‘চিরদিনের গান’ সুরের আলোয় অন্ধকার কাটার গল্প

রোকসানা বন্যা | সোমবার , ১৫ জুন, ২০২৬ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

২২ মে, থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সেই সন্ধ্যাটি কেবল একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান ছিল না, বরং ছিল নস্টালজিয়ার এক বিশাল ক্যানভাস। হলরুমটি কেবল দর্শক বা শ্রোতায় পূর্ণ ছিল না, বরং তা কানায় কানায় ভরে উঠেছিল।

সেখানে যেন জমা হয়েছিল হাজারো স্মৃতি। বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী শাহরিয়ার খালেদের কণ্ঠে যখন ‘চিরদিনের গান’এর সুরগুলো ডানা মেলছিল, তখন পুরো হল যেন এক টাইম মেশিনে চড়ে মুহূর্তের মধ্যে ফিরে গিয়েছিল ফেলে আসা সেই সোনালী অতীতে, যেখানে প্রেম ছিল স্নিগ্ধ, আর আবেগের ভাষায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না।

রাতের নিস্তব্ধতা যখন ১০টার কাঁটা পেরিয়ে গভীরের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখনও দর্শকদের চোখেমুখে ছিল এক অপার্থিব তৃপ্তি। কেউ নড়ছিলেন না, যেন এক অলিখিত সম্মোহনে পুরো হলবন্দী মানুষগুলো নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিল বাংলা গানের সুবাসে, হিন্দি গানের গভীরতায় কিংবা গীত আর গজলের সেই সূক্ষ্ম কারুকার্যে। সময় যেন এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল শাহরিয়ার খালেদের সুরের মূর্ছনায়।

বর্তমান পৃথিবীর চারপাশের এই অস্থিরতা, মানুষের মনের গহীনে জমে থাকা প্রতিশোধের জ্বালা আর সামাজিক বিষণ্নতার ধূসর মেঘ যখন আমাদের ঘিরে ধরছে, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে শাহরিয়ার খালেদের এই সুরের আয়োজন ছিল তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টির মতো। গান তো কেবল শব্দ আর সুরের সমন্বয় নয়, গান হলো সেই জাদুকরী অস্ত্র, যা মানুষের হৃদয়ের সমস্ত কলুষতা ধুয়ে মুছে দিতে পারে। এই বিষণ্ন সময়ে সুরের এমন আয়োজন যেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রার এক নতুন দিশা দেখালো, আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, পৃথিবীটা এখনও সুন্দর, যদি আমরা কেবল সুরের সেই ভাষা বুঝতে শিখি।

গান তো আসলে শুধু সুর বা শব্দ নয়, গান হলো সময়ের এক একটি ‘ক্যাপসুল’।

সেদিনের পরিবেশিত প্রতিটি গানই ছিল এক একটি মণিমুক্তো, যা শ্রোতাদের মনের গহীন কোণে সঞ্চিত অনুভূতির আলমারি খুলে দিয়েছিল। কোনো গানের সুরে ছিল বিরহের মৃদু ঝংকার, কোনোটিতে ছিল আশার নতুন প্রদীপ। প্রতিটি সুরের কম্পনে পুরো হল যেন এক অদ্ভুত মায়াজাল বা মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সেই মায়া কাটানো দায়, সেই রেশ রয়ে গেল বহুদিন। কারণ গান তো আসলে চিরদিনের, আর সেই “চিরদিনের গান”ই আমাদের নতুন করে বাঁচতে শেখায়।

শাহরিয়ার খালেদের কণ্ঠে এই গানগুলো শুধুমাত্র কিছু সুরের সমষ্টি ছিল না, এগুলো ছিল স্মৃতির অ্যালবামে জমে থাকা ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বেঁচে ওঠার এক একটি অধ্যায়।

আমরা যখন কোনো গান শুনি, সেই গানের সুর মুহূর্তের মধ্যে আমাদের মস্তিষ্কের সেই গোপন কুঠুরিতে পৌঁছে দেয়, যেখানে আমরা আমাদের পুরনো দিনগুলোকে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি। গানের সেই সুরের রেশ ধরেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু আগে ফেলে আসা কোনো এক বৃষ্টির বিকেল, কোনো এক মানুষের মুখ, কিংবা কোনো এক অবেলার দীর্ঘশ্বাস।

যে গানগুলোর কথা এখানে বলা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিই মানুষের জীবনের কোনো না কোনো গভীর অনুভূতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

​ “তোমারে লেগেছে এত যে ভালো”

প্রথম ভালোবাসার অনুভূতিগুলো সাধারণত বয়ান করা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। এই গানটি সেই অব্যক্ত অনুভূতিরই দলিল। এখানে ভালোবাসার কোনো দাবি নেই, কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক নির্মল সমর্পণ। খালেদ ভাইয়ের কণ্ঠে যখন এই সুর ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন সেটি যেন এমন এক আয়না হয়ে উঠেছিল যেখানে প্রতিটি শ্রোতা তাদের কৈশোরের বা তারুণ্যের সেই পবিত্র মুহূর্তগুলোকে দেখতে পাচ্ছিল। এটি শেখায় যে, কাউকে ভালোবেসে তার ভালো থাকাটুকুতেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার চেয়ে বড় তৃপ্তি আর নেই।

​ “বাচপান কি মহব্বত কো”

শৈশবের প্রেম বা ভালোলাগা হলো বাতাসের মতো হালকা, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে প্রবেশ করি, যেখানে হিসেবনিকেশের বেড়াজালে সরলতা হারিয়ে যায়। এই গানটি যখন গীত হচ্ছিল, তখন তা যেন হৃদয়ের গভীরে জমাট বেঁধে থাকা শৈশবের সেই নিষ্কলুষ আবেগগুলোকে গলিয়ে দিচ্ছিল। এটি কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জীবনের ফেলে আসা সেই সহজসরল দিনগুলোর কাছে ফেরার এক ব্যাকুল আর্তি।

​“আকেলে না যানা হামে ছোড়কার তুম”

মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন সে নিজের চেয়েও প্রিয়জনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এই গানের প্রতিটি শব্দে এক ধরণের গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করে। প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ের চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কিছু হতে পারে না। যখন এই গানটি পরিবেশিত হচ্ছিল, তখন হলের প্রতিটি শ্রোতা সম্ভবত তাদের জীবনের কোনো না কোনো প্রিয় মানুষের মুখচ্ছবি মনে মনে এঁকে নিচ্ছিলেন। নিঃসঙ্গতার এই ভয়ই আমাদের শেখায় যে, সম্পর্কের গভীরতায় আমরা একে অপরের ওপর কতটা নির্ভরশীল।

​“শুধু একবার বলে যাও”

অপেক্ষা মানেই হলো সময়ের কাঁটায় নিজেকে বিদ্ধ করা। কিছু কথা বলার থাকে, কিছু অনুভূতি প্রকাশের থাকে, কিন্তু সুযোগ আর হয়ে ওঠে না। “শুধু একবার বলে যাও” গানটি সেই অমীমাংসিত অনুভূতির এক পরম করুণ আর্তি। এটি সেই মুহূর্তের কথা বলে, যখন মানুষ এক চিলতে সাহসের আশায় জীবন পার করে দেয়। এখানে আনন্দ আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মিলনের প্রতীক্ষা যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি না পাওয়ার হাহাকার হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

​ “সুহানি রাত ঢাল চুকি” এবং “গঙ্গা কী মওজ মে”।

​“সুহানি রাত ঢাল চুকি” গানটি আসলে জীবনের একটি রূপক। সুন্দর সময় চিরস্থায়ী হয় না। রাত ঢলে পড়ছে, অর্থাৎ জীবনের বসন্ত হয়তো শেষের পথে, তবুও প্রতীক্ষা ফুরোচ্ছে না। এই বিষণ্নতার মধ্যেও এক ধরণের সৌন্দর্য আছে। অন্যদিকে, “গঙ্গা কী মওজ মে” গানটি যেন প্রাণের প্রবাহের কথা বলে। জীবনের স্রোত যেমন বাধা মানে না, ভালোবাসার গতিও তেমনি। এই গানগুলো শুনলে মনে হয়, জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে ভালোবাসার যে রেশটুকু থেকে যায়, সেটাই আমাদের বেঁচে থাকার আসল প্রেরণা।

শাহরিয়ার খালেদ যখন এই গানগুলোকে সুরের মায়ায় মঞ্চে গেয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল যেন সময়ের স্রোত উল্টো দিকে বইছে। ওনার পছন্দের তালিকার প্রতিটি গানই এক একটি আবেগীয় , যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির এই যান্ত্রিক যুগেও গানের আবেদনই একমাত্র শক্তি যা মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।

মানুষ হিসেবে আমরা নশ্বর, কিন্তু একটি ভালো গান অবিনশ্বর। আমরা পরিবর্তিত হই, আমাদের চারপাশ বদলে যায়, এমনকি মানুষগুলোও দূরে সরে যায়। কিন্তু সেই গানটি থেকে যায়। এটিই হয়তো শিল্পের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সময় বয়ে যায়, কিন্তু সময়ের স্মৃতিগুলো গানের সুরে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধআকাশ অজানা তবু… খাঁচা ভেঙে উড়ে যায় পাখি