জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি

হাসান আকবর | শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ

এক বছরের ব্যবধানে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। গত অর্থবছরে বিপিসির ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যা আগের অর্থবছরের ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১০৭ শতাংশ বেশি। মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশের বেশি এখন জ্বালানির পেছনে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় মেটাতে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, দেশের বাজারে দীর্ঘদিন দাম অপরিবর্তিত থাকা এবং আমদানি পর্যায়ে করের বোঝা বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থাটির নগদ অর্থের ওপর চাপ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বড় অংশই আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করতে হয়েছে বলে বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের খবর হচ্ছে, জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধের জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা তহবিল থেকে ইতোমধ্যে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে এসব প্রকল্পের অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট আছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আমদানি ব্যয়ের চাপে বিপিসির দৈনন্দিন কার্যক্রমের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অর্থায়নেও প্রভাব ফেলছে। অবশ্য কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, পরবর্তীতে জ্বালানি তেল বিক্রি এবং সরকারের ভর্তুকি থেকে এই তহবিল পুনরায় গঠন করা সম্ভব হবে।

সাম্প্রতিক একটি হিসেবের উদ্ধৃতি দিয়ে বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে বিপিসির হাতে তেল আমদানির মতো মূলধন রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় মেটানোর পর এই অর্থের পরিমাণ আরো কমে যাবে। আগামী মাসগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য দায় মেটাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ফলে আগামী মাসগুলোতে জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে বিপিসিকে এখন একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকি, অতিরিক্ত অর্থায়ন এবং নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে তেল আমদানির খরচও। এতে বিপিসি চাপে পড়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় না করার প্রভাব। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু থাকার পরও জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর টানা চার মাস ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের খুচরা দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। অথচ সামনের দিনগুলোতে এই দামে তেল পাওয়া এবং তেলের স্বাভাবিক যোগান নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি তেলের এলসি নিষ্পত্তিতে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। এই অর্থ সরকারের কাছে ভর্তুকি হিসেবে দাবি করেছে বিপিসি। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় আমদানি ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

আগস্ট মাসে শুল্ক, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে বিপিসির জ্বালানি আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই মাসে এ ব্যয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এক মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।

অপরদিকে আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে ট্যাক্সের চাপও বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে আমদানি করা পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্ক ও কর নির্ধারণে প্রকৃত আমদানি বা ইনভয়েস মূল্যকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। বিপিসি বলেছে, আগের ট্যারিফ মূল্যের পরিবর্তে এই পদ্ধতি চালু হওয়ায় তাদের করের বোঝা প্রতি লিটারে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। গত মাসে ডিজেলের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর মিলিয়ে প্রতি লিটারে এ ব্যয় ছিল ৩২ টাকা ৪৪ পয়সা। একইভাবে অন্যান্য পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের শুল্ক করও বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম বেড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানির চাপের পাশাপাশি একাধিক বড় আর্থিক দায় নিয়েও চাপে রয়েছে। এলপিজি ট্যাংক স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে সংস্থাটির এখন প্রায় ৫২৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে প্রায় ৬৯০ কোটি টাকা দিতে হবে। একই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন হতে পারে আরো প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইআইটিএফসি) ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে হবে। সবকিছু মিলে বিপিসি আর্থিকভাবে বড় চাপে রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সরকার আগামী অর্থবছরের জ্বালানি আমদানির অর্থায়নে আইআইটিএফসি থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই অর্থ ঠিকভাবে পাওয়া গেলে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি কিছুটা চাপমুক্ত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২৫০ কিমি উন্নয়নে বরাদ্দ ১,৪৬০ কোটি টাকা
পরবর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় বাসের ধাক্কায় আহত বাইক আরোহীর মৃত্যু