পর্ব ২
‘ইম্যাকুলেট কনসেপশন’: লৈঙ্গিক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সংঘাত
১৯৯২ সালে দেহলভী নির্মাণ করেন `Immaculate Conception’, যা বর্ণবাদ, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের জটিলতা নিয়ে একটি সাহসী কাজ। চলচ্চিত্রটি করাচির একটি সুফি মাজারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যেখানে নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান লাভের আশায় আসেন। এই মাজারটি পরিচালিত হয় হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার সমপ্রদায়ের মানুষের দ্বারা।
গল্পে দেখা যায়, একটি ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ দম্পতি তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্ব দূর করতে এই মাজারে আসে এবং স্থানীয় বিশ্বাসের কাছে নতি স্বীকার করে। দেহলভী এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চায়। একইসাথে তিনি হিজড়াদের মানবিক মর্যাদা এবং তাদের প্রান্তিক জীবনের চিত্র অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। চলচ্চিত্রটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘Panorama’ বিভাগে প্রদর্শিত হয় এবং লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। এটি ডিনার্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্পেশাল জুরি প্রাইজ লাভ করে।
‘জিন্নাহ’: ইতিহাসের পুনর্পাঠ এবং একটি জাতির জন্মগাথা
১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘Jinnah’ জামিল দেহলভীর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র। এটি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জীবনীনির্ভর কাজ । এই চলচ্চিত্রটি শুরুর মুহূর্ত থেকেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে জিন্নাহর চরিত্রে ব্রিটিশ অভিনেতা ক্রিস্টোফার লি–কে কাস্ট করার সিদ্ধান্তটি পাকিস্তানি মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার শিকার হয়। এর কারণ ছিল লি–র পূর্ববর্তী ‘ড্রাকুলা’ বা ভ্যাম্পায়ার চরিত্রের ভাবমূতি। এমনকি অভিনেতা হিসেবে শশী কাপুরের অন্তর্ভুক্তিও ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই কৌতূহলের সৃষ্টি করেছিল।
দেহলভী ‘জিন্নাহ’কে একটি প্রথাগত বায়োাপিকের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফ্যান্টাসি বা অলীক বাস্তবতার আদলে সাজিয়েছেন। চলচ্চিত্রটি শুরু হয় জিন্নাহর মৃত্যুর পরবর্তী মুহূর্ত থেকে, যেখানে তিনি একটি কাল্পনিক বিচারালয়ের বা পরকালের একটি ট্রানজিট পয়েন্টে উপস্থিত হন। সেখানে দেখা যায় তার রেকর্ড ফাইল হারিয়ে গেছে এবং একজন স্বর্গীয় বিচারক তাকে তার জীবনের প্রধান ঘটনাবলী আবার স্মরণ করতে বলেন। জিন্নাহর চরিত্রে ক্রিস্টোফার লি এক অনবদ্য অভিনয় উপহার দেন, যা তিনি নিজেও তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সেরা কাজ হিসেবে বিবেচনা করতেন ।
চলচ্চিত্রটিতে ভারত বিভাজনের সময়কার ট্র্যাজেডি, জিন্নাহর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং তার ব্যক্তিগত জীবনের সততাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও পাকিস্তান সরকার এক পর্যায়ে এর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় এবং অনেক বাধার সৃষ্টি করে, তবুও প্রবাসী পাকিস্তানিদের আর্থিক সহযোগিতায় চলচ্চিত্রটি সম্পন্ন হয়। মুক্তির পর এটি পাকিস্তানে ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এবং জানজিবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড প্রাইজসহ ওয়ার্ল্ড ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস এবং ওয়ার্ল্ডফেস্ট হিউস্টনে একাধিক পুরস্কার জয় করে ।
‘ইনফিনিট জাস্টিস’: ৯/১১ পরবর্তী বিশ্ব এবং উগ্রবাদের উৎস সন্ধান
২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত `Infinite Justice’ ছিল সমসাময়িক রাজনীতির ওপর দেহলভীর আর এক তীক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি। এটি মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লের অপহরণ ও হত্যার ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত । ৯/১১ হামলার পর পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা এবং তরুণ মুসলিমদের উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো দেহলভী এই চলচ্চিত্রে অনুসন্ধান করেছেন ।
তিনি কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অবিচার একজন মানুষকে চরমে নিয়ে যেতে পারে। চলচ্চিত্রটির উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে একটি সংলাপ শুরু করা। এটি আমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিটিকস প্রাইজ এবং ফ্লোরেন্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করে । এটি দেহলভীর ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণের দিকে পদার্পণেরও একটি উদাহরণ ।
পরবর্তী কর্মজীবন ও আধুনিক চলচ্চিত্রসমূহ: ‘গডফরসেকেন’ এবং ‘সেভেন লাকি গডস’
২০১০ সালে দেহলভী নির্মাণ করেন ‘Godforsaken’, যা একটি অতিপ্রাকৃত থ্রিলার। এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একজন পতিত দেবদূতকে কেন্দ্র করে যে পৃথিবীতে এসে একটি শিশুর মৃত্যুর জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ এর চিত্রনাট্যকে জটিল মনে করলেও, এর সিনেমাটোগ্রাফি এবং অন্ধকার আবহ প্রশংসিত হয়। এটি মেক্সিকো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন পাম অ্যাওয়ার্ড লাভ করে ।
২০১৪ সালের চলচ্চিত্র `Seven Lucky Gods’ অভিবাসন এবং ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এতে লন্ডনে বসবাসকারী একদল মানুষের জীবনের ওপর একজন আলবেনীয় অবৈধ অভিবাসীর প্রভাব চিত্রায়িত হয়েছে । চলচ্চিত্রটি জাপানি লোককথার ‘সাত ভাগ্যদেবতা’–র একটি আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখা হয়। এটি তিরানা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড প্রাইজ এবং কানাডা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বেস্ট ফিচার ফিল্মের পুরস্কার জয় করে। ২০১৬ সালে তিনি `Blood Money’ নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ওয়েস্ট কোস্ট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে।
কারিগরি শৈলী এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবদান
জামিল দেহলভী তার দীর্ঘ কর্মজীবনে নিজেকে একজন দক্ষ কারিগরি শিল্পী হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তিনি প্রায়শই তার চলচ্চিত্রের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং সম্পাদকের ভূমিকা একাই পালন করেন । তার এই বহুমুখী দক্ষতা তাকে পূর্ণ সৃজনশীল স্বাধীনতা প্রদান করে। তিনি নিজেকে একজন ‘গেরিলা চলচ্চিত্রকার’ বলেন কারণ তিনি প্রথাগত স্টুডিও সিস্টেমের বাইরে গিয়ে নিজের শর্তে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন । তার চলচ্চিত্রগুলোতে প্রায়শই অ–রৈখিক বর্ণনাশৈলী দেখা যায় এবং তিনি শব্দের চেয়ে ইমেজের ওপর বেশি নির্ভর করেন ।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি জামিল দেহলভী চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি করাচির হাবিব ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ আর্টস, হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি ও তাত্ত্বিক শিক্ষা প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি লন্ডনের বিবিসি, চ্যানেল ফোর এবং ফরাসি টেলিভিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন। জাতিসংঘের রেডিও ও ভিজ্যুয়াল সার্ভিস বিভাগেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে ।
স্বীকৃতি ও উপসংহার
জামিল দেহলভীর কাজগুলো বিশ্বজুড়ে অসংখ্য চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। কান, বার্লিন, টরন্টো, লন্ডন এবং নিউ ইয়র্কের মতো বিখ্যাত উৎসবে তার চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী হয়েছে । ২০০৭ সালে `Bite the Mango’ চলচ্চিত্র উৎসবে এবং ২০১৮ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনসটিটিউট (BFI) তার কাজের ওপর বিশেষ রেট্রোস্পেকটিভ বা স্মৃতিচারণমূলক প্রদর্শনীর আয়োজন করে । বিএফআই–এর পক্ষ থেকে তাকে “চলচ্চিত্রের অন্যতম রহস্যময় এবং অন্তত অনুধাবনকৃত ব্যক্তিত্ব” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে । ২০২২ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন ।
জামিল দেহলভী কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক নন, তিনি একজন চিন্তাবিদ যিনি তার ক্যামেরার মাধ্যমে সমাজের গভীর স্তরে প্রোথিত অবিচার, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং ক্ষমতার দম্ভকে উন্মোচন করেছেন। তার জীবন ছিল এক যাযাবরের মতো, যিনি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছেন। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের কারণে তার অনেক কাজই পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত । তিনি প্রমাণ করেছেন যে সত্য বলার জন্য স্টুডিওর বিলাসিতার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একজন শিল্পীর অদম্য সাহস এবং প্রখর দৃষ্টিশক্তি ।













