আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকান গমের দাম বেড়ে গেলেও সরকারের সাথে আগে চুক্তি থাকার কারণে টনপ্রতি প্রায় ৪০ ডলার কমে গম আসছে বাংলাদেশে। এতে শুধুমাত্র এক জাহাজ গমেই সরকারের সাশ্রয় হয়েছে ২৯ কোটিরও বেশি টাকা। সরকারের চলতি অর্থবছরের প্রথম জিটুজি চুক্তির আওতায় প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার টন গম আমদানি করা হচ্ছে। এতে সরকারের ১১২ কোটিরও বেশি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ইতোমধ্যে প্রথম চালানের ৫৮ হাজার ৩৪২ টন গম চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হয়েছে। দ্বিতীয় জাহাজটি প্রায় সাড়ে ৫৮ হাজার টন গম নিয়ে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে। একইসাথে সরকার ভিয়েতনাম থেকে এক লাখ টন চাল আমদানি করছে। দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ পর্যাপ্ত হলেও সরকার চাল ও গম আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় সরকার–টু–সরকার (জি টু জি) ভিত্তিক চলতি অর্থবছরের প্রথম চুক্তির গম আমদানি শুরু হয়েছে। চুক্তির আওতায় প্রথম জাহাজ এমভি রেড কসমস ৫৮ হাজার ৩৪২ টন গম নিয়ে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। জাহাজটির গম খালাস সম্পন্ন হয়েছে। আজ জাহাজটি নয়া গন্তব্যের পথে নোঙর তুলবে।
আমেরিকান গমের মান খুবই ভালো। পৃথিবীর অন্যতম সেরা গম উৎপাদন হয় আমেরিকাতে। বিশ্ববাজারে আমেরিকার গমের দাম সবসময় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি থাকে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকান গম প্রতিটন ৩৬০/৩৬৫ ডলারে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়ে সূত্র বলেছে, তবে বাংলাদেশ সরকার আগে চুক্তি করার ফলে প্রতি টন ৩২২ ডলারে আমদানি করার সুযোগ পেয়েছে। এতে টন প্রতি গড়ে অন্তত ৪০ ডলার সাশ্রয় হচ্ছে। সর্বমোট হিসেবে যা কোটি কোটি টাকা। এই টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হতো। এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় দেশের রিজার্ভেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর এমভি গোল্ডেন গ্লিন্ট নামের একটি জাহাজ ৫৮ হাজার ৫৪২ টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে আমেরিকা থেকে প্রথম জি টু জি চুক্তির আওতায় সর্বমোট ২ লাখ ২০ হাজার টন গম দেশে পৌঁছাবে।
অপরদিকে সরকার ভিয়েতনাম সরকারের সাথে এক লাখ টন চাল আমদানির ব্যাপারে চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভিনা ফুড আগামী মাসে এক লাখ টন চাল সরবরাহ দেয়া শুরু করবে। তবে চুক্তির শর্তানুযায়ী তারা চাইলে ভারত থেকেও এই চাল সরবরাহ করতে পারবে। দেশে চাল এবং গমের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে গতকালের হিসাবানুযায়ী ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৭ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত মজুদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। দেশে স্বাভাবিক সময়ে ১৪ লাখ টন এবং দুর্যোগ বা সংকটকালে ১৫ লাখ টনের মজুদকে নিরাপদ মজুদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে গমের মোট চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার বড় অংশ পূরণে সরকারী ও বেসরকারি খাতে বিদেশ থেকে গম আমদানি করা হয়। ইতোপূর্বে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে প্রচুর গম আমদানি করা হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে অন্তবর্তীকালীন সরকার আমেরিকা থেকে বছরে অন্তত ৭ লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে বর্তমান সরকারও আমেরিকা থেকে গম আমদানি অব্যাহত রেখেছে। দেশে গতকাল গমের মজুদ ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৩১ টন।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং সেভেন সীজ শিপিং লাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর প্রথম জি টু জি চুক্তির আওতায় দেশে গম পৌঁছার কথা স্বীকার করে বলেছেন, আগামী মাসের মধ্যে আরো অন্ততঃ তিনটি মাদার ভ্যাসেল গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। প্রথম জাহাজটির গম আজকের মধ্যে পুরোপুরি খালাস হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে ৫০ হাজার টনের একটি জাহাজ থেকে গম খালাস করতে দেড় থেকে দুই মাস লেগে যেতো। এখন আমরা মাত্র ৮/৯দিনে মাদার ভ্যাসেল খালি করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এতে গমের পরিবহন ব্যয় কমে যাওয়ায় সার্বিকভাবে দাম কমছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।











