দাঁতমারা বাগানের রাবার যেভাবে পাচার করে দেয় চোর সিন্ডিকেট

মোহাম্মদ জিপন উদ্দিন, ফটিকছড়ি | বৃহস্পতিবার , ১৩ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার দাঁতমারা রাবার বাগানটি আয়তনের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ৩৪টি চোর সিন্ডিকেটের কারণে এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিণত হয়েছিল লোকসানি প্রতিষ্ঠানে। সমপ্রতি চোরাই রাবারসহ একটি ট্রাক উল্টে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে এই বাগানের ভেতরের ও বাইরের চুরির চাঞ্চল্যকর নেপথ্য কাহিনী।

ঘটনার শুরু গত সোমবার (১০ আগস্ট) রাত ১০টায়। দাঁতমারা এলাকার ঢালার মুখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২ হাজার ৮৫০ কেজি চোরাই ভেজা রাবার বোঝাই একটি ট্রাক উল্টে পার্শ্ববর্তী বিলে পড়ে যায়। সরকারি বাগান থেকে এই বিপুল পরিমাণ রাবার চট্টগ্রাম শহরে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ দাঁতমারা বাগান কর্তৃপক্ষের। দুর্ঘটনার পর চালক ও পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা যায়নি। ঘটনার রাতে উদ্ধার কাজ চালানো সম্ভব না হলেও পরদিন মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে ক্রেনের সহায়তায় গাড়িটি উদ্ধার করে ভূজপুর থানার দাঁতমারা তদন্ত কেন্দ্রে আনে পুলিশ।

এই চুরির ঘটনায় দাঁতমারা রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলার আসামিরা হলেনস্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য সুব্রত মেম্বার, আলম এবং ইসমাইল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি রাবার চুরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে দাঁতমারা বাগানের আশেপাশে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু রাবার বাগান। মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ গাছ নিয়ে গড়ে ওঠা এই ২০২৫টি ছোট ছোট বাগানের কয়েকটি মূলত চোরাই রাবার পাচারের ট্রানজিট রুট। সিন্ডিকেটের সদস্যরা সরকারি বাগানের উৎপাদিত রাবার চুরি করে এই বেসরকারি বাগানগুলোর নামে চালান তৈরি করে। ফলে অনায়াসেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার হয়ে চলে যায় চট্টগ্রাম শহর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিশাল এই বাগানে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। স্থায়ী শ্রমিকের অভাব মেটাতে দৈনিক মজুরিতে স্থানীয় অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের নিয়ম হলো, প্রতি কেজি রাবার সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তারা পারিশ্রমিক পাবেন। কিন্তু এই অস্থায়ী শ্রমিকদের একটি অংশ সংগ্রহ করা সব রাবার বাগানের গুদামে জমা না দিয়ে, কিছু বাইরে কম মূল্যে বিক্রি করে দেয়। বাগান কর্তৃপক্ষ এদের চিহ্নিত করে কাজ থেকে বাদ দিলে তারা রাতের আঁধারে বাগানে ঢুকে সরাসরি গাছ থেকে রাবার কেটে নিয়ে যায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে এই চুরি পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে দাঁতমারা রাবার বাগানের উপমহাপরিচালক (ডিজিএম) রুহুল আমিন বলেন, ‘রাবার চোরদের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী বাগানটি অনেক বছর ধরে লোকসানে ছিল। আমি এই চেয়ারে বসার পর থেকে চোরদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে যাচ্ছি। পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলেও চুরি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি। যার সুফল হিসেবে দীর্ঘ লোকসান কাটিয়ে ২৫২৬ অর্থবছরে এই বাগান থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা লাভ হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাবার চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে এই চোর সিন্ডিকেট আমাকে প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমি থানায় নিরাপত্তার জন্য জিডিও করেছি। চোর শ্রমিকদের বাদ দিলে তারা রাতে এসে চুরি করে। তবুও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আমাদের এই লড়াই থামবে না।’

স্থানীয় সাংবাদিক কাউসার সিকদার বলেন, ‘এখানে অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং একটি বিশাল সিন্ডিকেট এই চুরির কাজে জড়িত। চোরদের শেকড় অনেক গভীরে। এই রাষ্ট্রীয় সম্পদকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং অতি দ্রুত কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’ এদিকে সচেতন মহলও বলছে, পাহাড়ের এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চোর সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বাগানের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরের ৪ এলাকা থেকে ৭০০ অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ
পরবর্তী নিবন্ধডিসির গণশুনানিতে উঠে আসছে জীবনসংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন গল্প