চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় লালদিয়া কনটেনার টার্মিনালের নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের খবরটি শুধু দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সুখবর, আশা জাগানিয়া নয়, এটি হবে মাইলফলক। বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের পরিধি আরো প্রসারিত করার ক্ষেত্রে এই টার্মিনাল নতুন যুগের সূচনা করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের বন্দর উন্নয়ন ও পরিচালনা নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের চিন্তাধারার পরিবর্তনেরও প্রতীক। পতেঙ্গার লালদিয়ায় প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগে এপিএম টার্মিনালস যে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে, তার দিকে তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে তাকালে এর তাৎপর্যের বড় একটি অংশ অধরাই থেকে যাবে।
ভিত্তি স্থাপন (গ্রাউন্ডব্রেকিং সেরেমনি) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল একটি মাইলফলক হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এই টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম কিংবা বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই টার্মিনালের কাজ শেষ হবে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। বিশ্বের জন্য আমরা দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই। শুধু লজিস্টিক হাব হিসেবে নয়, সব রকম বিনিয়োগের জন্য। এটার সাথে আরো কয়টি পোর্ট করতে যাচ্ছি। চট্টগ্রামে আরো কয়টি ইকোনমিক জোন হবে। চট্টগ্রামের মানুষের যে প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে। বাণিজ্যিক রাজধানী কেউ করে না, বাণিজ্যিক রাজধানী হয়। এ সমস্ত কাজের মাধ্যমে যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, সেটাই হবে বাণিজ্যিক রাজধানী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। সরকারের কাজ ব্যবসা পরিচালনা করা নয়, বরং বেসরকারি খাতকে ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সরকার সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এই অঞ্চলের জন্য। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে হবে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ মো. জাফর আলম বলেন, লালদিয়া তৈরি করলেই চট্টগ্রামের বন্দর সমস্যা শেষ হবে না। একটি বন্দরের দক্ষতা নির্ধারণ করে শুধু জেটির সংখ্যা বা ক্রেনের সংখ্যা নয়। জাহাজ থেকে কনটেনার দ্রুত নামানোর পর সেটি যদি বন্দরের ভেতরে দিনের পর দিন পড়ে থাকে, কাস্টমস ছাড়পত্রে দীর্ঘ সময় লাগে, বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত সড়কে যানজট হয়, রেলপথে পর্যাপ্ত কনটেনার পরিবহন না হয় কিংবা অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর সক্ষমতা না বাড়ে–তাহলে আধুনিক জেটির পুরো সুফল অর্থনীতিতে পৌঁছাবে না। তাই লালদিয়ার সঙ্গে সমান্তরালে প্রয়োজন ঢাকা–চট্টগ্রাম পণ্য পরিবহন করিডর, রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, ডিপো ও লজিস্টিকস কেন্দ্র, কাস্টমস স্বয়ংক্রিয়করণ এবং ডিজিটাল বন্দর ব্যবস্থা উন্নয়ন। একটি বন্দর তখনই কার্যকর যখন তার পুরো হিন্টারল্যান্ডের সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর। তিনি বলেন, এখন চ্যালেঞ্জ হলো–এই সুযোগকে যেন আরেকটি প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলকে সীমাবদ্ধ না রাখা হয়। লালদিয়া যদি স্বচ্ছতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে সফল হয়, তবে এটি শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন টার্মিনাল হবে না; এটি বাংলাদেশের পুরো বন্দর ও লজিস্টিকস খাতকে একুশ শতকের ব্যবস্থাপনায় নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরা বলতে পারি, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে নিঃসন্দেহে।







