জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি

| রবিবার , ৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

ডেঙ্গু ও হামসহ জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা ও মশক নিধনের ওপর নির্ভর না করে পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি বলেছে, নগরের জনঘনত্ব, ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় ও নির্মাণস্থলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই ডেঙ্গু–হাম ঠেকাতে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই। গত ২ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাম ও ডেঙ্গু: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিআইপির নেতারা। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপদাহ ও অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য সংকট বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পানি জমা প্রতিরোধ এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। হামের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি এবং টিকা কভারেজের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, জনঘনত্ব, শিশুদের সংখ্যা, টিকা কভারেজ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নগরায়ণ, জনঘনত্ব ও দারিদ্র্য বেশি এমন এলাকায় হাম ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। উন্নয়ন প্রকল্পে হেলথ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (এইচআইএ) অন্তর্ভুক্ত করলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, জিআইএস, ড্রোন ও ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোথায় পানি বা বর্জ্য জমে আছে এবং কোথায় মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল রয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের নগরের বস্তি এলাকাসহ নিম্নবিত্ত এলাকাগুলোতে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা ও সুবিধাদি সংস্থানের সুলভ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা স্বল্প আয়ের মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে কিছুটা ভূমিকা রাখছে। তবু নগর এলাকায় বিপুলসংখ্যক বস্তিবাসীর জীবনমান এখনো অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, বিনোদন সুবিধাদি নিশ্চিত করতে সরকারের সরাসরি ভূমিকা ও অংশগ্রহণ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগগুলোকেও সুসমন্বিত, কার্যকর ও টেকসই করতে হবে।

মানব–প্রতিবেশ তত্ত্ব অনুসারে, জনসংখ্যা, সংগঠন, পরিবেশ ও প্রযুক্তির যথাযথ সমন্বয় ছাড়া কোনোভাবেই পরিকল্পিত নগরায়ণ কল্পনা করা যায় না। এক্ষেত্রে শুধু বাচনিক প্রতিশ্রুতি নয়; জনস্বার্থে সমস্যাগুলো আমলে নিয়ে প্রান্তিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে চরম বিপর্যয়ের রূপ পরিগ্রহ করবে। তাঁরা বলেন, নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট প্রভাবকগুলোর মধ্যে রয়েছে–জনসংখ্যার ঘনত্ব, বসতবাড়ির ধরন, পরিবহন ব্যবস্থা, পরিবার, চালচলন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক পরিচ্ছদ, অর্থনীতি, সেবা–পরিষেবা সুবিধা, শিক্ষা ও চিকিৎসা, বিনোদন ব্যবস্থা, অপরাধ বৃত্তি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ইত্যাদি। বিগত পাঁচ দশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে নগরায়ণের হার সবচেয়ে বেশি।

বিশ্বব্যাংকের ‘লিভারেজিং আরবানাইজেশন ইন সাউথ এশিয়া : ম্যানেজিং স্পেশাল ট্রান্সফরমেশন ফর প্রসপারিটি অ্যান্ড লিভেবিলিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করছে। নগরায়ণের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫১ সালে দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আমাদের দেশে নগরায়ণ হচ্ছে আর্থ–সামাজিক প্রয়োজনে, যাকে পরিকল্পিত নগরায়ণ বলা যায় না। এতে বসতি ও নগরায়ণের চাপ পড়েছে দেশের বনভূমি ও জমির ওপর। অপরিকল্পিত এ দ্রুত নগরায়ণের নেতিবাচক প্রভাবে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে। বাংলাদেশেও এ মৃত্যুহার অনেক বেশি। ঢাকা–চট্টগ্রামের বহু সংকটের মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। পরিবেশ দূষণও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। লেক, জলাশয় ও নদীতে ময়লা–আবর্জনা ছুড়ে ফেলায় পানি দূষিত হয়ে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। এ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন জীবাণু থাকে, যা আশপাশের পরিবেশকে সংক্রমিত করে এবং মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে