ডা. চন্দন দাশ : বিপ্লবী মানবতাবাদী সংস্কৃতিজন

কানাই দাশ | মঙ্গলবার , ৯ জুন, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

একজন বিপ্লবী মানবতাবাদী নিছক মানুষের দুঃখেকষ্টে শুধু সমব্যথী হন না, মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে প্রচলিত অমানবিক সমাজকে তিনি আমূল পরিবর্তন করার সংগ্রামে ব্রতী হন। ডা. চন্দন দাশ ছিলেন একজন বিপ্লবী মানবতাবাদী কারণ আমৃত্যু তিনি মানব মুক্তির আদর্শিক লক্ষ্যে স্থির থেকে জীবন যাপন করেছেন। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিগত অর্ধশতাব্দীর পরিচিত মুখ, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রগতিশীল পরিবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও সেই লক্ষ্যে নিরন্তর পথ চলা এক অক্লান্ত পথিক, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, চট্টগ্রামের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ও কেন্দ্রীয় নেতা, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার অন্যতম নেতা, পেশাগত জীবনে স্বনামধন্য চিকিৎসক ও বিএমএ নেতা ডা. চন্দন দাশ গত ২৯ মে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই তিরোধানে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জগত, বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে, হঠাৎ সৃষ্ট এ শূন্যতায় অনেকেই মুহ্যমান হয়ে পড়ে।

পুরো উপমহাদেশে সমাজ ও রাজনীতিতে আজ চরম দক্ষিণপন্থী লুটেরা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রধান সহযোগী শক্তি হিসাবে ধর্মান্ধ রাজনীতির উত্থান, বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক শাসন, গণতন্ত্রহীনতা, জবাবদিহিতা বিহীন বস্তুত একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ও এরি ফলে সৃষ্ট লুটেরা অপশক্তির জবরদস্তি, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধের নামে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ক্রমে পেছনে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশে গত দুই বছর যাবত মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর অব্যাহত ও পরিকল্পিত আক্রমণ, বিরুদ্ধ অপপ্রচার, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সরাসরি সাংগঠনিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এসব কারণে যখন নতুন ভাবে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সুকঠিন সংগ্রাম, দায়িত্ব ও কর্তব্য এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তখন তাঁর মৃত্যু এই কাজকে কঠিন করে তুলেছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে রাজনীতি কখনো সঠিক পথে এগুতে পারে না যদি সেই রাজনীতি সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন হয়, শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণ হয় না তা যদি সংস্কৃতিক বিচ্ছিন্ন হয় তেমনি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্য ধরে রাখা যায় না যদি সেই আন্দোলনে সাংস্কৃতিক উপাদান অনুপস্থিত থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কেননা তার পেছনে জাতীয় সংস্কৃতির শক্তিশালী উপাদান ও আবেগ কাজ করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সংস্কৃতির শ্রেণি পরিচয় ভিত্তিক শোষণ বিরোধী মুক্তির লক্ষ্যভিসারী সংস্কৃতি ও নবতর সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে তীব্রতর করার বিপরীতে সংস্কৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার নামে কুশিক্ষা এবং এর ফলে উদ্ভূত অপসংস্কৃতি মুক্তিযুদ্ধকে বিপথে নিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাধারণ ও একমুখী শিক্ষার যে ধারা ও প্রভাব সমাজে ছিল, অসাম্প্রদায়িক সমাজ মানসের যে প্রাধান্য সমাজে ছিল সেটাই ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে ক্রমে অপ্রতিরোধ্য করে তুলে। সেই আন্দোলনের তুঙ্গে ১৯৬৯ সালে বিপ্লবী রাজনীতির স্বনামখ্যাত বুদ্ধিজীবী সত্যেন সেন, রনেশ দাশ গুপ্ত, মুনির চৌধুরী সহ আরো অনেকে এগিয়ে আসেন নবতর সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনে। প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী। এ ছিল বাঙালির সংস্কৃতির উত্তরাকাশের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।

১৯৭০ সালের দিকে চট্টগ্রামেও উদীচীর প্রতিষ্ঠা হয়। সদ্য কৈশোর পেরুনো চন্দন দাশ তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের তথা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। তিনি ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন নব গঠিত জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কাজে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর চট্টগ্রামে এ সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অগ্রজ সুভাষ দে, মৃদুল সেন, মিহির নন্দী, রবীন দে প্রমুখের সাথে জড়িয়ে পড়েন চন্দন দাশ। ১৯৭৬ সালে ডাক্তারী পাশ করে তিনি সিপিবির রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক গণসংগঠন হিসাবে উদীচী চট্টগ্রাম জেলার অন্যতম মূল সংগঠক হয়ে উঠেন। তারপর আমৃত্যু শুধু উদীচীর নেতা নন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন অপরিহার্য নেতা হয়ে উঠেন। শুধু নববর্ষ উদযাপন পরিষদ নয় একুশ উদযাপন পরিষদ, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, প্রমা, বোধন সহ আবৃত্তি সংগঠন ও অপরাপর সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহের একজন সহযোদ্ধা উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। একজন চিকিৎসক হিসাবে, তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের নেতারূপে পেশাজীবী আন্দোলনের সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পেশাগত জীবনে প্রবেশের পূর্বেই সেই ’৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে এদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক উল্টোযাত্রা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশে একটি প্রবল অথচ অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপস্থিতি পরাজিত শক্তিকে দ্রুতই সমাজে ও রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।

৮০’র দশকে ডা. চন্দন দাশদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে উদীচী পুনরুদ্যমে কাজ শুরু করে বটে কিন্তু সেই সংস্কৃতি আন্দোলন তখন নষ্ট সময়ের প্রভাবে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অনুসৃত লুটেরা রাজনৈতিক অর্থনীতির সৃষ্ট অপসংস্কৃতির প্রভাবে, শিক্ষার বিকৃতি ও বিভক্তিজাত সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার প্রবল অভিঘাতের বিপরীতে সমাজও মানুষকে উদ্দীপ্ত করার মত অবস্থানে যেতে পারেনি। সর্বোপরি বাম রাজনীতির বিভ্রান্তি, বাম গণসংগঠন সমূহের কথিত আদর্শিক বিরোধ, মার্কসীয় চিন্তার একদিকে অসারতা প্রমাণের চেষ্টা অন্যদিকে মার্কসীয় চিন্তাকে অমার্কসীয় রক্ষণশীলতার খোলসে ঢেকে পার্টির অভ্যন্তরে সৃষ্ট সংকট সংস্কৃতির সংগ্রামকে আরো দুর্বল করে ফেলে। ঠিক এ সময় কমরেড ডা. চন্দন দাশ এ সব আদর্শিক প্রতিবিপ্লবী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে পার্টিকে রক্ষার সংগ্রামে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন।

ডা. চন্দন দাশ প্রকৃত পক্ষেই ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ, নিবেদিত প্রাণ একজন বিপ্লবী মানবতাবাদী সংস্কৃতি কর্মী ও প্রগতিশীল গণআন্দোলনের সংগঠক, অন্তরে বাহিরে অনাবিল অথচ অস্থির এক পরিবর্তন কামী বিপ্লবী কর্মী পুরুষ। চাকরি এবং পেশাগত ব্যস্ততা কখনো তাঁর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তা ও কাজকে ছাপিয়ে যায়নি। ১৯৭৬৭৭ সালে দিকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও সেদিন দেশে চিকিৎসক স্বল্পতার পরিবেশে বিপুল অর্থ উপার্জনের পথে না গিয়ে প্রয়োজনের বাইরে পেশাগত ব্যস্ততায় জড়িত থাকতেন না। সময় চলে যেত উদীচী ও পার্টির কাজ ও কর্মব্যস্ততায়। সমাজে অনেকেই গুছিয়ে সাজিয়ে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলেন কিন্তু নিজের যাপিত জীবনে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। ডা. চন্দন দাশ মনে মননে, কথা ও কাজে একান্তই নিবেদিত ও আন্তরিক ছিলেন কিন্তু আদর্শিকভাবে রক্ষণশীল ছিলেন। দেশের মাটিতে জীবনের পরিসমাপ্তি টানতে ছেলেমেয়ে ও স্বজনদের বাধা সত্বেও অসুস্থ শরীরে কানাডা থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। আমাদের অনেকের কাছেই অপরিচিত এক অনাস্বাদিত বাস্তবতায় তিনি জীবনকে শেষ পর্যন্ত মানুষের মাঝেই উপভোগ করলেন। তাঁর জীবন ও বিপ্লবী প্রতীতি স্মরণে প্রদীপ্ত প্রত্যয়ে আসুন গেয়ে উঠি ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে/নতুন জীবন দাও হে’।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রকল্প-বাস্তবায়নে যথাযথ মনিটারিং দরকার
পরবর্তী নিবন্ধপুশ ইন নয়, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া মেনে চলুন