জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের তিন দফা সংঘর্ষ হয়েছে। এ সংঘর্ষের জের ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর আরও দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর জবি, ঢাকা কলেজ ও বকশীবাজারের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, ইট–পাটকেল নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশি অস্ত্র ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীর পাশাপাশি শিক্ষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৯৭ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল সকালে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের জেরে দুপুরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরেও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। বিকেলে সেখানে তৃতীয় দফায় সংঘর্ষ বাধে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার মকবুল হোসেন জানান, দুপুর থেকে আহতরা চিকিৎসা নিতে আসেন। বিকেল ৬টা পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও জকসুর নেতাদের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে বেশকয়েকজন আহত হন। আহতদের নিকটবর্তী ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালের ভেতরে শিবিরের নেতাকর্মীরা এবং বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালের ভেতর থেকে শিবিরের নেতাকর্মীরা ফটকে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পাল্টা ধাওয়া করে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়লে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুই পক্ষ ইট–পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশি অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। পরে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে যুবদলের নেতাকর্মীরাও সেখানে এসে অবস্থান নেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তৃতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন ঘটনার পর চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তিনি বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বেলা ৩টার দিকে ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের হিসাবে আহতের সংখ্যা প্রায় ২০ জন। ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মিলাদ হোসেন দাবি করেন, অডিটোরিয়ামে পূর্বনির্ধারিত কর্মীসভায় যাওয়ার সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর হামলা করেন। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেন, দোয়া মাহফিলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। বিকেলে ঢাকা কলেজে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। অন্যদিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয় পুলিশ।
এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার জের ছড়িয়ে পড়ে বকশীবাজারের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাতেও। বিকেল থেকে সেখানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। বিকেল ৫টার দিকে সংঘর্ষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে আলিয়া শাখা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ, লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি, ছাত্রদল নেতা রুবেল হোসেন মমিনসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আহতদের একজন জানান, সানাউল্লাহ ও রাব্বি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল রড, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে সানাউল্লাহর দুই পা ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। রাব্বির বাম পায়েও গুরুতর জখম হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, হলের সিট দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ বাধে। এ সময় মাদ্রাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষ ইট–পাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া করে। ওই এলাকায় সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ প্রথমে দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিলেও তাদের সংখ্যা কম থাকায় সংঘর্ষ থামাতে ব্যর্থ হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিবিরের নেতাকর্মীরা মাদ্রাসা এলাকা ছেড়ে যান। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতাকর্মী মাদ্রাসার একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন। সেখানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যেতে বলা হয় এবং হলের ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিনভর সংঘর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল হাসপাতাল এলাকায় ৭০ জনের বেশি, ঢাকা কলেজে প্রায় ২০ জন এবং আলিয়া মাদ্রাসায় অন্তত সাতজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে আহতের সংখ্যা অন্তত ৯৭ জন। তবে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আহতের যে আলাদা আলাদা দাবি করা হয়েছে, সেগুলো যোগ করলে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সন্ধ্যার দিকে তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, নিউ মার্কেট, সায়েন্সল্যাব ও বকশীবাজার এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।











