জুম’আর খুতবা

ইসলামে কালিমা তাইয়্যিবাহ’র গুরুত্ব ও তাৎপর্য

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ

আল কোরআনের আলোকে কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ্‌:

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন, কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ হলো একটি পবিত্র বৃক্ষের মতো, এর মূল মানুষের অন্তরে। এর ফল মানুষের আমলে। দুনিয়ায় এটি মুমিনকে শান্তি ও কল্যাণের ছায়া দেয় এবং কবর ও আখিরাতে এর ফল প্রকাশ পায়। কিয়ামতের দিন এই কালিমাই নাজাতের অন্যতম প্রধান কারণ হবে। মহান আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, “আপনি কি দেখেননি আল্লাহ্‌ তাআলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেন, কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ হলো পবিত্র বৃক্ষের মত তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আসমানে। (সূরা: ইব্রাহীম, আয়াত: ২৪)

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবু বকর আল জাবির আল জাযাইরি তাঁর প্রণীত আইসারুত তাফসীর লি কালামিল আলিয়্যিল কাবীরএ বলেন, আয়াতে করীমায় কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ হলো লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। পবিত্র কোরআনে আরো এরশাদ হয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন এবং তাদের জন্য তাকওয়ার কালিমা অপরিহার্য করে দিলেন। বস্তুত তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। (সূরা সাফফাত, আয়াত ২৬)

উক্ত আয়াতে বর্ণিত “ওয়ালজামাহুম কালিমাতুত তাকওয়া” প্রসঙ্গে আল্লামা সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম তাবারী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম ছালাভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ইমাম ইবনে কাছির প্রমুখ তাফসীরকার বর্ণনা করেন, প্রখ্যাত তাবেয়ী আতা খুরাসানী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি তাক্বওয়ার বাণী তাদের উপর অপরিহার্য করে দিলেন। তিনি বলেন তাক্বওয়ার বাণী হলো “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌।” (তাফসীর দূররুল মানছুর। ৭/৫৩৭ পৃষ্ঠা, তাফসীর ইবনে কাছির। ৭/৩২১ পৃষ্ঠা, তাফসীরে কাবারী: ২১/৩১৩ পৃষ্ঠা)

হাদীস শরীফের আলোকে কালিমা তাইয়্যিবাহ: হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কথায় সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও রাসূল। নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ্ব করা এবং রমযানের রোযা পালন করা। (সহীহ বুখারী: , হসীহ মুসলিম: ১৬)

হযরত উবাদাহ ইবনু সামিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এরশাদ করতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ মর্মে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ্‌ নেই এবং নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘আল্লাহর রাসূল আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম। ২৯)

বর্ণিত হাদীস শরীফদ্বয়ে ঈমান ও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলো আলোকপাত হয়েছে। বিশেষভাবে ঈমানের পূর্ণতার অন্যতম শর্ত হিসেবে তাওহীদ ও রিসালাতের প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে। একই বিষয়ের উপর প্রসিদ্ধ হাদীসের কিতাব সমূহের মধ্যে এবং কোরআনুল করীমের আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকারদের অসংখ্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় কালিমায়ে তাইয়্যিবার অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। এতদসংক্রান্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনার লক্ষ্যে এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সময়ে ইসলামের নামে একটি শ্রেণি প্রতিনিয়ত কোরআনসুন্নাহ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে সরলপ্রাণ মুসলমানদের হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত ঈমান আক্বিদাকে বিনষ্ট করে যাচ্ছে। মুলমানদের ঈমান আক্বিদার ভিত্তি কলেমায়ে তাইয়্যিবার বিরুদ্ধেও তাদের আপত্তি ও অভিযোগ। তাদের বক্তব্য হলো লা ইলাহা ইন্নাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহএ কলেমা নাকি কোরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় নাউযুবিল্লাহ। তাদের আরো জঘন্য বক্তব্য হলো, এক পাশে আল্লাহ এবং অন্য পাশে “মুহাম্মাদ” লিখা এটা শিরক, নাউযুবিল্লাহ। এরা ক্বোরআনহাদীসের মনগড়া অপব্যাখ্যা দিয়ে ঈমানের কলেমাকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। অসংখ্য হাদীস শরীফ ও তাফসীরের কিতাব সমূহে আল্লাহর নামের পাশে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)’র নাম মুবারক উল্লেখ থাকার পরও তাদের চোখে দেখে না। এরা রিসালাতকে অস্বীকার, রিসালাতের শানে কটূক্তি করে, নবীজির শানে অবমাননা করে নিজেদেরকে তৌহিদবাদী মুসলমান দাবী করে। অথচ বর্ণিত হাদীস সহ আরো অসংখ্য হাদীস শরীফ ও মুফাসসিরদের অভিমত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দান ছাড়া কেউ কখনো ঈমানদার ও মুসলমান হতে পারে না। হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণিত হাদীসের আলোকে প্রমাণিত যে, তাওহীদ ও রিসালতের সাক্ষ্য দানই হলো ইসলামের প্রথম রুকন।

তাওহীদ ও রিসালাতে সাক্ষ্য দানকারীরা জান্নাতী: হযরত মুআয রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল সত্য চিত্তে সাক্ষ্য দিয়ে মৃত্যু বরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং২২০০৩)

সহীহ মুসলিম শরীফে কালিমায়ে তাইয়্যিবার শিরোনাম: মুসলিম বিশ্বে ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের মধ্যে মুসলিম শরীফের স্থান বুখারী শরীফের পর দ্বিতীয় নম্বরে। তিনি ২০৪ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। ২৬১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি মুসলিম শরীফে কিতাবুল ঈমানের ৮ নং অধ্যায়ে পূর্ণ কালিমাটি শিরোনাম নির্ধারণ করেছেন যা নিম্নরূপ, লোকদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করার নির্দেশ, যতক্ষণনা তারা বলে, “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। (সহীহ মুসলিম, খন্ড, পৃষ্ঠা৫১)

হযরত আবু যার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ‘নবীজির জবান মুবারক থেকে কালিমা তাইয়্যিবাহ শুনলেনএকদা হযরত আবু যার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবীজির নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌ আমরা আপনার নিকট এসেছি আপনি কী বলেন, তা শুনতে, তখন নবীজি এরশাদ করেন, আমি বলি, “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্‌।” অতঃপর আবু যার ও তাঁর সঙ্গী রাসুলের উপর ঈমান আনলো।

হাফেজ ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইবনে জারির তাবারি প্রমুখের বক্তব্য উদ্ধৃতি করে উল্লেখ করেছেন যে, “কালিমাতুত তাকওয়া” দ্বারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বুঝানো হয়েছে। হযরত আতা খুরাসানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত হয়েছে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগন! আল্লাহ যাকে কালিমা তাইয়্যিবার নিয়ামত দান করেছেন তার উচিত এই কালিমাকে সংরক্ষণ করা, নিজের ঈমান ও আকিদা কে হেফাজত করা নামায, আনুগত্য ও নেক আমলের উপর অটল থাকা, পবিত্র কালিমার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে প্রথমত: এর অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। দ্বিতীয়: কালিমা যা নির্দেশ করে তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, তৃতীয়: কালিমার দাবী অনুযায়ী আমল করা। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এর দাবী হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। তাঁর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করা, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। আর “মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” এর দাবী হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করা, তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা, তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা। আল্লাহর ইবাদত কেবল তাঁর শরীয়ত অনুযায়ী করা। হে ঈমানদারগণ! পবিত্র বৃক্ষ তখনই পবিত্র ও ফলবান হয় যখন তার মূল মাটিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। তেমনি একজন মু’মিনও সত্যের ওপর দৃঢ় থাকতে পারে তখনই যখন তার অন্তরে আল্লাহ ও রাসূলের বিশ্বাস সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। অন্তরে বিশ্বাস যখন সুদৃঢ় হয়।

হযরত আদম আলায়হিস্‌ সালাম কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ্‌ আরশে দেখলেন: হযরত আদম আলায়হিস সালাম আরশের পায়ায় লিখিতভাবে “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। দেখতে পেয়েছিলেন মর্মে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সম্পর্কে হাদীসগুলো ইমাম তাবরানী’র মু’জামুল আউসাতে, ইমাম তারবানী/মুজামুস সগীরে, ইমাম ইবনে হাজর নুরুদ্দীন হায়সামীর “মাজমাউজ যাওয়াইদ” ইমাম ইবনে আসাকির কর্তৃক “তারিখে দামেস্কে”, ইমাম জালল উদ্দীন সুয়ুতী কর্তৃক খাসায়েসুল কুবরা, ইমাম বুরহান উদ্দীন হালবী কর্তৃক সিরাতে হলবিয়্যাহ, ইমাম বায়হাকী কর্তৃক দালায়িলুন নবুওয়তএ উল্লেখ করেছেন। ইমাম ছালাভী (ওফাত ৪২৭ হি.) বর্ণনা করেন, হযরত আদম আলায়হিস্‌ সালাম আরশের পারায় লিখিতভাবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” দেখতে পেয়েছিলেন। (তাফসীরে ছালাভী, খন্ড:, পৃষ্ঠা১৮৪)

সালাফীদের অভিযোগ হলো, মসজিদে আল্লাহ ও মুহাম্মদ পাশাপাশি লেখা যাবে না। নাঊযুবিল্লাহ। তাদের ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে অনেকগুলো দলীল উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের দাবী হলো লাইলাহা ইল্লাল্লাহু উপরে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ নীচে লিখতে হবে। পাশাপাশি লিখা যাবে না। এসব তাদের মনগড়া ভিত্তিহীন অপব্যাখ্যা। অথচ পবিত্র ক্বোরআনে সূরা ফাতাহ ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ” এ আয়াতে প্রথমে মুহাম্মদ এবং আল্লাহ্‌ শব্দ পরে এবং পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে, উপরে নীচে করা হয়নি। পবিত্র কাবা শরীফের দরজার উপরে ডান পাশে আল্লাহ এবং বাম পাশে “মুহাম্মাদ” সাল্লাল্লাহ তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লিখা রয়েছে। আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের কে হেদায়াত দান করুন আমীন।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে কালিমায়ে তাইয়্যিবাহকে সুদৃঢ় করে দিন, এই কালিমার উপর আমাদের জীবিত রাখুন।

হে আল্লাহ মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করুন। তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন এবং তাদের ঈমান ও আকিদাকে হিফাজত করুন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিরাপত্তার স্বার্থে দেশে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি
পরবর্তী নিবন্ধবোয়ালখালীর শ্রীপুরে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প কাল