতিনা কোরাল বাদে আর কিছু মিলল না। অবশ্য দাতিনা কোরালও খেতে ভালোই। ইতিমধ্যে আবারো ঝুম বৃষ্টি নামায় আরো কিছুক্ষণের জন্য আটকা। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও বৃষ্টির পানি না কমায় আমরা চা-পানির দিকে মনোযোগ দিলাম। বৃষ্টি দেখেই সবার কফি-কাতরতা জেগে উঠায় সেটা দিয়েই গলা ভেজানো হলো। আরও সময় নষ্ট হবার ভয়েই ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চালানো শুরু।
বাজারের শেষ মাথায় বছরের এই সময়েও হালখাতার সাইনবোর্ড দেখা গেল। এর পেছনের কারণ অবশ্য কিছুটা করুণ। দোকানী ক্রেতাদের কাছ থেকে বাকি টাকা উঠানোর জন্যই বছরে দু-তিনবার আয়োজন করে এই হালখাতার। এতে যদিও ক্রেতাদেরকে মিষ্টিমুখ করানো বাবদ কিছু খরচা হয়। কিন্তু পাওনা টাকা উদ্ধার বাবদ এইটুকু করতেই হয়৷ বুড়িগোয়ালিনী বাজারের শেষ মাথায় ভূমি অফিসটা পুরোপুরি গোলাকার একটা দালান। দেখে চোখের শান্তি হয় বেশ। দাতিনাখোলা পেরোতেই রাস্তার দুইপাশের ঘেরে সাদা সোনা আর কালো সোনার রাজত্ব। সাদা সোনা তথা চিংড়ির রাজত্বে অধুনা ভাগ বসিয়েছে কালো সোনা তথা কাঁকড়াও। দুটোই সমানে চাষ হয় এখন। এই রাস্তাটা বেশ মসৃণ। মাখনের ন্যায় রাস্তার কারণে বৃষ্টিটা হুজ্জত বয়ে আনার চেয়ে উপভোগ্যই মনে হচ্ছে। কলবাড়ি বাজারের কাছে চুনা নদী পেরিয়ে মুন্সিগঞ্জ বাজারে। এই মুন্সিগঞ্জেই দেশের অন্যতম সুন্দর নামের নদীর দেখা পেলাম। নদীর নাম মালঞ্চ। ফুলের বাগানের নামে নদীর নাম রাখার আইডিয়া কার মাথায় এসেছিল কে জানে! আরো খানিকক্ষণ প্যাডেল মেরে পৌঁছে গেলাম সুশীলন নামক এনজিওর ব্যঘ্রতট নামক ভবনে। আগের দুই রাত সাইক্লোন সেন্টার আর নৌকায় কাটানোর পরে শরীর একটু আরাম চাচ্ছিল। অবশ্য এখানে আসার আগে নিজেদের পকেটের রেস্তের অবস্থা দেখে নিয়েছিলাম। খরচ অবশ্য এমন বেশি কিছু না। রিসোর্টটা বেশ সাজানো-গোছানো। একটু দূরেই বিশাল এক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মীয়মাণ। ছাদে দাঁড়ালেই সুন্দরবন দেখা যায়। এই রিসোর্টের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা অবশ্য এর বাঁধানো পুকুর পাড়। ছাতিম গাছের সাদা ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে ঘাটজুড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাদা ধবধবে চাদর বসিয়ে দিয়েছে কেউ। বেশ খানিকক্ষণ জলকেলি করে রাবাত ভাইকে পাঠিয়ে দেয়া হলো মুন্সিগঞ্জ বাজারে। তার উপর দায়িত্ব বর্তেছে আজ রাতে সবাইকে এই অঞ্চলের সিগনেচার অমেরুদন্ডী প্রাণী তথা চিংড়ি খাওয়ানোর।